সোনালি ব্যংক নিলাম ডেকেছে সালমান এফ রহমানের বাড়ীর

প্রকাশ:

শেয়ার করুন:

জিএমজি এয়ারলাইন্সের নামে সোনালী ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় নিলামে উঠছে ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের ধানমণ্ডির বাড়ি। ১২ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয় সোনালী ব্যাংক। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে চলতি বছরের ৩০ মে পর্যন্ত জিএমজির কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা ২২৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আগামী ৩ আগস্ট ব্যাংকের লোকাল অফিস ৩৫-৪২ মতিঝিলে এ নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে চলতি বছরের ২২ মে দৈনিক যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন ছাপা হলে নড়েচড়ে বসে সোনালী ব্যাংক। সিদ্ধান্ত নেয় টাকা আদায়ের। আর এর অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত পাওনা টাকা না পেয়ে নিলাম ডাকতে বাধ্য হয়েছে ব্যাংকটি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের লোকাল অফিসের মহাব্যবস্থাপক ফনীন্দ্র ত্রিবেদী যুগান্তরকে বলেন, নিলাম ডাকার আগে পাওনা আদায়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত তাগাদা এবং উকিল নোটিশসহ যা যা করার সবই করা হয়েছে। কিন্তু তারা টাকা না দেয়ায় শেষ পর্যন্ত বন্ধকি সম্পত্তি নিলাম করে টাকা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি বলেন, এর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে তারা অর্থঋণ আদালতে মামলা করবেন। আর মামলার ভিত্তি হল দুটি। প্রথমত, নিলামে জমি বিক্রি করে ব্যাংকের ঋণের পুরো টাকা পাওয়া না গেলে অথবা বিডিংয়ে কেউ অংশ না নিলে। এই দুই অবস্থায় সাধারণত অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয়। এরপর আদালতের রায়ের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে। এদিকে ঋণখেলাপি হয়েও আইন লংঘন করে সম্প্রতি বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সালমান এফ রহমান।

উল্লেখিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সালমান এফ রহমানের বক্তব্য নেয়ার জন্য যুগান্তরের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তী সময়ে মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু জানানো হলে তিনি মঙ্গলবার জানান, বুধবার তিনি কথা বলবেন। গতকাল বিকালে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মিটিংয়ে আছেন, পরে কথা বলবেন। কিন্তু এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে দ্বিতীয় দফায় তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করায় জিএমজি এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, পিতা মরহুম ফজলুর রহমান, মাতা মরহুমা সৈয়দা ফাতিনা রহমানের বন্ধকি সম্পত্তি নিলামের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ধানমণ্ডির ২ নম্বর রোডের ১৭ নম্বর প্লটের (নতুন) ১ বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমি ও তার ওপরের ভবন এবং নির্মাণাদিসহ নিলামে তোলা হবে। আগামী ৩ আগস্ট বুধবার এ নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩ এর ১২ (৩)-এর বিধান অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

জানা গেছে, ধানমণ্ডির এ ভবনটির সামনের বামপাশে বেক্সিমকো গ্রুপের কর্পোরেট অফিস, ডানপাশে বেক্সিমকোর নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য ইয়োলোর শোরুম এবং পেছনে সালমান এফ রহমানের আবাসিক বাড়ি।

এদিকে ২০১৬ সালের ৩০ মে পর্যন্ত জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছে অনারোপিত সুদসহ ব্যাংকের পাওনা ২২৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে এ ঋণ নেয়া হয়। ওই সময়ে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। পরবর্তীকালে সুদ ও ঋণের স্থিতি বেড়ে যায়।
ঋণখেলাপি হয়েও আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হলেন সালমান এফ রহমান। ১৪ জুলাই আইএফআইসি ব্যাংকের ৩৯তম বোর্ডসভায় তাকে চেয়ারম্যান পদে পুনর্নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর (সংশোধিত ২০১৩) ১৫ ধারা ৬ উপধারার (ঊ) বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি তাহার নিজের কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হইতে গৃহীত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ বা খেলাপি হলে ব্যাংক-কোম্পানি কর্তৃক পরিচালক নিযুক্ত হওয়ার যোগ্য হইবেন না।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, আইন অনুসারে কোনো ঋণখেলাপি ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যান হতে পারেন না। তার মতে, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তার দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা যুগান্তরকে বলেন, পাওনা আদায়ে নিলাম ডেকেছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে সোনালী ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণের যে তথ্য পাঠানো হয়েছে তাতে সালমান এফ রহমানের নাম নেই। আর সোনালী ব্যাংক তথ্য না দিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু করার নেই।

এদিকে শুধু মুদ্রাবাজারে নয়, পুঁজিবাজারেও সংকট সৃষ্টি করেছে জিএমজি। আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি করে শেয়ারবাজার থেকে নেয়া ৩শ’ কোটি টাকা ৭ বছরেও ফেরত দেয়নি কোম্পানিটি। ২০০৯ সালে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে এই টাকা নেয়া হয়। পরে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ওদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পথে বসতে হয়েছে। কেননা তারা আজও টাকা ফেরত পাননি।

জানা গেছে, আইপিওর (প্রাথমিক শেয়ার) আগে মূলধন বাড়াতে নির্দিষ্ট কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারে কোম্পানি। শেয়ারবাজারের পরিভাষায় একে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বলা হয়। কিন্তু কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত বাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ না পেলে প্লেসমেন্টের টাকা ফেরত দিতে হয়। একই সঙ্গে যতদিন টাকা আটকে রাখা হল, বিনিয়োগকারীদের তার লভ্যাংশ দিতে হয়। সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে জিএমজি। এতে ১০ টাকার প্রতিটি শেয়ার ৪০ টাকা প্রিমিয়ামসহ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা নেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বাজার থেকে ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জিএমজি এয়ারলাইন্স। পরের বছর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করে। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা ৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি ছিল। এ সময়ে মোট লোকসানের পরিমাণ ৪২ কোটি টাকা। ২০০৬ ও ২০০৭ সালে ১ কোটি টাকা মুনাফা দেখায়। কিন্তু ২০১০ সালে অলৌলিকভাবে বেড়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা। ওই বছরের প্রথম ৯ মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৭৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মুনাফা দেখায়।

শেয়ারবাজারে কারসাজি নিয়ে গঠিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ সালের স্থিতিপত্রে হঠাৎ করে ৩৩ কোটি টাকার পুনর্মূল্যায়ন উদ্বৃত্ত দেখানো হয়। এর ব্যাখ্যায় জিএমজি বলেছে, তাদের দুটি বিমানের সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে বিমান দুটি বেশ পুরনো। স্বাভাবিক নিয়মে পুরনো বিমানের সম্পদের দাম আরও কমার কথা। কিন্তু দাম বাড়িয়ে দেখিয়েছে জিএমজি। এভাবে ১৬৬ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এ প্রতিষ্ঠানটি প্রিমিয়ামসহ আরও ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন করে। কিন্তু কোম্পানির আর্থিক রিপোর্টে জালিয়াতি ধরা পড়ায় ২০১২ সালে আইপিও আবেদনটি বাতিল করে বিএসইসি। নিয়মানুসারে আইপিও আবেদন বাতিল করার পর বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে টাকা আটকে রেখেছে জিএমজি।

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর

 

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ সংবাদ

এই রকম আরও

কঠিন অবস্থানে প্রশাসন: ডাকবাংলোর বালু সরাতে ৩ দিনের আল্টিমেটাম

গাজী নাদিম,news39.net: মুকসুদপুর ডাকবাংলোতে রাস্তার পাশে বালু স্তূপ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির দায়ে দুই ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৩ দিনের...

ঢাকার প্রথম নারী ডিসি ফরিদা খানম

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ঢাকা জেলার নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের...

দোহার – নবাবগঞ্জ নিয়ে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা: এমপি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের বদ্ধপরিকর

আশিক / রাকিব: নিজস্ব প্রতিবেদক, নবাবগঞ্জ: শনিবার ঢাকার নবাবগঞ্জে উপজেলা ডাকবাংলো এবং জেলা পরিষদ মার্কেট পরিদর্শন করেছেন ঢাকা...

দোহার নবাবগঞ্জে বিকাশে চাকরির সুযোগ

ঢাকার দোহার নবাবগঞ্জ উপজেলায় বিকাশ লিমিটেডের মার্চেন্ট পয়েন্টের জন্য মেসার্স প্রতিভা এন্টারপ্রাইজের অধীনে মার্চেন্ট ডেভলপমেন্ট অফিসারের চাকরির সুযোগ। চাকরি...