ঘুরে আসুন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নগর নবাবগঞ্জ

প্রকাশ:

শেয়ার করুন:

শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা ছেড়ে অনেকেই প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে চান সতেজতা অনুভব করতে। কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকে সময় স্বল্পতার কারণে বেড়ানোর কথা ভাবতেই পারেন না। তবে রাজধানীর কাছাকাছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কোনো স্থান থাকলে স্বল্প সময়ে বেড়িয়ে আসতে পারেব।

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র দেড় ঘন্টা পথের দূরত্বে রয়েছে এমনি একটি স্থান। মাত্র একদিনে সুন্দর ও আনন্দময় ভ্রমণের জন্য স্থানটি ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে।

বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে চাইলে চলে আসুন রাজধানীর একেবারে পাশের উপজেলা নবাবগঞ্জে। ২৪৪ দশমিক ৮০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলার উত্তরে সিঙ্গাইর উপজেলা। দক্ষিণে দোহার উপজেলা। পূর্বে কেরানীগঞ্জ, সিরাজদিখান ও শ্রীনগর উপজেলা। পশ্চিমে হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা।

প্রথমে আপনাকে আসতে হবে কলাকোপায়। নদী আর স্থাপনার সমন্বয় কলাকোপার মূল বৈশিষ্ট্য।

ঢাকার খুব কাছেই নবাবগঞ্জের একটি গ্রাম কলাকোপা। পাশের গ্রাম বান্দুরা। ঢাকা মহানগর থেকে দেড় ঘন্টার পথ। বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হয়ে কেরানীগঞ্জের উপর দিয়ে কায়কোবাদ সেতু টপকে রাস্তার দুপাশের সবুজ উপভোগ করতে করতে ইতিহাস সমৃদ্ধ এই প্রাচীন নগরে পৌঁছে যাওয়া যাবে।

শুরুতেই বলে রাখি; এখানে বেশ কয়েকটি স্পট রয়েছে ঘুরে দেখার জন্য। তাই দিনে দিনে সবগুলো স্পট দেখতে চাইলে আপনাকে খুব সকালেই রওনা দিতে হবে। গুলিস্তান থেকে দোহার-নবাবগঞ্জগামী বাসে মাত্র ৬০ টাকা দিয়ে বসে পড়ুন। বাসে উঠে হেলপারকে বলবেন- জজ বাড়ির সামনে নামিয়ে দিতে।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিশাল এক ভাণ্ডার কলাকোপা-বান্দুরা। উনিশ শতকেও এখানে জমিদারদের বসতি ছিল। প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ গ্রাম কলাকোপা-বান্দুরা একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের তীর্থস্থান ছিল। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখ জুড়ানো। যার প্রাণ ইছামতি নদী। এখানে দেখার অনেক কিছুই আছে। একদিকে স্নিগ্ধ অপরূপ প্রকৃতি অন্য দিকে নানা পুরাণ কাহিনী।

কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ির পাশে উকিল বাড়ি। তারপর জমিদার ব্রজেন সাহার ব্রজ নিকেতন (যা এখন জজ বাড়ি নাম ধারণ করেছে)। ব্যবসায়ী রাধানাথ সাহার বাড়ি। শ্রীযুক্ত বাবু লোকনাথ সাহার বাড়ি (যার খ্যাতি মঠবাড়ি বা তেলিবাড়ি নামে)। মধুবাবুর পাইন্না বাড়ি, পোদ্দার বাড়ি এবং কালি বাড়ি। এখানে আরও আছে খেলারাম দাতার বিগ্রহমন্দির, মহামায়া দেবীর মন্দির। আর একটু দূরের হাসনাবাদে জপমালা রানীর গির্জা।

ঐতিহ্যবাহী জজ বাড়ি :

ব্রজনিকেতনএটি নবাবগঞ্জের কলাকোপা নামক স্থানে অবস্থিত। একটি সুন্দর বাগান ঘেরা এবং বিশালাকৃতির এই জমিদার বাড়িটি মূলত জজ বাড়ি নামে পরিচিত। বাড়ির পাশেই রয়েছে শান বাঁধানো পুকুর। রয়েছে পোষা হরিণের একটি খামার। বাগানের হাজারো রকমের ফুল আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে অনায়াসে। জমিদার বাড়িটি অতি প্রাচীন কালের ঐতিহ্যবাহী নকশায় তৈরি। যা আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিবে।

কোকিল প্যারি জমিদার বাড়ি :

এই জমিদার বাড়িটি জজ বাড়ির ঠিক পাশেই অবস্থিত। বলা যেতে পারে এটি জজ বাড়ির ওল্ড ভারসন। জজ বাড়ি বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হলেও এটি রয়ে গেছে সেই আগে যেমনটি ছিল। এই জমিদার বাড়িতেও রয়েছে শত শত দৃষ্টিনন্দন ফুলের গাছ আর বাড়ির ঠিক সামনে রয়েছে বিশালাকৃতির স্বচ্ছ পানির পুকুর। রয়েছে বিশালাকৃতির পুকুর ঘাট।

ঘুরে আসুন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নগর নবাবগঞ্জ

ছবিতে যে দুটি স্থাপনা দেখা যাচ্ছে তা নির্মাতার পিতা ও মাতার মুর্তির জন্য বানানো, একটিতে পিতার মুর্তি ও আরেকটিতে মাতার মুর্তি ছিল। পিতার মুর্তিটির মাথা ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর মাতার মুর্তির পুরোটাই বিলুপ্ত। সেই সময় অস্ট্রেলিয়া থেকে মুর্তি দুইটি বানিয়ে আনা হয়েছিল এবং একটি মুর্তি একটি অখণ্ড পাথর কেটে বানানো। পিতার মুর্তির আসন ভঙ্গির সাথে বুদ্ধের মিল থাকায় অনেকে এটিকে বৌদ্ধমন্দির মনে করেন, কিন্তু তা ভুল।

খেলারাম দাতা’র বাড়ি (আন্ধার কোঠা) :

এটি এক সময় সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে, তবে আদি রং নকশার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বাড়ীটি এলাকায় বেশ কিছু মিথ প্রচলিত আছে। এখনো মাটির উপর দুইতলা একটি জড়াজীর্ণ ভবন দেখতে পাবেন। কথিত আছে এই পাঁচতলা ভবনটি এক রাতে তিনতলা পর্যন্ত মাটির নিচে চলে গিয়েছিল।

ভবনটির উপরের তলাতে একটি বড় চৌবাচ্চা আছে। কথিত আছে জমিদার খেলালামদা এর মা একদিন তার সন্তানের কাছে দুধ খেতে চাইলে তিনি তার মায়ের জন্য এই চৌবাচ্চা বানানোর নির্দেশ দেন। পরে সেই বিরাট চৌবাচ্চায় দুধ এবং কলা দিয়ে পূর্ণ করে তার মাকে সেই চৌবাচ্চায় নামিয়ে দেন। তার মা সাতার কেঁটে কেঁটে মনের সাধ মিটিয়ে দুধ পান করেছিলেন। এই বাড়িটির পাশেও একটি বিরাট পুকুর আছে। কথিত আছে এই পুকুরের পাশে এসে কেউ কিছু চাইলে তার পর দিন তাই মিলে যেত।

ষোড়শ শতকে খেলারাম দাতা সমূদ্রবাণিজ্য করতেন, মালয় সাগর পর্যন্ত তার যাতায়াত ছিল। তিনি পর্তুগিজদের সাথে মিলে জলদস্যুতা করতেন বলে শোনা যায়। একসময় অনুতাপ থেকে এলাকায় দান খয়রাত শুরু করেন, সেই থেকে তার নামের সাথে ‘দাতা’ শব্দটি জুড়ে যায়।

কলাকোপা আনসার ক্যাম্প :

জজ বাড়ির কাছেই কলাকোপা আনসার ক্যাম্প অবস্থিত। এটিও একটি দৃষ্টিনন্দন স্থান। ছায়া সুনিবিড় সুন্দর একটি পরিবেশ। পিকনিক স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আনসারদের বসবাসের জন্য অনেক বড় একটি এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই নয়নাভিরাম ক্যাম্পটি। এখানে বেশ কয়েকটি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ভবন রয়েছে।

ইছামতি নদী :

কাশিয়াখালী বাঁধ থেকে, নবাবগঞ্জএই নদীকে ঘিরে সেই আগের মত প্রাণ চাঞ্চল্য না থাকলেও সূর্যাস্তের সময় আপনি মুগ্ধ হয়ে এর রূপ অবলোকন করতে সক্ষম হবেন।

ভাঙা মসজিদ, বান্দুরা :

কথিত আছে এই মসজিদটি এক রাতে গায়েবীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল। যে রাতে এটি সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন ভোরে কোনো এক লোক এই মসজিদটি প্রথম আবিষ্কার করেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ সৃষ্টি হতে পারেনি। মানুষের চোখে পড়ে যাওয়ায় এটি সেরকম অসম্পূর্ণই থেকে যায়। এর একটি অংশ ভাঙা থাকার কারণে এটি ভাঙা মসজিদ নামেই পরিচিত। কিন্তু বাস্তবতা হল, মসজিদটি সম্ভবত মোগল আমলে কোনো সেনা ছাউনির লোকেরা তৈরি করে থাকতে পারে।

নিশকান্দা মন্দির:

এটি মাঝিরকান্দা নামক স্থানের অদূরে অবস্থিত। একটি বটগাছের নিচে এই মুর্তিটি নির্মাণ করা করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা। বর্তমানের বটগাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। প্রতি বছর এই মূর্তিকে ঘিরে পূজা এবং মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

বান্দুরা গির্জা :

দোহার ও নবাবগঞ্জে ছয়টি গির্জা আছে। তার মধ্যে সবচে’ পুরোনো বান্দুরার “রাণীর পবিত্র জপমালা গির্জা”।  বিশাল এলাকা নিয়ে স্থাপিত এই গির্জাটি। গির্জার ভেতরের দিকটা বেশি আকর্ষণীয় এবং সামনে একটি বিশাল খোলা মাঠের সৌন্দর্য হাজারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

Queen’s Holy Rosary Church, নবাবগঞ্জ

Save

Save

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ সংবাদ

এই রকম আরও

ঈদের আমেজে দোহার-নবাবগঞ্জ-কেরানীগঞ্জে নির্বাচনী উত্তাপ

শরিফ হাসান, মো আল-আমিন, আশিক হোসেন, আমিনুল ইসলাম | দোহার, নবাবগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঢাকার...

নবাবগঞ্জ ও দোহারে নতুন পুলিশ সুপার: কাজের মাধ্যমেই পুলিশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে

মাহমুদুল হাসান সুমন: ঢাকা জেলার নবাগত পুলিশ সুপার শামিমা বলেছেন, পুলিশের প্রতি মানুষের যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে,...

কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার — খন্দকার আবু আশফাক

মাহমুদুল হাসান সুমন : ঢাকা ১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক সোমবার দুপুরে কলাকোপা খাদ্য গুদাম-এ সরাসরি...

বান্দরবান ভ্রমণ – নীলাচল ও মেঘলায় (দ্বিতীয় পর্ব)

সবুজে নীলে আঁচলে বান্দরবান শহর ছাড়িয়ে নীলাচলের পথে উঠতে শুরু করলেই মনে হয়, আপনি আর স্রেফ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন...