শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু বলাৎকার এবং আইনের উপলব্ধি

491

আমরা যাদেরকে উন্নত রাষ্ট্র বলি সেই ইউরোপ আমেরিকায় অনেক পরিবার আতঙ্কে থাকেন। তার সন্তান কবে যেনো বলে বসেন আমি সমকামী(নারীর প্রতি নারীর আকর্ষণ ‘Lesbianism’, পুরুষের প্রতি পুরুষ ‘Gay’)। এর প্রভাব বাংলাদেশেও লক্ষনীয়। এই আতঙ্ক এখন আর ইউরোপ আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর নৈতিক রাষ্ট্রগুলোতেও ছড়িয়ে পরছে। বাংলাদেশের মা-বাবারা আতঙ্কগ্রস্ত এবং উৎকন্ঠায় থাকেন। তার আদরের সন্তানকে জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠিয়ে। জ্ঞান বিতরণের দায়িত্ব নেওয়া কোনো কু- শিক্ষক দ্বারা বলাৎকারের শিকার হন কিনা।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের এমন কিছু ঘটনা সামনে আসছে তা দেখে যেকোন সচেতন নাগরিকই আতকে উঠবেন। কতটা মর্মান্তিকতার শিকার আমাদের ছেলে শিশুরা। ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে জেনারেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবার চিত্র যেনো একই।

মাদ্ররাসা, স্কুলে হরহামেশাই ঘটছে এমন ঘটনা। কেউ যেনো দেখার নেই। কতটা বিশ্বাস থেকে কতটা ত্যাগ থেকে আদরের-দুধের সন্তানকে মা ছেড়ে দেয় উস্তাদের হাতে অথবা স্কুলের হোস্টেলে। সেই উস্তাদ কর্তৃক যখন ঘটে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অপরাধ তখন আর বাকরুদ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। কারণ বাংলাদেশের আইন ধর্ষণের সংজ্ঞ নিরূপণ করছেন আরো দেড়শত বছর আগের তৈরী করা বৃটিশদের আইনে। সেই আইনই এখনো বলবৎ রাখছেন। দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করছেন ধর্ষণের সংজ্ঞা এবং কারণসমুহ। সেখানে বলাৎকারকে এড়িয়ে গেছেন। দন্ডবিধির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে “ধর্ষণের শীকার হতে পারে শুধু একজন নারী, একজন পুরুষ কর্তৃক।” পাঁচটি কারণের কথা উল্লেখ করলেও। একটি কারণেও বলাৎকারের কথা বলা হয় নাই। দুইহাজার সালে ‘বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ নামে একটি আইন তৈরী করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতনমুলক অপরাধসমুহ কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে। সেখানেও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের কথা থাকলেও ছেলে শিশু বলাৎকারের কথা অনুউল্লেখিত। শিশু নির্যাতন দমন আইনের ‘ধারা ৯(১) ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু ইত্যাদির শাস্তি নির্ধারণ করছেন’। যেখানে বলা হয়েছে “যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন তাহা হইলে তিনি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন। ” এখানেও ছেলে শিশুর কথা বলা হয় নাই। বলাৎকারকে আইনের ভাষায় কেন ধর্ষণ বলা হয়নি তা অবশ্য বোধগম্য নয়। অথচ বাংলা অভিধানে ধর্ষণের সমার্থক শব্দ আছে বলাৎকার। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া হইছে। “ধারা (ঙ) ‘ধর্ষণ’ অর্থ ধারা ৯ এর বিধান সাপেক্ষ,  penal code, 1860( Act XLU of 1960) এর Section 375 এ সংজ্ঞায়িত ‘rape’। ” এখানে বিচারের ক্ষেত্রে উক্ত সংজ্ঞাই যদি আদালত গ্রহণ করে তাহলে বলাৎকারের শিকার ভিক্টম ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।

অন্য খবর  বিচারপতি ফজলুর রহমানের মৃত্যুতে আইনমন্ত্রীর শোক প্রকাশ ও স্মৃতিচারণ

এই বলাৎকারের ইতিহাস বাংলাদেশে প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো। ঘেটু গানের মাধ্যমে বর্ষার মৌসুমে হাওড় অঞ্চলে জমিদারদের মনোরঞ্জনে এর প্রচলন শুরু হয়। যদিও বেশিদিন ঘেটু গান জনপ্রিয়তা পায়নি। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সাথে সাথে এই নিকৃষ্ট ঘৃণ্যতম প্রথারও বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের প্রেতাত্মারা নিকৃষ্ট মস্তিষ্কের পশুরা। যাদের পাশবিকতা মানসিকতা উগ্র পশুদের মতো। তারপরেও আমাদের আইনে ধর্ষণের সাথে বলাৎকার শব্দটি যোগ হয়নি। ডিজিটাল জামানায় তৈরীকৃত ‘শিশু নির্যাতন দমন আইনে’ও নারীকে আলাদা করার মানসিকতার পরিচয়ই ফুটে উঠেছে।

এবার দেখা যাক আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি পরিমাণ পশুর বসবাস। সাম্প্রতিক সময়ের পত্রিকা গুলোর নিউজ অনুযায়ী দেশের কোন অঞ্চলেই এই পশুগুলো থেকে মুক্ত নয়। মুক্ত নয় পাশবিকতা থেকে আমাদের শিশুরা। বাংলা ট্রিবিউন ২০ই অক্টোবর এক নিউজে প্রকাশ করেন, “রুটিন করে মাদ্রাসা ছাত্রকে প্রতি রাতে বলাৎকার করতেন শিক্ষক নাছির।” এমন অহরঅহর নিউজ আছে, ‘ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ছাত্রকে বলাৎকার করতেন শিক্ষক’। ‘আদরের কথা বলে মাদ্রাসা ছাত্রকে বলাৎকার’। এরকম শিরোনাম কয়েক শত দেওয়া যাবে।

আমাদের সময়ের নিউজ ৮ই ফেব্রুয়ারী, “পর্নো ছবি দেখে ছাত্রকে বলাৎকার মাদ্রাসা শিক্ষকের।” ভাবা যায় কতোটা বিকৃত মস্তিষ্কের শিক্ষক। Eye news. com ৬ই অক্টোবর ২০২০, “সিলেটে শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্কুল ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ”  এই শিরোনামে খবর প্রকাশ করেন।

৫ই এপ্রিল ২০১৮, বিবিসির নিউজ, “ভেবেছিলাম পড়ার ভয়ে হোস্টেলে যেতে চাইছে না: কক্সবাজারে স্কুল হোস্টেলে বলাৎকারের শিকার কিশোরের মা।” এমন হাজারো ঘটনা প্রবাহমান আমাদের উন্নয়ন সমৃদ্ধ বাংলায়। আমরা যতোটা কাঠামোয় উন্নত হইছি ঠিক ততটাই নৈতিকভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছি।

অন্য খবর  পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এখন অনলাইনে

আরো মর্মান্তিক রিপোর্ট প্রকাশ করছেন ‘উইমেন চ্যাপটার’ নামক এক অনলাইন পত্রিকায়। ‘সাইফুল ইসলাম টিটো’র অনুসন্ধানি রিপোর্ট। “সেখানে কওমি মাদ্রাসা ও মক্তবের একমাসের অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত চিত্র তুলে ধরেছেন। ১লা অক্টোবর ২০২০ থেকে ৩১শে অক্টোবর ২০২০, পুরো একমাসে ৩৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ টি ছেলে আর ৯টি মেয়ে শিশু। একটা শিশুকে ধর্ষণের শেষে হত্যা করার কথাও উল্লেখ করছেন। ধর্ষণের চেষ্টা ও নিপিড়ন চালানো হয় আরো ৭ টি শিশুর উপর। অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে আরো ৬৬ শিশুর উপরে। এইটুকু লিখতে আমার গা হিম হয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করছেন এসব ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে চট্টগ্রাম আর সিলেটে।”

তবে এমন পাশবিকতা শুধু ছেলে শিশুদের উপরই ঘটছে না। অসহায় বয়স্ক পুরুষও শিকার হচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জে ফতুল্লায় ‘দাপা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বৃদ্ধকে বলাৎকারের অভিযোগে আটক করেছিলো পুলিশ’। সূত্র: প্রেস নারায়ণগঞ্জ, ৫ই ফেব্রুয়ারী ২০১৯।

কতটা অনিরাপদ এই জনপদ। কতটা আতঙ্কে বড় হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ, এখনই ভাবা দরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই যদি শিশুরা নিরাপদ না থাকে তাহলে এই শিশুদের বড় হওয়ার অধিকার নেই। বলাৎকারকৃত শিশুরা কতোটা মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকে, এটা জানার জন্য সাইকোলজিস্ট হওয়ার দরকার নেই।

আমাদের শিশুদেরকে এমন নিকৃষ্ট পাশবিকতা থেকে মুক্ত করতে হলে সচেতনতার পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে কঠোর হস্তে দমন করতে

হবে। আর নয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ চরম অন্ধকারের দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। সুকান্তা ভট্টাচার্যের ভাষায় “এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান”। আমরা শিশুদের স্থান ছেড়ে দিবো নাকি তাদেরকে মানসিক ভাবে বিকলাঙ্গ বানাবো এটাই এখন দেখার বিষয়।

-আবুল বাশার-

আইন বিশ্লেষক।

মন্তব্য