ড্যান ব্রাউন। যারা ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কে খোজ কবর রাখেন তাদের কাছে নামটা অতি পরিচিত। তাদের কাছে ড্যান ব্রাউন মানে এক জাদুকর। যিনি কলমের জাদুতে ধরে রাখেন পাঠকের সম্পূর্ন মনযোগ। যার একটা উপন্যাস মানে একটা জাদুর বাক্স। আজ এই জনপ্রিয় সাহিত্যিকের কথা আলোচনা করব। বলা হয়ে থাকে কোরআন আর বাইবেলের পর ড্যান ব্রাউনের বই মানুষ সবচেয়ে বেশি পড়ে।

ড্যান ব্রাউন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক্সিটারে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে উঠেন। পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যে তিনিই বড়। তাঁর মা কনস্টান্স (কনি) ছিলেন পেশাদার বাদক যিনি চার্চে অর্গান বাজাতেন। তাঁর বাবা রিচার্ড জি. ব্রাউন ছিলেন একজন  বিখ্যাত গণিতশিক্ষক যিনি ১৯৬৮ থেকে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফিলিপ্স এক্সিটার একাডেমিতে মাধ্যমিক গণিত পড়াতেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

ফিলিপ্স এক্সিটার একাডেমি একটি উঁচুমানের আবাসিক বিদ্যালয় যেখানে নতুন শিক্ষকদের বিদ্যালয়ের ভেতরেই থাকতে হয়। এই সূত্রেই ড্যান ব্রাউন এবং তাঁর পরিবারের সবাই স্কুলের ভেতরেই থাকতেন। এক্সিটারের সামাজিক প্রতিবেশ ছিল সম্পূর্ণ খ্রিস্টানপন্থী। ব্রাউন চার্চে ঐকতান সঙ্গীত গাইতেন এবং সানডে স্কুল করতেন, আর  গ্রীষ্মের সময়টা চার্চেরই শিবিরে কাটাতেন। ব্রাউনের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কাটে পাবলিক স্কুলগুলোতে। নবম গ্রেড পর্যন্ত সেখানে পড়ার পর তিনি ফিলিপ্স এক্সিটারে ভর্তি হোন এবং ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তাঁর ছোট ভাইবোনের মধ্যে ভ্যালেরিন ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে এবং গ্রেগরি ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে এক্সিটার থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে।

ফিলিপ্স এক্সিটার থেকে স্নাতক শিক্ষা শেষ করার পর ব্রাউন অ্যামহার্স্ট কলেজে যোগ দেন; সেখানে তিনি সাই আপসাইলন নামক ভ্রাতৃসংঘের সদস্য ছিলেন। সেখানে স্কোয়াশ খেলা আর অ্যামহার্স্ট গ্লি ক্লাবে গান গেয়ে দিন কাটতো তাঁর। একইসাথে ঔপন্যাসিক অ্যালান লেলচাকের একজন ছাত্র হিসেবে তাঁর লেখায় সহযোগিতা করতেন।

১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে অ্যামহার্স্ট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর একজন পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মূলত শিশুতোষ ক্যাসেট দিয়ে যাত্রা শুরু তাঁর। প্রথম দিকের ক্যাসেটগুলোর মধ্যে রয়েছে: সিন্থঅ্যানিমেল্স, হ্যাপি ফ্রগ্স এবং সুজুকি এলিফ্যান্ট্স যার মাত্র কয়েকশো কপি বিক্রি হয়েছিলো। এরপর তিনি নিজের রেকর্ডিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, নাম দেন ড্যালিয়েন্স। তাঁর কোম্পানি থেকে প্রকাশিত প্রথম সিডি ছিলো পার্সপেক্টিভ যা মূলত বড়দের জন্য ছিলো। এটিও কয়েকশো কপি বিক্রি হয়।

১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি হলিউডে যান। উদ্দেশ্য ছিলো শিল্পী, গীতিকার এবং চিত্রকর হিসেবে ক্যারিয়ার গঠন। আর্থিক সচ্ছলতার জন্য এসময় ব্রেভারলি হিল্স প্রিপারেটরি স্কুলে ক্লাস নিতেন।

লস অ্যাঞ্জেল্স-এ থাকাকালীন তিনি ন্যাশনাল একাডেমি অফ সংরাইটার্স-এ যোগ দিয়ে এর অনেক কার্যক্রমে সক্রীয় অংশহগ্রহণ করেন। সেখানেই ব্লিথ নিউলনের সাথে ব্রাউনের পরিচয় হয় যিনি তাঁর চেয়ে ১২ বছরের বড়। তিনি একাডেমির আর্টিস্ট ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক ছিলেন। নিউলন ব্রাউনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে প্রভূত সগযোগিতা করেন যদিও তা তাঁর কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। তিনি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ছাপাতেন, ব্রাউনের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক শিক্ষণের সুযোগ করে দিতেন আর তার ক্যারিয়ারের উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে এমন ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিতেন। তখন তাঁদের মাঝে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কও গড়ে উঠে যা ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের আগে কেউই জানতেন না। এই বছরই ব্রাউন নিউ হ্যাম্পশায়ারে ফিরে যান এবং নিউলন তার সঙ্গী হোন। ১৯৯৭ সালে তাঁরা নিউ হ্যাম্পশায়ারের উত্তর কনওয়ের পি পরিজ পন্ডে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোন।

অন্য খবর  বিশ্ব ভ্রমণ কাহিনী: লেখকদের সাথে পৃথিবী ঘুরে দেখা

সংগীতসংশ্লিষ্ট কাজে সহায়তা করার পাশাপাশি ব্লিথ, ড্যান ব্রাউনের লেখকজীবনেরও একটি বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন। ব্লিথ তাঁর লেখার জন্য প্রয়োজনীয় উপায় উপকরণ সংগ্রহে অনেক সহযোগিতা করেন। প্রথম দিককার রঙ্গরসাত্মক বইগুলো দুজনে একসাথেই লিখেছিলেন আর পরবর্তী বইগুলোতেও ছিলো ব্লিথের সহায়তা। ডিসেপশন পয়েন্ট বইয়ের একটি অংশে ব্রাবুন ব্লিথ ব্রাউনকে সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।

১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রাউন নিজের নামে অর্থাৎ ড্যান ব্রাউন নামে একটি সিডি বের করেন যাতে “৯৭৬-লাভ” এবং “ইফ ইউ বিলিভ ইন লাভ” নামীয় গানগুলো ছিলো।

১৯৯৩ সালে ব্রাউন এবং ব্লিথ নিউ হ্যাম্পশায়ারে ব্রাউনের বাড়িতে ফিরে যান। ব্রাউন তাঁর পূর্বতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফিলিপ্স এক্সিটারে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। একই সময় তিনি লিংকন একারম্যান স্কুলের ৬ষ্ঠ, ৭ম এবং ৮ম গ্রেডের শিক্ষার্থীদের স্পেনীয় ভাষা শিখানোর দায়িত্ব পালন করেন। এটি হ্যাম্পটন ফল্স-এ অবস্থিত একটি ছোট বিদ্যালয় যাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ২৫০ জন। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রাউন অ্যাঞ্জেল্স অ্যান্ড ডেমন্স নামে একটি সিডি প্রকাশ করেন। এই সিডির শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে ছিলো জন ল্যাংডনের দ্বিত্ব প্রতীক বা এম্বিগ্রাম যেগুলো পরবর্তীতে তিনি অ্যাঞ্জেল্স অ্যান্ড ডেমন্স উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। এই সিডির মন্তব্য করতে যেয়ে প্রভূত সহযোগিতার জন্য তিনি তাঁর স্ত্রী ব্লিথকে ধন্যবাদ জানান; কারণ হিসেবে লিখেছেন:

“for being my tireless cowriter, coproducer, second engineer, significant other, and therapist”

এই সিডির গানগুলোর মধ্যে আছে “Here in These Fields” এবং ধর্মীয় সমবেত সঙ্গীত “All I Believe”। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে অবকাশযাপনের জন্য তাহিতিতে অবস্থানকালে তিনি সিডনি শেল্ডনের দ্য ডুম্সডে কন্সপাইরেসি উপন্যাসটি পড়েন। এর পরই সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি লিখলে এর চেয়ে ভালো লিখতে পারেন। এই সময়ই ডিজিটাল ফোরট্রেস রচনার কাজ শুরু করেন এবং একই সাথে তাঁর স্ত্রীর সাথে যৌথভাবে “187 Men to Avoid: A Guide for the Romantically Frustrated Woman” নামীয় একটি রসাত্মক বই লিখেন। এই বইয়ের ১৮৭টি নিবন্ধের একটি ছিলো “Men who write self-help books for women”। এক্ষেত্রে অবশ্য তিনি নিজ নাম ব্যবহার করেননি; ড্যানিয়েল ব্রাউন ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। বইয়ের প্রথমে লেখকের জীবনীতে লেখা হয়েছে: “Danielle Brown currently lives in New England: teaching school, writing books, and avoiding men”। বইটির স্বত্ব অবশ্য ড্যান ব্রাউনের নামেই ছিলো। প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়ার আগে বইটির মাত্র কয়েক হাজার কপি বিক্রি হয়।

অন্য খবর  মহান স্বাধীনতা দিবস আজ

এর পর ১৯৯৬ সালে তিনি লেখালেখির কাজে পূর্ন মনোযোগ দেন। ১৯৯৮ সালে তার প্রথম উপন্যাস ডিজিটাল ফোরট্রেস প্রকাশিত হয়। প্রথম উপন্যাস ডিজিটাল ফোরট্রেস পাঠক মহলে তেমন সারা ফেলতে না পারলেও তার পরবর্তীতে ২০০০ সালে তিনি বের করেন এ্যাঞ্জেল এন্ড ডেমনস। এই বইয়ের মাঝে তিনি তৈরী করেন তার সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট ল্যাঙ্গডনকে। বইটি যদিও বেশি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারে নি তারপরও তিনি সাইন্স ফিকশন ধরনের উপন্যাস ডিসিপশন পয়েন্ট বের করেন। প্রথম তিন বইয়ের মত এই বইটিও পাঠক সমাজের দৃষ্টি কারতে অসমর্থ হয়।

এর পর তিনি হাত দেন তার সবচেয়ে আলোচিত বই দ্য ভিঞ্চি কোড লেখায়। ২০০৪ সালে যখন ভিঞ্চি কোড বের হয় তখন পাঠক মহলে আলোড়ন পরে যায় তার এই বই নিয়ে। একের পর এক ভাঙ্গতে থাকে রেকর্ড। বইটি বের হবার সাথে সাথে নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলরের মর্যাদায় ভূষিত হয়। এরপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয় নি এই কলম জাদুকরকে। এরপর ড্যান ব্রাউন মানেই জাদু। এর পর বের হয়েছে লস্ট সিম্বল এবং ২০১৩ এর মে মাসে প্রকাশিত হয় ইনফার্নো। এবং দুটোই বেস্ট সেলর। বর্তমানে ব্রাউনের লিখা উপন্যাস ৪০ টিরও অধিক ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

উল্লেখ্য তার দুইটি বই দ্য ভিঞ্চি কোড ও এ্যাঞ্জেল এন্ড ডেমনস উপন্যাস নিয়ে উপন্যাসের নামে দুইটি সিনেমা হয়েছে। সিনেমায় রবার্ট ল্যাঙ্গডনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বিখ্যাত অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস।

নিচে ড্যান ব্রাউনের বইগুলোর তালিকা:

১. ডিজিটাল ফোরট্রেস (১৯৯৮)

ডিজিটাল ফোরট্রেস (১৯৯৮)

অনুবাদ

২. ডিসিপশন পয়েন্ট (২০০১)

ডিসেপশন পয়েন্ট

অনুবাদ

৩. এ্যাঞ্জেল এন্ড ডেমনস (২০০০)

এ্যাঞ্জেল এন্ড ডেমনস (২০০০)

অনুবাদ

৪. দ্য ভিঞ্চি কোড (২০০৩)

দ্য ভিঞ্চি কোড

অনুবাদ

৫. দ্য লস্ট সিম্বল (২০০৯)

দ্য লস্ট সিম্বল

অনুবাদ

৬. ইনফার্নো (২০১৩)

ইনফার্নো

অনুবাদ

৭. অরিজিন (২০১৭)

অরিজিন

অনুবাদ

আপনার মতামত দিন