মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এমন এক বিশাল জনপদ রয়েছে, যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং সুদীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও নেই কোনো নিজস্ব মানচিত্র বা সার্বভৌম রাষ্ট্র। তারা কুর্দি—বিশ্বের বৃহত্তম ‘রাষ্ট্রহীন’ জাতিগোষ্ঠী। তুরস্ক, ইরান, ইরাক এবং সিরিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে বিভক্ত এই জাতিটির জীবনগাথা যেমন বীরত্বের, তেমনি বঞ্চনার।
পরিচয় ও আদি নিবাস
কুর্দিরা মূলত একটি ইন্দো-ইউরোপীয় নৃগোষ্ঠী। তারা কোনোভাবেই আরব, তুর্কি বা পারস্য জাতিভুক্ত নয়। ঐতিহাসিকভাবে তারা ‘মেসোপটেমিয়া’র উত্তরাঞ্চল এবং জাগ্রোস পর্বতমালা সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করে আসছে। এই ভৌগোলিক অঞ্চলটিকে ঐতিহাসিকভাবে ‘কুর্দিস্তান’ বলা হয়, যা বর্তমানে চারটি দেশের সীমান্তে বিভক্ত।
বিস্তৃতি: চার দেশে বিভক্ত এক প্রাণ
বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি কুর্দি মানুষের বসবাস। তাদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি মূলত চার ভাগে বিভক্ত:
১. তুরস্ক (উত্তর কুর্দিস্তান): এখানে কুর্দিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১.৫ থেকে ২ কোটি)।
২. ইরান (পূর্ব কুর্দিস্তান): দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে বিশাল এক কুর্দি জনগোষ্ঠী বাস করে।
৩. ইরাক (দক্ষিণ কুর্দিস্তান): সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর এখানে তারা একটি ‘স্বায়ত্তশাসিত’ অঞ্চল (KRG) গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।
৪. সিরিয়া (পশ্চিম কুর্দিস্তান): উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় ‘রোজাতা’ নামে পরিচিত অঞ্চলে তারা বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ভাষা ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য
কুর্দিদের প্রধান ভাষা ‘কুর্দি’, যার রয়েছে শক্তিশালী সাহিত্যিক ভিত্তি। তবে ভৌগোলিক কারণে এর বেশ কিছু উপভাষা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে কুর্মানজি ও সোরানি প্রধান। এছাড়া জাজাকি ও গোরানি নামের আরও কিছু আঞ্চলিক উপভাষাও রয়েছে।
ধর্মীয়ভাবে কুর্দিদের সিংহভাগ সুন্নি মুসলিম। বিশেষ করে শাফেয়ি মাজহাব অনুসরণকারী সুন্নির সংখ্যা বেশি। তবে তাদের মধ্যে শিয়া মুসলিম, আলবীয় এবং ইয়াজিদি ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্ব রয়েছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
কুর্দি সমাজ মূলত গোত্রভিত্তিক হলেও গত কয়েক দশকে সেখানে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনার ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। কুর্দিদের সংস্কৃতি পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক, লোকসঙ্গীত, নৃত্য এবং মৌখিক সাহিত্য তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুর্দিদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো নওরোজ, যা বসন্তের আগমনী উৎসব এবং নতুন বছরের সূচনা হিসেবে উদ্যাপিত হয়।
রাজনৈতিক সংকট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের ‘সেভ্রেস চুক্তিতে’ কুর্দিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে ‘লুজান চুক্তির’ মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই তারা তুরস্ক, ইরান ও সিরিয়ায় দমন-পীড়নের শিকার হয়ে আসছে। ইরাকে তারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও তুরস্ক ও সিরিয়ায় তাদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চলছে।
রপর থেকেই বিভিন্ন দেশে কুর্দি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে। তুরস্কে কুর্দি রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য সংগঠন হলো Kurdistan Workers’ Party (PKK), যা বহু বছর ধরে তুর্কি সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। তবে বর্তমানে সেখানে সরকারের সাথে চুক্তির পর শান্তি বিরাজ করছে।
অন্যদিকে ইরাকে কুর্দিরা তুলনামূলকভাবে বেশি রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। ২০০৩ সালের পর সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় Kurdistan Regional Government (KRG), যা উত্তর ইরাকের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন পরিচালনা করে।
সিরিয়ায় নতুন শার আল শারার সরকারও কুর্দিদের সাথে সমঝোতা, অধিকতর অধিকার দানের মাধ্যমে শান্তির দিকে যাচ্ছে।
ইতিহাসের পাতায় প্রমিনেন্ট কুর্দি ব্যক্তিত্ব
কুর্দি জাতি বিশ্বকে অনেক প্রভাবশালী নেতা ও চিন্তাবিদ উপহার দিয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন:
-
সালাহউদ্দিন আইয়ুবি: ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর এবং আইয়ুবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। ক্রুসেডারদের পরাজিত করে জেরুজালেম জয় করা এই মহান সেনাপতি ছিলেন জাতিগতভাবে একজন কুর্দি।
-
জালাল তালাবানি: আধুনিক ইরাকের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট। তিনি কুর্দিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আজীবন নেতৃত্ব দিয়েছেন।
-
আবদুল্লাহ ওকালান: কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (PKK) প্রতিষ্ঠাতা। তুরস্কের কুর্দিদের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলনের প্রধান তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে তিনি পরিচিত।
-
নাদিয়া মুরাদ: ইয়াজিদি কুর্দি মানবাধিকার কর্মী, যিনি আইএস (ISIS) এর বর্বরতার বিরুদ্ধে কথা বলে ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল জয় করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে কুর্দিরা এখন এক অনিবার্য শক্তি। বিশেষ করে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস (ISIS) দমনে তাদের অসামান্য বীরত্ব বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। তবে নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন আজও তাদের কাছে এক অমীমাংসিত অধ্যায় হয়েই রয়ে গেছে।
