নিউজ৩৯♦ নিউজটি ঢাকা টাইমস ২৪ এর নিজস্ব সংবাদ। নিউজ৩৯ শুধু মাত্র তার পাঠকদের জন্য সংবাদটি প্রকাশ করলো।
চমৎকার গুছিয়ে কথা বলেন আমাদের পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খান। ভরাট কন্ঠ। শুদ্ধ উচ্চারন। তিনি কিছু বললে সহজেই নজর কাড়ে। আমার অন্তত এমনটাই মনে হয়। সোমবার গভীর রাতে জিটিভির টক শো’তে পূর্ত প্রতিমন্ত্রীকে একই ভূমিকায় দেখলাম। চোখ জুড়ে ঘুম। তবুও সুবক্তার কথা শোনার লোভ সামলাতে পারলাম না। সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিবরণ দিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী। এক পর্যায়ে বললেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরে আবাসন খাতের সব অনাচার দূর হয়েছে। মান্নান খানের এই বক্তব্যে খানিকটা ধাক্কাই খেলাম। হাসিও পেল। এর কারণও আছে। ২০১০ সালে পূর্ত মন্ত্রনালয়ের সভাকক্ষে আবাসন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীদের বাহাসের প্রত্যক্ষদর্শী আমি। তখন কাজ করতাম বাংলাদেশ প্রতিদিনে, উপ সম্পাদক হিসেবে। দেখেছি প্রতিমন্ত্রী কিভাবে আবাসন ব্যবসায়ীদের অনিয়ম, অনাচারের কথা বলেছেন। কেন ড্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তার যুক্তি তুলে ধরেছেন। সেইসব অনিয়ম, অনাচারের কোন সুরাহা না করে প্রতিমন্ত্রী যেভাবে টক শো’তে তৃপ্তির ঢেঁকুর গিললেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।
ইচ্ছে আছে সুযোগ পেলে ছাত্র ইউনিয়নের এককালের তুখোড় এই নেতাকে জিঙ্গেস করবো মন্ত্রী হলে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করতে হয়? আমার বিশ্বাস, অতীতে যে বিনয় তাঁর মধ্যে দেখেছি নিশ্চয়ই তিনি এর উত্তর আমায় দেবেন। ২০০৭ সালে ওনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম মুঠোফোনে। তিনি আধঘন্টা সময় চেয়ে নিয়ে আমার তখনকার কর্মস্থল প্রথম আলোতে চলে এসেছিলেন। এরপর ঘন্টাব্যাপী আলোচনায় বারবার সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার দুর্নীতির কথা বলেছেন। দু:খ করে বলেছেন, রাজনীতি যেখানে জনসেবা সেখানে মন্ত্রী হয়ে কীভাবে নিজের সেবায় মেতে ওঠেন কোন কোন রাজনীতিবিদ।
সেই মান্নান খান যখন পরবর্তীতে সালমান এফ রহমানকে হঠিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেন। খুশি হয়েছিলাম। নির্বাচিত হয়ে যখন পূর্ত মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী হলেন তখন অনেকের মতো ধরেই নিয়েছিলাম, এবার বুঝি শৃঙ্খলা ফিরবে আবাসন খাতে। প্রথম দিকের হাকডাকে এক ধরনের ইতিবাচক মনোভাবও তৈরি হয়েছিল অনেকের মাঝে। বিশেষত. ড্যাপ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি যখন অনঢ় মানসিকতা দেখাতে থাকলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সব কিছু কেমন যেন থেমে গেল। বিস্ময়কর হলো ড্যাপ (ঢাকার বিশেষ অঞ্চল পরিকল্পনা) পর্যালোচনা কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ২০১০ সালে। আর দ্বিতীয় বৈঠক হয় তিন বছর পর ২০১৩ সালের ১৯ মে। মোদ্দা কথা হল ড্যাপ বাস্তবায়নের ধারেকাছেও যেতে পারেনি রাজউক। ঢাকা থেকে মাওয়া যাওয়ার রাস্তার আশেপাশের কোন কোন অংশ ড্যাপের অন্তর্ভূক্ত। ওই সড়কের দুই পাশের বিস্তীর্ণ পানির মধ্যে সাইনবোর্ড দেখতে পাওয়া যায়। ‘অমুক’ হাউজিং, ‘তমুক’ হাউজিংয়ের বাহারি বিজ্ঞাপন। অথচ প্রতিমন্ত্রী বেমালুম বলে দিলেন, এখন আর ৩০ ফুট পানির নিচে না জায়গা কিনে আর বিজ্ঞাপন দিতে পারেনা আবাসন ব্যবসায়ীরা।
সরকারের মন্ত্রীরা কি প্রকৃত তথ্য না নিয়ে কথা বলেন? না-কি তাদের যারা আড়াল করে থাকেন তারা আসল কথা বলতে দেননা? উত্তরা নতুন প্রকল্প যেখানে হচ্ছে তার ঠিক ওপারে তুরাগ নদী। আর নদীর উত্তর তীরে একাধিক হাউজিং প্রকল্পের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে পাল্লা দিয়ে। হয়, রাজউকের এই প্রকল্পটি মন্ত্রী পরিদর্শনে যাননি কখনো। অথবা তিনি সেখানে গিয়ে বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্পের ওই সাইনবোর্ডগুলো দেখেও না দেখার চেষ্টা করেছেন। আশুলিয়ায় আমিন মোহাম্মদ হাউজিংয়ের প্রকল্প কি রাজউক অনুমোদিত? না। অথচ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এখনো জমি বিক্রয় করছে তারা। যারা প্রলোভনে পড়ে জমি কিনছেন তাদেরকে কি রাজউক অনুমোদনহীন এই প্রকল্পে বাড়ি তৈরির অনুমোদন দেবে? নিশ্চয়ই না। তাহলে যারা প্রতারিত হচ্ছেন তারা কি অনাচারের স্বীকার হচ্ছেন না? প্রতিমন্ত্রী কি করে বললেন, যে আবাসন খাতের অনাচার দূর হয়েছে? রাজউক, পূর্ত মন্ত্রনালয়ের নাকের ডগায় অনুমোদনহীন একাধিক আবাসন প্রকল্পের মনভোলানো বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে টেলিভিশন, খবরের কাগজ, এমনকী অনলাইন নিউজ পোর্টালেও। সংশ্লিষ্ট হাউজিং কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে মাঝেমধ্যে খবরের কাগজে সতর্কীকরণ বিজ্ঞাপন দিয়ে দায় সারছে রাজউক। আর প্রতিমন্ত্রী বলে দিলেন অনাচার দূর হয়েছে!
প্রবাসী পল্লী, এশিয়ান টাউন শান্তি নিবাস, পদ্মা ফিউচার পার্ক, বসুমতি আবাসিক প্রকল্প, ভিশন গ্রুপ, ভুলুয়া রয়েল সিটি, কানাডা সিটি,বেস্টওয়ে সিটি, পূর্বাচল আমেরিকান সিটি, পিংক সিটি ইত্যাদি বাহারি নামের আবাসন প্রকল্পগুলো কি রাজউক অনুমোদিত? না। প্রবাসী পল্লী নামের আবাসিক প্রকল্পটির ৯৫ ভাগ হল জলমগ্ন এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা এখনো এখানে মাছ শিকার করেন। অথচ প্রায় প্রতিদিনই এই প্রকল্পের মনভোলানো বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে পত্র-পত্রিকায়। নির্বিকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এক খন্ড জমির আশায় যিনি এইসব প্রকল্পে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ করছেন তিনি যখন প্রতারিত হবেন তখন কি তাকে অনাচারের স্বীকার বলা যাবে? নিশ্চয়ই যাবে। তাহলে প্রতিমন্ত্রীর অনাচার দূরের দাবি কি অসার হয়ে যায়না?
ঢাকা শহরের দশ হাজার ভবনকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে দুদক। এই ভবনগুলোর কোনটা নকশাবিহীন, কোনটা অবৈধ জায়গার ওপরে করা, কোনটা নকশা না মেনে করা। আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ এইচ বি এম ইকবাল গুলশান এভিনিউ, নিকেতনে রাজউকের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে সুউচ্চ ভবন তৈরি করেছেন। দলের আরেক সাংসদ লোটাস কামালও ১৩ তলার অনুমোদন না নিয়ে ২০ তলা ভবন করেছেন। সরকার ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর অন্তত চারটি বড় ভবন রয়েছে অবৈধ নকশায় করা। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে।
অবৈধ নকশায় করা সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে শত শত প্রাণহানি হয়েছে আমাদের চোখের সামনে। মালিক রানা গ্রেপ্তার হয়েছেন। সাভার পৌর মেয়র প্রথমে বরখাস্ত, পরে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুর্ঘটনা হয়েছে বলে এই ব্যবস্থা। এখন ঢাকায় যদি অনুমোদনহীন কোন ভবনে এমন দুর্ঘটনা হয় তাহলে কি আমরা রাজউকের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা দেখতে পাব? আর রাজউক যদি সঠিক পথে না চলে তাহলে এর দায়-দায়িত্ব কি সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী নেবেন না?
আবাসন খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি রাতারাতি পুরোপুরি নির্মুল হয়ে যাবে এমন আশা আমরাও করিনা। কিন্তু ধীরে ধীরে কমবে এমনটা তো আশা করা দুরাশা নয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী যখন বলেন যে সব অনাচার দূর হয়েছে তখন তো অনাচার করা ব্যবসায়ীরা লায় পেয়ে যান। তাদের দুষ্কর্ম কার্যত বৈধতা পেয়ে যায়। এটা প্রতিমন্ত্রী বুঝেই করছেন? না-কি মুখ ফসকে বলেছেন। মান্নান খানের মতো একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মুখ ফসকে কিছু বলবেন এটা কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? না-কি এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে?
লেখক: আরিফুর রহমান, সম্পাদক, টাইমস২৪.কম
