সবুজে নীলে আঁচলে
বান্দরবান শহর ছাড়িয়ে নীলাচলের পথে উঠতে শুরু করলেই মনে হয়, আপনি আর স্রেফ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন না—ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছেন পাহাড়ের আড়ালে লুকানো গোপন পথে। দুই ধারে সবুজের দেয়াল, যেন কোনো দূর শত্রুর দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দিচ্ছে।
ছোট শহর, গাড়ির চাকা কয়েক পাক খেতেই শহর থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের রাজত্বে চলে যায়। সেই রাজত্বে বাঁকের পাইকারি সরবরাহ — গাড়ি বাঁক নিতে থাকে, আর আপনি অজান্তেই জানালার হাতল চেপে ধরে থাকেন। আগের রাতে মনে হয় বৃষ্টি হয়েছে। পাতাগুলো যেন ঝকঝক করছে।
এই রাস্তার আসল সৌন্দর্য তার সোজা পথে নয়—তার বাঁকে বাঁকে। প্রতিটা বাঁক যেন আলাদা দৃশ্যপট খুলে দেয়। আর সিএনজি যতই এগুতে থাকে ততই আকাশের জগৎ মেলে ধরতে থাকে। তখন পাহাড়ের দেয়াল পেরিয়ে আসলে পাহাড়ের উপরেই উঠে গিয়েছি। দুই পাশে দেয়ালের বিপরীত ঢাল। এক বাঁক পেরোলেই ডান পাশে গভীর খাদ, তার নিচে ঘন সবুজ জঙ্গল; আরেক বাঁকে হঠাৎ বাঁ পাশে উঁচু পাহাড়ের গা।
নীলাচলের কাছে পৌঁছানোর আগের শেষ পথটুকো সবচেয়ে নাটকীয়, রাস্তা আরও খাড়া, কিন্তু দৃশ্য—অসাধারণ। উচু থেকে আরও উচুতে উঠা, সিএনজি তার বেদনা প্রকাশ করে তবু অনীহা নয়। দূরে পাহাড়ের সারি, স্তরে স্তরে, সবুজের শেড বদলাতে বদলাতে নতুন নতুন রেখা তৈরি করে আরও দূরে মিলিয়ে গেছে। তখন ডানে বামে আর কিছু নেই, নীল আকাশ, সাদা মেঘ। সবুজ পাহাড়ের উপর কুয়াশা ছড়িয়ে সবুজের দাপট কমিয়ে কেমন যেন একটা নীল আভা তৈরি করে, তার উপর নীল আকাশ —সেই থেকেই বোধহয় নাম রাখা হয়েছে “নীলাচল”!
ভিও পয়েন্টের কিছুটা আগে আমাদের নামতে হল। তখন টিকিট কাউন্টার ছিল, কিন্তু টিকিট লেগেছিল কিনা মনে পড়ে না। পর্যটক ছিল খুবই কম। সূর্যালোকিত, ঝকমকে। অনেকগুলো ফ্যান্সি টুল, বসে ছবি তোলার জন্য, সবুজ আর নীলে ব্যাকগ্রাউন্ডে আজীবনের স্মৃতি তৈরি করার মত। নীলাচলের সিড়ি, টুল, বাগানের ফুল, যতটা সুন্দর, উপভোগ্য তার চে বেশি বিস্ময়কর চারদিকের পৃথিবী।

এতো দূরে দৃষ্টি কোনোদিন দেখার সুযোগ পায় নি। পাঁচ কিলোমিটার, সরসরি দূরত্ব হয়তো একটু কম, পুরো বান্দরবান শহর দেখা যাচ্ছিল, সবুজের মাঝে মাথা উচু করে দাড়ানো দালান, আরও দূরে বৌদ্ধ মন্দির। কাছে ঢেও খেলানো পাহাড় আর বন, মাঝে মাঝে জুমিয়াদের কৃষি ক্ষেত্র। জুম পদ্ধতিতে চাষ করা হয়েছে খুব অল্প যায়গায়। আমি চেষ্টা করেছি দৃষ্টির প্রতিটা ইঞ্চি দেখার। সবুজ আর নীলের এমন শিল্প আগে দেখা হয় নি। সবচে’ উচু যে পাহাড়টা তার উপর মেঘেরা এমনভাবে পুঞ্জিভূত হয়ে তারপর চারপাশে ডানা মেলে দিয়েছে দেখে মনে হয় পাহাড়টা যেন আগ্নেয়গিরি আর মেঘগুলো অগ্নুৎপাত।

এই সৌন্দর্য্যের ছবি তুলতে তুলতে আমার ক্যামেরাটা দিকবিদিক হারিয়ে ফেলল, আর ছবি উঠল না। বান্দরবানের বাকি সময়টা রকের ক্যামেরায় ছবি তুলতে হয়েছে, রক দিয়েছেও। আমি বেছে বেছে শুধু আমার তোলা ছবিগুলো আলাদা করে রেখেছি।

শহরের ভেতর ছোট পাহাড়
নীলাচল থেকে ফেরার পর কিছু বেকার সময় আছে। হোটেলটার উল্টো দিকে রাস্তার পাশে কয়েকটা ছোট ছোট পাহাড়, আসলে রাস্তাটাই পাহাড়ের পাশ দিয়ে গিয়েছে। আমাদের খাবার ব্যবস্থা এখানেই কোথাও হয়েছিল, তবু তখনও রুম দেয় নি। পথের ধারে হোটেলের একপাশে কিছু চেয়ার রাখা ছিল। সেখানে আমি রক ও আমি বসে গল্প করছিলাম, দূরে পাহাড়সারি দেখা যাচ্ছিল। গল্প কিছুটা উচ্চমর্গে চলে গিয়েছিল। তার মধ্যে রকের কয়েকটা কথা এখনও মনে আছে। সে কেন ধর্মচর্চা করে তার ব্যাক্ষা দিচ্ছিল, পরকাল থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। ধর্ম বিশ্বাস করার পরও যদি পরকাল না থাকে তবে বড় লস নেই। কিন্তু বিশ্বাস না করার পর যদি পরকাল থাকে তবে কী হবে! তাই ঝুকি দূর করতেই সে ধর্মচর্চা করাই নিরাপদ।

সময় থাকায় আমরা কয়েকজন পাহাড়গুলোতে উঠলাম, রাস্তাটা আসলে এইসব পাহাড়ের ধার কেটেই বানানো হয়েছে। যেহেতু বেশি উচু নয় আবার পায়ে হাটার পথ আছে, তাই সহজে উঠে যাওয়া গেল। বান্দরবানের উচু উচু খাড়া পাহাড়গুলোর মত না, সবুজ গাছে ছাওয়া টিলা। অল্প সময়ে সবুজ প্রকৃতিতে বেশ ভাল লাগল।
মেইন রোড থেকে দুটো রাস্তা একটা বট গাছের কাছে এসে এক হয়ে গিয়েছে। তারপর চিম্বুকের মোকাম ধরে চলে গিয়েছে আরও দূরে, আরও নীলে, নীলগিরিতে। ২০২৬ এক শীতের সকালে বৌ-বাচ্চাদের নিয়ে ওই বটগাছটার উল্টো দিকে একটা হোটেলে ঢুকলাম নাস্তা করতে। আমরা যে হেটেলটিতে উঠেছি সেটা তিন রাস্তার মোড়ে বটগাছটার কাছেই, একটু হেটে এগুলেই প্রথমবারের হোটেলটা দেখতে যেতে পারতাম। কিন্তু আড়াই দিনে সেই সময় করতে পারি নি।
আমাদের দলের সবাই ঢাকা থেকে বাসে এসেছে, তারা খুব ভোরে চলে এসেছে। আমরা এসেছি চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রেনে, তারপর বাকিটা বাসে। দীর্ঘ পথ বাচ্চাদের নিয়ে বাসে ভ্রমণ করা কষ্টকর হবে, তাই দলছুট হয়েও ট্রেনে এসেছি।
সাকলে সবাইকে রুম না দিলেও দুটো রুম দিয়েছিল রেস্ট নেবার জন্য। সেখাবে ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে বেরিয়েছি। বাকির আগেই নাস্তা করে ফেলেছে, তারা যে হোটেলে নাস্তা করেছে আমরাও সেখানে করলাম। এখনও রোদ উঠেনি, কুয়াশা ঢাকা পরিবেশ। বেলা এগারোটার দিকে আমাদের রুম দিল। দুই দিন থাকব বলে ব্যালকনিওয়ালা রুমটা নিলাম। যদি আলসেমি ধরে, বা বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ততার মাঝে একটু সময় হয় তবে ব্যালকনিতে দাড়িয়ে বান্দরবানের পাহাড়ি সৌন্দর্যের কর্পোরেট প্যাকেজটাতো দেখা যাবে! বাকিরা একদিন থাকবে, ব্যালকনি ছাড়া রুমেই থাকুক। হৈমন্তীরাও অবশ্য ব্যালকনি নিয়েছে আমাদের ঠিক নিচের তলাতে।
ব্যালকনি দিয়ে তাকালে দূরে পাহাড়সারি দেখা যায়, তার আগে বড় একটা মাঠ। মাঠের পাশে রাস্তা, যে রাস্তা দিয়ে আমরা এসেছি, তবে রাস্তাটা চিনতে আমার একটু সময় লেগেছে। মাঠের এপাশটায় একটা কাঠাল গাছ। অবাক ব্যাপার এই শীতে সেই কাঠাল গাছে একটা কাঠাল ধরে আছে! আর আছে কয়েকটা পাখির উড়াউড়ি, বসে থাকা।
মেঘলা যেতে পেট ব্যাথা
মেঘলা ও নীলাচল যেতে চান্দের গাড়ি ভাড়া করা হয়ে গেছে। কলিগরা বার বার তাড়া দিচ্ছে গাড়িতে উঠতে। আমরা চারজনের দল রেডি হয়ে সারতে পারছি না। বেরুতে বেরুতে ১১টার বেশি। উঠতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। আমরা দুটো গাড়িতে ভাগ হয়ে বসেছি। মেয়েরা আমার পাশে। গাড়ি ছাড়তেই টের পেলাম ঝাকুনি। সমতল রাস্তাতেই সামান্য উচুনিচুতে প্রবল ঝাকি দেয়। মেয়ের মাথার পেছনে হাত দিয়ে রাখতে হল যেন লোহায় আঘাত না পায়, আবার সামনেও ধরতে হল যেন পড়ে না যায়, কলিগরা অবশ্য সাহায্য করল।
পেটে হালকা ব্যাথা, গত রাতের মত। সন্ধ্যা থেকে হালকা ব্যাথা ছিল। রাতে একটু বাড়লেও শেষ রাতে ঘুমের পর আর ছিল না। সেটাই এখন ফিরে এসেছে।
[আপডেট হবে]
– পারভেজ রবিন
theuglyasian.wordpress.com
