বেকার হয়ে যাচ্ছে দোহার থানার পুলিশ!

কাজ নেই দোহার থানা পুলিশের! মামলা নেই। তাই নেই তদন্তের ঝামেলাও। যে কারণে কাজকর্মেও নেই বাড়তি চাপ। এক ধরনের ফুরফুরে মেজাজেই রয়েছেন এখানকার পুলিশ সদস্যরা। মামলার অভাবে বলতে গেলে দৃশ্যত অবসর সময়ই কাটছে তদন্তকারীদের।

হটাৎ করেই মামলার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঠিক উল্টো চিত্র এখন থানাজুড়ে। এসব কারণে একদিকে নাগরিক জীবনে যেমন স্বস্তি, তেমনি আবার উল্টো দিকে মাথায় হাত পড়েছে অনেকের।

সেটা আবার কাদের? ‘এই যেমন ধরুন, রাইটার, দালাল, তদবিরবাজ, কথিত গণমাধ্যমকর্মী, স্বার্থোদ্ধারকারী আইনজীবী, মুহুরী, আদালতের কর্মচারী, ধান্ধাবাজ। থানার অপরাধ প্রবণতার ওপর নির্ভরশীল এমন অনেক পেশার মানুষরাই দৃশ্যত পড়েছেন কর্মসংকটে’— অপরাধ চিত্রের খতিয়ানের পৃষ্ঠা উল্টে সহাস্যে এমনটিই বলছিলেন দোহার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান।

‘এই সফলতার চিত্রে জেলা পুলিশের কর্মকর্তাদের মুখে এখন চওড়া হাসি। আর এই সাফল্যের চিত্রটাকেই মডেল ধরে এখন অন্যান্য থানায় তা কার্যকরের কথা ভাবা হচ্ছে। আসলে সাহস আর সততা। এই দুয়ের সমন্বয়ে ভালো যা কিছু হয়। সেটারই প্রমাণ করেছেন এসপি শাহ মিজান শাফিউর রহমান স্যার’— বলছিলেন মাহবুবুর।

দোহার থানায় অপরাধ চিত্রের খতিয়ান ঘেঁটে দেখা যায়, গত জুন মাসে সর্বসাকুল্যে এই থানায় মামলা হয়েছে মাত্র দু’টি। যার একটি মোটরসাইকেল চুরি। অন্যটি মাদক উদ্ধারের মামলা।

যে থানা এক সময় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি আর খুনের জন্য রীতিমতো ছিল আতংকের। কী করে সেই থানার চিত্র এভাবে পাল্টা গেলো?

‘সবই সিস্টেম। গুণগত নেতৃত্ব। সাহসী সিদ্ধান্ত। এককথায় গুড পুলিশিং। যে সফলতার নেপথ্যে আমাদের পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান স্যার’— বলছিলেন দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম শেখ।

‘বলতে পারেন স্যারের নেতৃত্বে জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততা তৈরির মাধ্যমেই এই সফলতা। আগে মানুষ থানায় যেতে ভয় পেতো। এখন জনগণই থানার পুলিশকে ভাবছে বন্ধু। যারা অপরাধী তাদের সামাজিকভাবে জনগণ বয়কট করছে। প্রতিবাদ করছে। প্রতিহত করছে। এক কথায় সফল কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কারণেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই পাল্টে যাওয়া চিত্র’— যোগ করেন সিরাজুল ইসলাম শেখ।

অন্য খবর  জলাবদ্ধতা: পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের প্রধান যন্ত্রণা

দোহার থানাকে অনেকেই চেনেন ‘ভিভিআইপি থানা’ হিসেবে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের জন্মস্থান এই দোহার। এছাড়া আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয় জোটের (বিএনএ) চেয়ারম্যান ব্যরিস্টার নাজমুল হুদার নির্বাচনী এলাকাও দোহার।

যে কারণে এই থানায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির হেরফের হলেই থানার ওসির চেয়ারেও লাগে ঝাঁকুনি। তবে এখন উল্টো পরিস্থিতি।

‘আগে খুনের মতো অপরাধ হলেও কে কার দলের। কার কাছের লোক। প্রভৃতি বিষয় মাথায় রাখতে হতো। আবার মামলার চার্জশিট দিতে গেলেও রাঘববোয়ালদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সেসব দিনগুলোতে পুলিশকে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’র মতো বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতো। তবে অপরাধপ্রবণতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনায় সেসবের আর বালাই নেই’— বলছিলেন দোহারে দায়িত্ব পালন করা মাঝারি গোছের একজন কর্মকর্তা।

ঢাকার রমনা জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) থেকে শাহ মিজান শাফিউর রহমান ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেন গত বছরের ১৬ জুন।

এর আগে কেবল সততা আর সাহসকে আশ্রয় করেই সন্ত্রাসের জনপদ বলে পরিচিত ফেনীর গড ফাদারদের রাজত্ব ভেঙে দিয়ে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে পথে এনে আলোচনায় আসেন পুলিশের ২০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা।

পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই ছক কষেন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি তা টেকসই করার।

অন্য খবর  মুকসুদপুর স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকের মৃত্যু

‘অপরাধ সংগঠনের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’ নীতি সামনে রেখে পদক্ষেপ নেন সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির। ‘পুলিশ হবে জনগণের প্রকৃত বন্ধু। আবার জনগণই পুলিশ’ এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পাড়া-মহল্লায় চলে কমিউনিটি পুলিশের নানা পদক্ষেপ।

‘আর ফলাফলটাও আসতে শুরু করে অল্প সময়ের ব্যবধানে। দোহার থানাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। আমরা বলি দোহার এখন শান্তির থানা। যারা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন তারাও কাজ করছেন শান্তি আর স্বাচ্ছন্দ্যে’— বলছিলেন পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান।

খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা বলেই কি বাড়তি কোনো পদক্ষেপ? ‘আসলে তা নয়। আমাদের শুরুটা এখান থেকে। ফলটাও আসতে শুরু করেছে দোহার থেকে। জেলার অপরাধপ্রবণতা প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অপরাধের ধরন, এমনকি অপরাধের গতি-প্রকৃতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। যে কারণে অপরাধ সূচক বলতে গেলে গোটা জেলাতেই নিম্নগামী।’

২০১৬ সালের জুন মাসে এই থানায় মামলা হয়েছে ১৪টি। ঠিক তার আগের বছর ২০১৫ সালের জুন মাসে মামলা হয়েছে ১১টি। আর চলতি বছরের জুনে মামলা হয়েছে মাত্র দু’টি। তার একটি আবার মাদক উদ্ধারের মামলা।

‘এই যে পরিবর্তন। এটাকেই মডেল ধরে আমরা ছড়িয়ে দিতে চাইছি অন্যান্য থানায়। যার ধারাবাহিকতায় লাগোয়া নবাবগঞ্জ থানায় মামলার সংখ্যা কমে গেছে।

এই যে মামলার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এটার মানে এই নয় যে, মামলা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করা বা কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা যাচাই করে দেখেছি, প্রকৃত অর্থেই মামলা কমে গেছে। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ এই বার্তাটাই আমরা পৌঁছে দিতে পেরেছি। আর এভাবেই আমরা এগিয়ে চলেছি’— বলেন পুলিশ সুপার।

শাহ মিজান শাফিউর রহমানের আশাবাদ, ‘আমরা স্বপ্ন দেখি, দোহারের মতো জেলার অন্যান্য থানাগুলোও হবে সন্ত্রাস, মাদক, সর্বোপরি মামলামুক্ত।’

আপনার মতামত দিন