ভাষা পরিবারসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

3667
ভাষা পরিবারসমূহের পরিচিতি
ভাষা পরিবার

পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার ভাষা রায়েছে। এর মধ্যে অনেক ভাষা বিলুপ্তপ্রায়। আবার অনেক ভষা স্বগৌরবে তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়িয়ে চলছে। এই সব প্রভাবশালী ভাষাগুলোকে যায়গা করে দিয়ে আনেক ভাষা বিলুপ্ত হতে চলেছে। ভাষাবিলুপ্তির এই হার পশু-পাখি বিলুপ্তির হারের চেয়ে বেশি। মানুষের যেমন আত্মীয় স্বজন আছে, থাকে পরিবার, বাবা-মা, ভাই-বন্ধু ইত্যাদী, তেমনি ভাষারও রয়েছে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বংশ পরিচয়।

ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষার অতীত ইতিহাস পর্যালোচানা করে, তাদের শব্দকোষ, ব্যকারণ বিশ্লেষণ করে ভাষাগুলোর কয়েকটি পরিবার চিহ্নিত করেছেন। তবে সব ভাষাবিজ্ঞানী ভাষা পরিবারগুলোর সংখ্যা নির্ণয় করতে গিয়ে একমত হতে পারেন নি। যার কারণে একেক ভাষাবিজ্ঞানীর তালিকায় ভাষা পরিবারের সংখ্যা একেক রকম। এই সংখ্যা দশ থেকে একশ’তে গিয়ে ঠেকেছে! তবু এইসব মতপার্থক্যের পরও বারোটি ভাষা পরিবার সর্বাধিক স্বীকৃত। ভাষাতত্ত্ববিদ কাজী সিরাজ বারোটি পরিবারের তালিকা করেছেন:

১. ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European)

এই তালিকার সবচে বিস্তৃত ভাষা পরিবারটির নাম ইন্দো-ইউরোপীয় (Indo-European) ভাষা পরিবার। এই পরিবারটির বিস্তৃতি দক্ষিণ র্পূর্ব এশিয়া হতে ইউরোপের পশ্চিম প্রান্তে একেবারে আইসল্যান্ড পর্যন্ত। আর ইউরোপীয় বসতকারীদের মুখ ধরে এই ভাষা পরিবার ছড়িয়েছে উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ, আফৃকা আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহ পর্যন্ত। সহজভাবে সারা বিশ্বেই বাস এই পরিবারের সদস্যদের। সবচে’ বেশি বেশি লোক এই পরিবারের ভাষাগুলোতে কথা বলে। এর অনেকগুলো শাখা রয়েছে। যেমন, বাংলা ইন্দো-ইরানি শাখার ইন্দো-আর্য গোত্রের ভাষা বাংল, জার্মানিক শাখার পশ্চিম জার্মানিক গোত্রের ভাষা ইংরেজি। আফ্রিকি, ফার্শী, রাশিয়ান, হিন্দি এই পরিবারের অন্যতম সদস্য।

ইন্দো-ইউরোপিয় পরিবারের শাখাসমূহ
ইন্দো-ইউরোপিয় পরিবারের শাখাসমূহ- ইউনিভার্সিটি অব অটওয়া

২. চীনা-তিব্বতী (Sino-Tibetan)

ভাষাভাষী লোকসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা পরিবারটির নাম চীনা-তিব্বতী (Sino-Tibetan)। চার শতাধিক ভাষা আছে এই পরিবারে। মান্দারিন (চীনা) সবচে বেশি ব্যবহৃত ভাষা। এছাড়া থাই, বার্মিজ, তিব্বতি এই পরিবারের সদস্য, বাংলাদেশেও চীনা-তিব্বতি ভাষা আছে।

Sino-Tibetan languages

৩. সেমিটিক-হেমিটিক (Semitic-Hamitic)

সাহারার উত্তরাংশ ও আরব উপদ্বীপের ভাষা পরিবার। এই ভাষা পরিবারের দুটি শাখা সেমিটিক ও হেমিটিক। অনেক ভাষা বিজ্ঞানী এই শাখা দুটোকে স্বতন্ত্র পরিবার হিসেবে দেখিয়েছেন। এই যৌথ পরিবারের নতুন প্রস্তাবিত নাম “আফ্রোএশিয়াটিক”। এর সবচে’ বেশি ব্যবহৃত ভাষা হল আরবী। আরবি ও হিব্রু এই পরিবারের সেমিটিক শাখার সদস্য। নুহ (আ.) এর পূত্র সামের বংশধরদের সেমিটিক ও হামের বংশধরদের হেমিটিক বলা হয়। হেমিটিকদের বাস আফ্রিকায় ও সেমিটিকদের বাস আরব অঞ্চলে। সেমিটিক বাদে বাকি পাঁচটি শাখা মিলে হল হেমিটিক যেগুলোর সবগুলো আফ্রিকা অংশে- বারবার, চাদিক, চুশিটিক, মিশরিয়, ওমিটিক। 

Semitic-Hamitic
সেমিটিক-হেমিটিক ভাষার বিস্তৃতি- উইকিপিডিয়া

৪. দ্রাভিড়ীয় (Dravidian)

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সব ভাষা এই পরিবারের সদস্য, যেমন তামিল (শ্রীলংকা ও মালয়শিয়ায় ব্যাপক পরিমানে ব্যবহৃত), মালায়ালাম, কানাড়া, তেলেগু, কুরুখ, গুন্দি, তুলু এর প্রধান সদস্য। দ্রাভিড়ীয় ভাষাগুলোর মূল কেন্দ্র দক্ষিণ ভারত থেকে বহু দূরে পাকিস্তানের মরু অঞ্চল বালুচিস্তানের এর একটি ভাষা আছে, ব্রাহুই

দ্রাভিড়ীয় ভাষা পরিবার
দ্রাভিড়ীয় ভাষা পরিবার- উইকিপিডিয়া

৫. বান্টু (Bantu)

আফ্রিকার বেশিরভাগ ভাষা, সাহারার দক্ষিণ থেকে মহাদেশের একেবারে দক্ষিণ পর্যন্ত প্রায় সকল ভাষা এই পরিবারের সদস্য। বেশিরভাগ ভাষা বান্টু শাখার যা নিজেই একটা পরিবার বলে বিবেচিত, এর সাথে উত্তরের কিছু শাখা মিলিয়ে নিজার-কঙ্গো একটি ধারণাগত প্রস্তাবিত ভাষা পরিবার। বিস্তৃতি ও বৈচিত্রের কারণে এর শাখা সংখ্যা অনেক। পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকার প্রায় সব ভাষা এই পরিবারের সদস্য।

বান্টু
প্রস্তাবিত নিজার-কঙ্গো ভাষা পরিবারের বিস্তৃতি – উ্‌ইকিপিডিয়া

৬. তুর্কী, মোঙ্গল ও মাঞ্চু (Turk, Mongol & Manchu)

এই ভাষা পরিবারটিকে এক নামে ‘আলটাইক’ (Altaic) ভাষা পরিবার বলা হয়। এর তিনটি শাখা তুর্কিক, মোঙ্গল, মাঞ্চু-তুঙ্গুস। অনেক ভাষা বিজ্ঞানী এই তিনটি শাখাকে স্বতন্ত্র ভাষা পরিবার মনে করেন। এর মধ্যে সবচে প্রভাবশালী শাখা হল তুর্কিক। তুরষ্ক থেকে মধ্য এশিয়ার প্রায় সব ভাষা তুর্কিক শাখার অন্তর্গত। তুর্কিক ভাষাগুলোর প্রভাব আশেপাশের অন্যান্য ভাষার উপর  রয়েছে। মঙ্গোলিয়া ও তার আশে পাশে মঙ্গোল শাখার ভাষা বিস্তৃতি। আলতাইকের সবচে ছোট শাখা হল মাঞ্চু-তুঙ্গুস, মূলত রাশিয়া ও চীনের  কিছু ভাষা এর সদস্য। কোনো কোনো ভাষা বিজ্ঞানী কোরিয়ান ও জাপানিকে এই পরিবার ভুক্ত করেন যদিও সমর্থন খুব কম।

আলতাইক ভাষা পরিবারের বিস্তৃতি
আলতাইক ভাষা পরিবারের বিস্তৃতি- উইকিপিডিয়া

৭. ককেশিয়ান (Caucasian)

নামেই বলে দিচ্ছে এটি ককেশান অঞ্চলের ভাষা। এই পরিবারের একটি ভাষা আজ টিকে আছে, জর্জিয়ান ভাষা। [সূত্র: আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান, কাজী সিরাজ, পৃ. ৫১]

৮. ফিনো-উগ্রিক (Finno-Ugric)

উত্তর ইউরোপের ভাষা পরিবার, এর শাখা হল ফিনো-পার্মিক, উগ্রিক। স্ক্যান্ডেনেভিয়ার ভাষাগুলো ও মধ্য রাশিয়ার কিছু ভাষা এই পরিবারের সদস্য, যেমন ফিনিয়, এস্তোনিয়, লিভোনিয়ান ইত্যাদি। এর থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এলাকায় ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর ভীরের মাঝে একাকী হাঙ্গেরীয়ান ভাষা এই পরিবারের আরেক সদস্য।

ফিনো-উগ্রিক ভাষা বিস্তৃতি
ফিনো-উগ্রিক ভাষা বিস্তৃতি

৯. অস্ট্রিক (Austric)

এই পরিবারের বিস্তৃতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল হতে ভারত পর্যন্ত বিশাল এলাকা, এর মধ্যে সমূদ্র এলাকাই বেশি। এর দুটি প্রধান শাখা রয়েছে- অস্ট্রোএশিয়াটিক ও অস্টানেশিয়ান, কখনও কখনও ক্রা-দাইমং-মিয়েন ভাষাগোষ্ঠিকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অস্ট্রোএশিয়াটিক শাখার ভাষাগুলো আমাদের উপমাহদেশে আছে যেমন, মুন্ডা, খাশি-খুমি। আমাদের সাঁওতালি ভাষা অস্ট্রোএশিয়াটিক শাখার একটি ভাষা। খাশি ভাষা সিলেট অঞ্চলে অল্প কিছু মানুষের ভাষা।  অস্টানেশিয়ান ভাষাগুলো ভারত মহাসাগেরর পূর্বাঞ্চল থেকে পশিচম পাড় পর্যন্ত বিস্তৃতি। মালাগাসী (মাদাগাস্কার)-এর ভাষা এর অন্তর্ভুক্ত, তাই ধারণা করা যায় মাদাগাস্কারের মানুষের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের মধ্যে অতীত যোগাযোগ বা যাতায়ত ছিল। ইন্দোনেশীয়া ও মালয়শিয়া হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোর ভাষা এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

অস্ট্রিক ভাষা পরিবার
অস্ট্রিক ভাষা পরিবারের বিস্তৃতি- উইকিপিডিয়া

১০. এস্কিমো-আলেউত (Esquimo-Aleut)

কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, গ্রীনল্যান্ড সহ উত্তর মেরু অঞ্চলের মানুষের ভাষা এই পরিবারের সদস্য।

১১. হাইপারবোরিয়ান (Hyperborean)

একটি বিচ্ছিন্ন ভাষা পরিবার। একে প্যালেও-সাইবেরিয়ান বা প্যালেও-এশিয়াটিক ভাষা পরিবার বলা হয়। পূর্ব রাশিয়ার অল্প কয়েকটি ভাষা এই পরিবারের সদস্য। এর চারটি শাখা আছে, যেমন- ইয়েনিসিয়ান, চুকচি-কামচাটকান, নিভিখ, ইউকাঘির। চুকচি এর অন্যতম পরিচিত ভাষা।

হাইপারবোরিয়ান
হাইপারবোরিয়ান ভাষা পরিবারের বিস্তৃতি রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলে, এনসাইক্লপিডিয়া ব্রিটানিকা

১২. আদি আমেরিকান (American Indian)

উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের প্রায় সব ভাষা আটটি শাখায় বিভক্ত হয়ে এই পরিবারের সদস্য। শাখাগুলো হল, পিমান, সিউয়ান, শোশেনিয়ান, ইরোকিয়ান, মুসকোজিয়ান, আলোগংকুইন, আথাবাসকান, নাহুয়ালতান। এই পরিবারের বেশিরভাগ ভাষা বিলুপ্ত, যেগুলো টিকে আছে তার অল্প কিছু ছাড়া বাকি সহ বিপন্ন।

কিন্তু বিভিন্ন কারনে বেশ কয়েকটি ভাষা এই পরিবারগুলোতে অন্তর্ভূক্ত করা সম্ভব হয় নি। ভাষাগুলো বিশ্লেষণ করে কোন পরিবারে ফেলা যায় নি, কোনটির সমগোত্রীয় সকল ভাষা বিলুপ্ত হওয়ায় সেই ভাষাটিকে তুলনা করে কোন পরিবারভুক্ত করা যায় নি। এমনি একটি বিচ্ছিন ভাষা রয়েছে এশিয়ার উত্তর-পূর্ব প্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপে। এক সময় ভাষাটি বহুল ব্যবহৃত হত। কিন্ত অন্য ভাষার প্রভাবে যে জাতির ভাষা তারা নিজেরাই এই ভাষায় কথা বলা কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে এটি একটি বিপন্ন ভাষা। বেশি দিন হয়তো বাকী নেই ভাষাটির ইতিহাসের জাদুঘরে স্থান নেয়ার। ভাষাটির নাম আইনু ইতাক, জাপানের হোক্কাইদো দ্বীপের আইনু জাতির লোক এই ভাষায় কথা বলে। এমন ভাষাগুলোর মধ্যে সবচে পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত ভাষাটি হল কোরিয়ান ভাষা। স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি ভাষা আছে নাম, বাস্ক। এই ভাষাকেও কোনো পরিবারভুক্ত করা যায় নি।

রিকমান্ডেড বই:

ভাষাবিজ্ঞান
লেখক: ড. ভোলানাথ তেওয়ারি

ভাষাবিজ্ঞান

আপনার মতামত দিন