বাংলাদেশের সব ঝর্ণার তালিকা ও অবস্থান | প্রকৃতি ভ্রমণ

প্রকাশ:

শেয়ার করুন:

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে ঝর্ণাগুলো এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্ণার জলরাশি শুধু যে চোখের তৃপ্তি মেটায় তা নয়, বরং ভ্রমণপিপাসু হৃদয়ে এক অন্যরকম আনন্দও জাগায়। আমাদের দেশে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য মনোমুগ্ধকর ঝর্ণা। বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে এসব ঝর্ণার জলধারা পাহাড়ি ঢালের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানির চাপ, নদীর গতিপথ ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে সময়ের সাথে সাথে এসব ঝর্ণা তৈরি হয়েছে।

এই প্রতিবেদনে আমরা বাংলাদেশের জনপ্রিয় এবং কম পরিচিত সব ঝর্ণার তালিকা ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেছি, যা আপনাকে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত গন্তব্য খুঁজে নিতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশে ঝর্ণাগুলো কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে:

বাংলাদেশের বেশিরভাগ ঝর্ণা গঠিত হয়েছে প্রাকৃতিক ভূ-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের উঁচুনিচু ভূমি ও ঢালের কারণে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় জলধারা তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ধরে পানির ক্ষয়প্রক্রিয়া (erosion) ও মাটির পরিবর্তনের ফলে এসব প্রবাহিত পানি একটি নির্দিষ্ট পথে পড়ে যায় এবং নিচের দিকে ঢালু হয়ে তৈরি হয় ঝর্ণা। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ি ছোট নদী বা ছড়ার পানি গড়িয়ে আসতে আসতে বড় আকারের জলপ্রপাত তৈরি করেছে। বৃষ্টির মৌসুমে এগুলোতে অনেক পানি প্রবাহিত হয়, তখন দেখতে সুন্দর লাগে, এবং ঝণায় ঘুরতে যাবার ওটাই সেরা সময়। আবার শুষ্ক মৌসুমে কিছু ঝর্ণায় পানির প্রবাহ কমে আসে বা একেবারে শুকিয়ে যায়।

বাংলাদেশের ঝর্ণাগুলো দুটো পাহারি অঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সসবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগেই শুধু আছে।

বাংলাদেশের সবচে’ সুন্দর দশটি ঝর্ণা:

১. নাফাখুম ঝর্ণা (বান্দরবান)

নাফাখুম বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঝর্ণা, যা বান্দরবানের থানচি উপজেলায় অবস্থিত। এটি রেমাক্রি নদীর ওপর গঠিত এবং বর্ষাকালে প্রবাহ সবচেয়ে বেশি থাকে।

২. আমিয়াখুম ঝর্ণা (বান্দরবান)

থানচির গভীর জঙ্গলে অবস্থিত আমিয়াখুম ঝর্ণা হলো একটি দৃষ্টিনন্দন জলপ্রপাত, যেখানে পৌঁছাতে ট্রেকিং করতে হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্জন পরিবেশ একে বিশেষ করে তুলেছে।

৩. মাধবকুণ্ড ঝর্ণা (মৌলভীবাজার)

বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত ও পর্যটনবান্ধব ঝর্ণা হলো মাধবকুণ্ড। এটি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত। একটা সময় পর্যন্ত মানুষ ঝর্ণা বলতে মাধবকুণ্ডই চিনত।

৪. হাম হাম ঝর্ণা (সিলেট)

কমলগঞ্জের রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের গভীরে অবস্থিত হাম হাম ঝর্ণা একটি বড় আকৃতির জলপ্রপাত, যেখানে ট্রেক করে যেতে হয়।

৫. তিনাপ সাইতার ঝর্ণা (বান্দরবান)

থানচির খুব দূরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত তিনাপ সাইতার ঝর্ণা বাংলাদেশে অন্যতম বড় ঝর্ণাগুলোর একটি বলে ধরা হয়। স্থানীয় ভাষায় “সাইতার” মানে ঝর্ণা।

৬. খৈয়াছড়া ঝর্ণা (মিরসরাই )

৭. সুপ্তধারা-সহস্রধারা (চট্টগ্রাম)

৮. দামতুয়া ঝর্ণা (লামোনাই ঝর্ণা)

৯. বাকলাই ঝর্ণা (থানচি)

এর উচ্চতা প্রায় ৩৯০ ফুট যা বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার বাকলাই গ্রামে অবস্থিত।

১০. জাদিপাই ঝর্ণা (বান্দরবান)

১১. ধুপপানির ঝর্ণা (রাঙ্গামাটি)

১২. রাইক্ষং ঝর্ণা (বিলাইছড়ি)

বাংলাদেশের সব ঝর্ণা’র তালিকা:

সিলেট

  • কুলুমছড়া (গোয়াইনঘাট)- এটি আসলে ছড়া, প্রপাত নয়
  • সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা (জাফলং)
  • শ্রীপুর চা-বাগান ঝর্ণা (জৈন্তাপুর)
  • শ্রীপুর মরা ঝর্ণা (জৈন্তাপুর)
  • খড়মপুর আদুরী ঝর্ণা (জৈন্তাপুর)

মৌলভিবাজার

  • পরিকুণ্ড ঝর্ণা (বরলেখা)
  • মাধবকুণ্ড ঝর্ণা (বরলেখা)
  • হামহাম ঝর্ণা (রাজকান্দি)- মৌলভিবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বনের গহিনে এই বিশাল ঝর্ণাটি লোক চক্ষুর আড়ালেই ছিল। একজন এনজিও কর্মকর্তা এটি আবিষ্কার করেন। স্থানীয় অধিবাসীরা ঠিকই জানত এর কথা।

সুনামগঞ্জ

  • লালঘাট ঝর্ণাধারা (তাহিরপুর)

চট্টগ্রাম

  • সুপ্তধারা ঝর্ণা
  • সহস্রধারা
  • বাওয়াছড়া ঝরনা
  • নাপিত্তাছড়া
  • মহামায়া
  • হাটুভাঙ্গা
  • বাঘবিয়ানী
  • বোয়ালিয়া
  • অমরমাণিক্য
  • বাউশ্যাছড়া
  • নেহাতেখুম
  • উঠান
  • বান্দরখুম
  • রূপসী ঝর্ণা চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়ন এর পূর্ব পোলমোগরা ০৫ নং ওয়ার্ডের পাহাড়ে অবস্থিত একটি জলপ্রপাত।
  • ঝরঝরি ঝর্ণা
  • কমলদহ ঝর্ণা (সীতাকুণ্ড)
  • বাড়বকুণ্ড অগ্নি ঝর্ণা
  • বাড়বকুণ্ড ত্রি-পল ঝর্ণা
  • সোনাইছড়া ঝর্ণা
  • হরিণ মারা ঝর্ণা (মিরসরাই)
  • ছাগলকান্দা ঝর্ণা (সীতাকুণ্ড)

কক্স’সবাজার

  • জলদী ঝর্ণা (চকরিয়া): চকরিয়ার জলদী ইউনিয়নের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত জলদী ঝর্ণা, যা একটি কম পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত সুন্দর ঝর্ণা।
  • হিমছড়ি ঝর্ণা – শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না, তখন মোটার দিয়ে পানি প্রবাহিত করে

খাগড়াছড়ি

  • রিছাং ঝর্ণা (খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা)- এর অপর নাম তেরাং তৈকালাই।
  • তৈছামা ঝর্ণা
  • তৈলাফাং ঝর্ণা
  • তুয়ারি মাইরাং
  • তৈদুছড়া ঝর্ণা (দীঘিনালা)
  • কমলক ঝর্ণা (সাজেক)
  • সিজুক ঝর্ণা (দীঘিনালা)
  • তেজেংমা ঝর্ণা (দীঘিনালা)
  • বড়পাড়া ঝর্ণা (মাটিরাঙ্গা)- খাগড়াছড়ি জেলা ধীন মাটিরাঙ্গা উপজেলার বড়নাল ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড বড়গ্রাম পাড়ায় এই ঝর্ণাটি অবস্থিত।

বান্দরবান

  • তিনাপ সাইতার (রোয়াংছড়ি)
  • শীলবান্ধা ঝর্ণা (ছালাওয়া ঝর্ণা) (রোয়াংছড়ি)
  • রেমাক্রি ঝর্ণা (থানচি): থানচি ভ্রমণের সময় রেমাক্রি ঝর্ণা অন্যতম আকর্ষণ। রেমাক্রি খালের উপর অবস্থিত এই ঝর্ণা সাধারণত নাফাখুম যাওয়ার পথে দেখা যায়।
  • দামতুয়া ঝর্ণা (আলিকদম): বান্দরবানের আলিকদম উপজেলায় অবস্থিত এই ঝর্ণাটি অপেক্ষাকৃত কম ভ্রমণ করা হয়, ফলে এর পরিবেশ একেবারে প্রাকৃতিক ও শান্ত।
  • ঋজুক ঝর্ণা ()
  • চিংড়ি ঝর্ণা
  • জাদিপাই ঝর্ণা
  • লাংলোক ঝর্ণা বা লিলুক ঝর্ণা: বান্দরবানের তিন্দু থেকে কিছু দূরে অবস্থিত একটি ঝর্ণা যা কিছুদিন আগে লোকচক্ষুর সামনে এসেছে।
  • উদোতয় ঝর্ণা, মাঝের পাড়া, সুয়ালক, বান্দরবান সদর উপজেলা
  • জিংসিয়াম সাইতার ঝর্ণা
  • লুং ফের ভা সাইতার
  • বাকলাই ঝর্ণা (থানচি)
  • ত্লাবং ঝর্ণা (ডাবল ফলস)
  • ফাইপি ঝর্ণা
  • বড়ইতলী ঝর্ণা (নাইক্ষ্যংছড়ি)- ফাত্রাঝিরি ঝর্ণা
  • তুইনুম ঝর্ণা (আলিকদম)
  • রুপমুহুরী ঝর্ণা (আলিকদম)
  • পোয়ামুহুরী ঝর্ণা (আলিকদম)
  • ওয়াং পা ঝর্ণা (আলিকদম)
  • পালং খিয়াং ঝর্ণা (তাংখোয়াইন ঝর্ণা) (আলিকদম)
  • পাতাং ঝর্ণা
  • লিখ্যিয়াং ঝর্ণা
  • তুই কু তুমু ঝর্ণা
  • লাংলোক ঝর্ণা (লিলুক ঝর্ণা) (থানচি)
  • বাক্তলাই ঝর্ণা (থানচি)
  • লাদমেরাখ ঝর্ণা (আলিকদম)
  • থান কোয়াইন ঝর্ণা (আলিকদম)
  • সাইংপ্রা ঝর্ণা (আলিকদম)
  • শৈনগং ঝর্ণা (থানচি)

রাঙামাটি

  • রাইক্ষং ঝর্ণা (বিলাইছড়ি)
  • ন-কাবা ছড়া ঝর্ণা (বিলাইছড়ি)
  • গাছকাটা ঝর্ণা (বিলাইছড়ি)
  • শুবলং ঝর্ণা
  • ধুপপানি ঝর্ণা
  • ঘাগড়া তৈমা ঝর্ণা (কলাবাগান ঝর্ণা)
  • সিকাম তৈসা ঝর্ণা
  • হাজাছড়া ঝর্ণা (শুকনাছড়া ঝর্ণা)
  • মুপ্পোছড়া ঝর্ণা

ঝর্ণায় যেতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস

  • সঠিক মৌসুম বেছে নিন: ঝর্ণাগুলো সাধারণত বর্ষাকালে সবচেয়ে প্রাণবন্ত থাকে। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় পাহাড়ি রাস্তা বিপজ্জনক হতে পারে, তাই পরিকল্পনা করে যাত্রা করুন।

  • পর্যাপ্ত পানি ও খাবার নিন: অনেক ঝর্ণায় পৌঁছাতে দীর্ঘ ট্রেকিং করতে হয়, তাই সাথে পানীয় জল ও হালকা খাবার রাখুন।

  • ট্রেকিং জুতা পরুন: পাথুরে ও পিচ্ছিল পথের জন্য ভালো গ্রিপযুক্ত জুতা পরা নিরাপদ।

  • স্থানীয় গাইড নিন: দূর্গম বা কম পরিচিত ঝর্ণায় যাওয়ার সময় স্থানীয় গাইড নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ, এতে পথ হারানোর ঝুঁকি কমবে।

  • পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন: ঝর্ণার আশেপাশে প্লাস্টিক, খাবারের মোড়া ইত্যাদি ফেলবেন না। প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকুন।

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ সংবাদ

এই রকম আরও

বান্দরবান ভ্রমণ – নীলাচল ও মেঘলায় (দ্বিতীয় পর্ব)

সবুজে নীলে আঁচলে বান্দরবান শহর ছাড়িয়ে নীলাচলের পথে উঠতে শুরু করলেই মনে হয়, আপনি আর স্রেফ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন...

বান্দরবান ভ্রমণ – এক যুগের এপাড় ওপাড় (সূচনা পর্ব)

প্রথমবার বান্দরবান যাবার আগে মনে কোনো উত্তোজনা কাজ করছিল কিনা মনে নেই। যদিও প্রথম পহাড় দেখা নয় তবু...

আড়িয়াল বিল শুধু বর্ষায় নয়; শুষ্ক মৌসুমেও মন কাড়ে

ধারণা করা হয়, অতি প্রাচীন কালে এ স্থানে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থল ছিল। পরবর্তিতে উভয় নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের...

ঘুরে আসলাম কিশোরগঞ্জের শহীদি মসজিদ

আমি যখনই কিশোরগঞ্জ শহরে কোন কাজে আসি তখনই প্রথম মনে হয় শহীদি মসজিদের কথা। যতবার এখানে এসেছি এই...