বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে (এইচএসসি) শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার (Dropout) হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা ও গবেষণা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক সময় যথাযথভাবে উঠে আসে না। দীর্ঘ ৩২ বছরের কলেজ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একযোগে কাজ করছে।
প্রথমত, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ২০২০ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তারা ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের মৌলিক শিখনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সেই ঘাটতির প্রভাব এখনও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সংস্কার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললেও শিক্ষার প্রকৃত মানোন্নয়ন কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
তৃতীয়ত, কোভিড-পরবর্তী সময়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে তাদের মেধা যাচাই ও শিক্ষার প্রতি প্রতিযোগিতামূলক আগ্রহও কিছুটা কমেছে।
চতুর্থত, এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনেক সময় তুলনামূলক উদারতা প্রদর্শন করা হয়। এর ফলে পাশের হার বাড়লেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন না করেই উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়। পরে তারা পাঠ্যক্রমের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়।
পঞ্চমত, একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন ভর্তি প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পছন্দের কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সীমিত করে। বাধ্য হয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেও অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করে না এবং শেষ পর্যন্ত ঝরে পড়ে।
ষষ্ঠত, অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে আলাদা সহায়তা বা একাডেমিক কাউন্সেলিংয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে যারা শুরু থেকেই পিছিয়ে থাকে, তারা ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সপ্তমত, স্মার্টফোনের অপব্যবহার এখন একটি বড় সামাজিক সমস্যা। কোভিডকালে অনলাইন শিক্ষার জন্য স্মার্টফোন অপরিহার্য ছিল। কিন্তু মহামারি শেষ হলেও অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে পড়াশোনার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনের প্রতি আসক্তি বেড়েছে। বইয়ের সঙ্গে তাদের দূরত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অষ্টমত, অধিকাংশ কলেজে শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা অপ্রতুল। কোথাও একাদশ শ্রেণিতে ৫০০ থেকে ৭০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বাংলা, ইংরেজি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক রয়েছেন। একই শিক্ষককে আবার উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়েও পাঠদান করতে হয়। ফলে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক।
নবমত, শ্রেণিকক্ষে যেমন কিছু শিক্ষার্থী অমনোযোগী, তেমনি কিছু শিক্ষকও পাঠদানে প্রত্যাশিত আন্তরিকতা দেখান না। অনেক ক্ষেত্রে ভালো পাঠদান কোচিং বা প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অথচ সব শিক্ষার্থীর সেই আর্থিক সামর্থ্য নেই। এর ফলে শিক্ষাগত বৈষম্য আরও বাড়ছে।
দশমত, নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ না করার নীতিমালা বাস্তবে অনেক সময় কার্যকর থাকে না। বিভিন্ন চাপ, তদবির কিংবা পরবর্তী বিশেষ সুযোগের কারণে শেষ পর্যন্ত অনেক অযোগ্য শিক্ষার্থীও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।
একাদশত, অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক অভিভাবক নিয়মিত খোঁজই রাখেন না, তাদের সন্তান বিদ্যালয় বা কলেজে উপস্থিত হচ্ছে কি না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সহজেই পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হয়। অথচ ফলাফল খারাপ হলে প্রায় সব দায়ভার শিক্ষকদের ওপরই বর্তায়।
আমি একজন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে অবসর নেওয়ার আগে দীর্ঘদিন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান করেছি। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এসএসসি পাস করা অনেক শিক্ষার্থীর ইংরেজি বিষয়ে দক্ষতা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মানেরও নিচে। তারা উচ্চমাধ্যমিকে এসে ইংরেজিতে একেবারেই টিকতে পারে না এবং শেষ পর্যন্ত অকৃতকার্য হয়।
এটি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা নয়; এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
শিক্ষা সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই সংস্কার বাস্তবভিত্তিক হতে হবে। নীতিনির্ধারণে শুধু দেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নয়, গ্রামীণ জনপদের কলেজ শিক্ষক, অধ্যক্ষ এবং মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করা অভিজ্ঞ শিক্ষকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কারণ, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রকৃত চিত্র এবং তার কার্যকর সমাধান সবচেয়ে ভালো জানেন তারাই, যারা প্রতিদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পাশের হার বৃদ্ধি নয়; বরং এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী শেখার সুযোগ পাবে, প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করতে পারবে।
লেখক:
মো. জালাল হোসেন
পিআরএল ভোগরত উপাধ্যক্ষ (সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ)
পদ্মা সরকারি কলেজ, দোহার, ঢাকা
