দেশে বর্ষাকাল শুরু হতেই এডিস মশার বংশবিস্তার এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৪,০০০ মানুষ, যার মধ্যে শেষ ১০ দিনেই ভর্তি হয়েছেন প্রায় ৭০০ জন।
এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতেও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম কেবল গতানুগতিক ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ ও লোকদেখানো প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
📊 জরিপের উদ্বেগজনক চিত্র (ডিএসসিসি)
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) আধুনিক ‘কবো টুলবক্স’ প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে (যদিও ডিএনসিসি এমন কোনো জরিপ করেনি)। জরিপের ফল নিম্নরূপ:
- ঝুঁকি: ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই মশার ঘনত্ব অনেক বেশি, যার মধ্যে ২৮টি ওয়ার্ড উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।
- লার্ভার উৎস: ২,২৫০টি বাড়ির মধ্যে ২৮১টিতে লার্ভা পাওয়া গেছে।
- বহুতল ভবন: ৩৫.২৩% (সর্বোচ্চ)
- একক বাড়ি: ২৭.৭৬%
- নির্মাণাধীন ভবন: ১৭.৪৪%
- মেঝের জমে থাকা পানি (১২.২৬%), বালতি (১০.৩৪%) ও ড্রামে (৮.৮৯%) লার্ভার উপস্থিতি বেশি।
💰 ১০ বছরে ১,০১২ কোটি টাকা ব্যয় ও ব্যর্থতা
বিগত ১০ বছরে (২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর) দুই সিটি কর্পোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ১,০১২ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে।
- ডিএনসিসি: ব্যয় করেছে ৬৮৮.৩৯ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ১৮৭.৭৫ কোটি)।
- ডিএসসিসি: ব্যয় করেছে ৩২৩.৬৩ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ৫৩.৫০ কোটি)।
ব্যর্থ ‘অদ্ভুত’ থেরাপি: মশা মারতে বা শনাক্ত করতে বিগত বছরগুলোতে ড্রোন ওড়ানো, জলাশয়ে ব্যাঙ, হাঁস, তেলাপিয়া ও গাপ্পি মাছ ছাড়া কিংবা বাউল গানের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির মতো অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
⚠️ বর্তমান সংকট ও সীমাবদ্ধতা
- কাউন্সিলরহীন সিটি কর্পোরেশন: গত দুই বছর ধরে ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় মশক নিধন কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও তদারকির অভাব দেখা দিয়েছে।
- জনবল সংকট: দুই সিটির কর্মকর্তাদের মতে, আসন্ন ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিটি ওয়ার্ডে যে বিশাল পরিসরে ‘ম্যাসিভ’ কর্মসূচি চালানো দরকার, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তা করা যাচ্ছে না।
- জনগণের ক্ষোভ: বাড্ডা ও বাসাবো এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের নিয়মিত দেখা যায় না এবং ফগিং বা স্প্রে করার কার্যক্রমও এখন প্রায় বন্ধ।
👤 কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
- মো. আবদুস সালাম (প্রশাসক, ডিএসসিসি): “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ২৮টি ওয়ার্ডে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, নাগরিকদেরও প্রতি ৩ দিন পর পর জমে থাকা পানি ফেলে দিতে হবে।”
- মো. শফিকুল ইসলাম খান (প্রশাসক, ডিএনসিসি): “পরিচ্ছন্নতা ও মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নগরবাসী নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখলে ডেঙ্গু অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।”
💡 বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
- ড. কবিরুল বাশার (কীটতত্ত্ববিদ): শুধু ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে মশা মরবে না। মশা দমন কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে কীটনাশকের ধরন ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে দ্রুত বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবর্তন আনতে হবে।
- ড. আদিল মুহাম্মদ খান (নগর পরিকল্পনাবিদ): শুধু কেমিক্যাল দিয়ে ফগিং করে কোনো লাভ হবে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনার (Biological Management) সঠিক সমন্বয় ঘটাতে হবে।
