বাংলাদেশের সবচে’ ছোট নদী ‘র তালিকা

প্রকাশ:

শেয়ার করুন:

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ—এই পরিচয় আমরা সবাই জানি। বড় বড় নদীর পাশাপাশি দেশে রয়েছে অসংখ্য ছোট নদী, যেগুলোর দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটারেরও কম। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, বাংলাদেশের সরকারী নদী তালিকায় এমন ২৪টি নদীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে যেগুলোর দৈর্ঘ্য মাত্র ০.২০ কিমি থেকে ০.৯৩ কিমি পর্যন্ত।  আমরা এসব ছোট নদীর অবস্থান, কারণ ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণ তুলে ধরবো।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও নদী কর্মীদের সহায়তায় বাংলাদেশের নদীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেছে। অবশ্য এটি খসড়া তালিকা, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পুনবিবেচনায় তালিকা হালনাগাদ করা হবে। এই নদীগুলোর কোনটি নদী কোনটি শাখা নদী সরকারকে সেটা নিশ্চিৎ করতে হবে।

সেই তালিকা থেকে বাংলাদেশের সবচে’ ছোট নদীগুলোর তালিকা করেছে নিউজ৩৯। দেশের সবচে’ ছোট নদীটির নাম বলেশ্বর, এটি শেরপুরের নকলা উপজেলায় প্রবাহিত, দৈর্ঘ্য মাত্র ২০০ মিটার।

এসব নদী কোথায় বেশি দেখা যায়?

এই তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে:

  • সুনামগঞ্জ জেলায় ৭টি নদী

  • নেত্রকোনা জেলায় ১০টি নদী

  • গাইবান্ধা, পঞ্চগড় ও শেরপুর-এ ১টি করে

অর্থাৎ, প্রায় ৭৫% নদী শুধু সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় সীমাবদ্ধ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূগোলগত দিক।

কেন এসব নদীর দৈর্ঘ্য এত কম?

এই নদীগুলোর দৈর্ঘ্য কম হওয়ার পিছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ:

১. হাওর অঞ্চলভিত্তিক ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য

সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা হাওর অধ্যুষিত এলাকা। বর্ষায় এ এলাকায় বিশাল পরিমাণ পানি জমে এবং শুষ্ক মৌসুমে এসব পানি ছোট ছোট প্রবাহে নামতে থাকে, যা স্থানীয়ভাবে নদী হিসেবে পরিচিত।

২. মৌসুমি নদী বা খাল

এমন অনেক ছোট নদী রয়েছে যেগুলো শুধুমাত্র বর্ষাকালে প্রবাহিত হয়। বছরজুড়ে প্রবাহ না থাকলেও, সরকারের মানচিত্রে নদী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এসব ছোট নদী অনেকসময় বৃহৎ নদীর শাখা, প্রাকৃতিক খাল, বা মৌসুমি প্রবাহ মাত্র। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো নদীর মতো শ্রেণিবিন্যাসে এসেছে, কিন্তু বাস্তবে এগুলো অনেকটা খাল বা ছড়ার মতো।

৩. নদীর ভরাট ও দখল

বহু ছোট নদী একসময় দীর্ঘ ছিল, কিন্তু অপরিকল্পিত দখল ও ভরাটের কারণে সেগুলোর প্রাকৃতিক প্রবাহ কমে এসেছে এবং এখন মাত্র কয়েকশ মিটারে সীমাবদ্ধ।

৪. নদী শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতির পরিবর্তন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু খাল, ছড়া বা জলপথও স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে “নদী” হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।


এই নদীগুলো কেন ময়মনসিংহ বিভাগে?

এটি পুরোপুরি নির্ভর করে ওই অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও পানির গঠন ব্যবস্থার ওপর। হাওর অঞ্চল হওয়ায় বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধারন করতে গিয়ে ছোট ছোট প্রবাহ তৈরি হয়, যেগুলো পরবর্তীতে স্থায়ী বা মৌসুমি নদীতে রূপ নেয়।

বাংলাদেশের সবচে’ ছোট দশ নদী:

১. বলেশ্বর – নকলা, শেরপুর – ০.২০ কি.মি.

২. প্র. শরমতি – জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ – ০.৩২ কি.মি.

৩. হিলু চিয়ার – জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ – ০.৩৬ কি.মি.

৪. হইহরি – বোদা, পঞ্চগড় –  ০.৪০ কি.মি.

৫. বহর – ছাতক, সুনামগঞ্জ – ০.৪৬ কি.মি.

৬. টগী – জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ – ০.৪৭ কি.মি.

৭. তৈয়লখালী – নেত্রকোনা সদর – ০.৫ কি.মি.

৮. দাইম – ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ – ০.৫ কি.মি.

৯. ধামরিহালা – নেত্রকোনা সদর – ০.৫ কি.মি.

১০. বাকলা – কমলাকান্দা, নেত্রকোনা – ০.৫ কি.মি.

বাংলাদেশে ২৪ টি নদী আছে  যার দৈর্ঘ্য ১ কিলোমিটারের কম:

ক্রম নদীর নাম অবস্থান দৈর্ঘ্য
কি.মি.
৮২৫. বলেশ্বর নকলা, শেরপুর ০.২০
৭৮২. প্র. শরমতি জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ০.৩২
১৪০৪. হিলু চিয়ার জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ০.৩৬
১৩.৭৬. হইহরি বোদা, পঞ্চগড় ০.৪০
৮২৯. বহর ছাতক, সুনামগঞ্জ ০.৪৬
৪৮৩. টগী জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ০.৪৭
৫৫৪. তৈয়লখালী নেত্রকোনা সদর ০.৫
৫৬৪. দাইম ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ ০.৫
৬১৯. ধামরিহালা নেত্রকোনা সদর ০.৫
১০ ৮৩৯. বাকলা কমলাকান্দা, নেত্রকোনা ০.৫
১১ ১১৭৩. রাজী কেন্দুয়া, নেত্রকোনা ০.৬
১২ ৭৮১. প্র. ডাইকা জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ০.৬১
১৩ ৩১০. গারখানা সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা ০.৭
১৪ ৮১১. বয়রা খালিয়াজুরি, নেত্রকোনা ০.৭৫
১৫ ৩৫২. ঘামডুলি আটপাড়া, নেত্রকোনা ০.৭৫
১৬ ১০৩৭. মরা (খালিয়াজুরি) খালিয়াজুরি, নেত্রকোনা ০.৭৫
১৭ ১০২৯. মনিকা মদন, নেত্রকোনা ০.৭৬
১৮ ৭০৩. পাগারধার জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ০.৭৯
১৯ ৮১৯. বর্নি মদন, নেত্রকোনা ০.৮১
২০ ৮১২. বয়রাহালা মদন, নেত্রকোনা ০.৮২
২১ ১৩৭২. হলহলিয়া মদন, নেত্রকোনা ০.৮২
২২ ৩৬২. ঘোড়াপুক্তা আটপাড়া, নেত্রকোনা ০.৮৮
২৩ ৭১০. পন্ডার মদন, নেত্রকোনা ০.৮৮
২৪ ৭৮৩. প্র. নাইজর জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ০.৯৩

 

ছোট নদীগুলোর গুরুত্ব

যদিও এগুলোর দৈর্ঘ্য কম, তবুও:

  • কৃষিকাজে সেচ

  • স্থানীয় মাছ চাষ

  • বর্ষাকালে পানি নিস্কাশন

  • জীববৈচিত্র্য রক্ষা

—এই ছোট নদীগুলোর ভূমিকা অনেক।

বাংলাদেশের নদী সম্পদের বড় একটি অংশ হলো এসব ছোট নদী। এক কিলোমিটারের নিচের এই নদীগুলোর অস্তিত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নয়, আমাদের প্রকৃতি ছোট ছোট জলধারার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এসব নদী সংরক্ষণ করা তাই সময়ের দাবি।

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ সংবাদ

এই রকম আরও

বান্দরবান ভ্রমণ – নীলাচল ও মেঘলায় (দ্বিতীয় পর্ব)

সবুজে নীলে আঁচলে বান্দরবান শহর ছাড়িয়ে নীলাচলের পথে উঠতে শুরু করলেই মনে হয়, আপনি আর স্রেফ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন...

নবাবগঞ্জের গ্রামগুলি | গ্রামের তালিকা

নবাবগঞ্জের গ্রামগুলি পদ্মা, ইছামতি ও কালিগঙ্গা এই তিন নদীর অববাহিকায় ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে ইছামতি এর প্রাণ, আর...

দোহারের গ্রামগুলি | গ্রামের তালিকা

দোহারের গ্রামগুলি, বদলে যাচ্ছে দ্রুত। গ্রামগুলো বড় হচ্ছে, এ গ্রাম ও গ্রাম মিলে এক হয়ে যাচ্ছে। যেখানে ছিল...

কুর্দি কারা? ইতিহাস ও পরিচয়

মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এমন এক বিশাল জনপদ রয়েছে, যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং সুদীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও নেই কোনো নিজস্ব...