পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে কেরানীগঞ্জ

107
পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে কেরানীগঞ্জ

যেদিকে চোখ যায় ময়লার ভাগাড়! উপজেলার ভাংনা-চিতাখোলা রোড, চর কালিগঞ্জ, তৈলঘাট, পূর্ব আগানগর, জিনজিরার টিনপট্টি, কভিড ১৯ হাসপাতালের সামনে, লছমনগঞ্জ, খেয়াঘাট, রসুলপুর, মান্দাইল, শাক্তার রেস্টুরেন্ট পল্লি, বড়িশুড়, খাগাইল, খোলামোড়াসহ বহু জায়গায় ময়লার স্তূপ, পুকুর জলাশয় ভরাট, বন্ধ হয়ে যাওয়া ইট ভায়াটায়ও পোড়ানো হচ্ছে ইট। ময়লা ও প্লাস্টিক পুরানো কালো ধোঁয়া। অন্য ব্যাবসার আড়ালে অসংখ্য শিশা ফ্যাক্টরি আর বুড়িগঙ্গা নদীর প্রতিটি ফোটা যেন কালো বিষ।

তাছাড়া কেরানীগঞ্জের সরু রাস্তায় মাটি কাঁপানো দৈত্যাকৃতির দানব সব গাড়ির বিকট শব্দের নিষিদ্ধ হাইড্রলিক্স হর্ণ, জ্যামে আটকা হাজারো অটোরিকশা, মোটরবাইক, ছোটবড় বাস-মিনিবাস, এম্বুলেন্স ও ভিআইপিদের মিলিত শব্দ বোমা সুস্থ মানুষের বুকেও কাঁপন ধরায়! পুরান ঢাকার গ্রামীণ জনপদ কেরানীগঞ্জে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ফিটনেস বিহীন কয়েকশত মাটি/বালির ট্রাক ও মাহেন্দ্র। ঢাকনা বিহীন এইসব যানগুলোর ধুলাবালিতে রাস্তায় দুর্ঘটনার পাশাপাশি বাড়ছে পরিবেশ দূষণও।

জিনজিরা ইউনিয়নে পরিক্ষা মূলক যে ময়লা ব্যবস্থাপনার আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন হয়েছে তা অপ্রতুল এবং অধিকাংশ সময় এটা বন্ধই দেখা যায়। কেরানীগঞ্জে দেশের প্রথম বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ার কথা থাকলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। সাথে দিনদিন বাড়ছে ময়লার স্তূপ, সাথে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন এলাকার নাম। একটি উপজেলায় কমবেশি ২০ লক্ষ লোকের বসবাস হলেও সে তুলনায় সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না এই এলাকার লোকজন।

অন্য খবর  হোটেল র‍্যাডিসনের কর্মচারীর লাশ গাজিপুরে উদ্ধার

পাশাপাশি উপজেলাটিতে দ্রুত শহরায়নের ফলে কমছে গাছপালাসহ ফসলি জমি। তাই পরিবেশ দুষণের আশংকা পরিবেশবিদদের।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যেসব দেশকে পরিবেশগত কারণে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে তার একটি বাংলাদেশ। এদেশে ২৮ শতাংশ মারা যায় পরিবেশ দূষণ জনিত কারণে যা সারা বিশ্বের গড় মাত্র ১৬ শতাংশ।

শব্দ ও বাযূ দূষণের ব্যাপারে রোহিতপুর বাজারের ভুক্তভোগী ডাঃ মনির হোসেন ভূইয়া বলেন, ছোট একটি রাস্তায় বিশালাকৃতির গাড়ি চলাচল করে, এসব গাড়িতে বাজানো হয় হাইড্রলিক্স হর্ণ যা রোগীসহ সাধারণ মানুষেরও সমস্যার কারণ। মাটিও বালুবাহী ট্রাকগুলোরও নেই কোন ঢাকনা। আর ফিটনেস বিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়াতো আছেই। এতো বলা এবং লিখার পরও কোন আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না।

কেরানীগঞ্জের পরিচিত মুখ সমাজকর্মী ডাক্তার হাবিবুর রহমান বলেন, কেরানীগঞ্জে নানা ভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। তার মাঝে বায়ু,পানি এবং শব্দ দূষণে সব চেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। দূষণের ফলে এই এলাকায় দূষণজনিত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন বায়ু দূষণের ফলে ফুসফুসের ক্যান্সার এবং হৃদরোগের দেখা দিতে পারে। এমনকি সেটা মস্তিষ্ক, লিভার বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও তৈরি করতে পারে। তাছাড়া দুষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে চোখ, নাক বা গলার সংক্রমণ হতে পারে। সেই সাথে ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অন্য খবর  আমাদের ছোট কক্সবাজার মৈনট ঘাট

আর শব্দের দুষণে হাইপার টেনশন, আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা বা স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে। এমনকি অতিরিক্ত শব্দের পরিবেশে থাকলে শিশুর জন্মগত ক্রুটির তৈরি হতে পারে। শব্দ দূষণের কারণে ব্লাড প্রেশার, শ্বাসের সমস্যা এমনকি হজমের সমস্যার তৈরি হতে পারে।

পানি দূষণে সাময়িক প্রভাবের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অনেক বেশি পড়ে। দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে চর্মরোগ, টাইফয়েড, জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের মতো রোগ হতে।

এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ বলেন, কেরানীগঞ্জ একটি ঘনবসতি এলাকা। এলাকাটি গ্রাম থেকে শহরে রুপান্তরিত হচ্ছে তাই কিছুটা পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এটা সত্য। তবে পরিবেশের কথা চিন্তা করে ইতোমধ্যে আমরা কেরানীগঞ্জের অসংখ্য ইট ভাটা, শিশা কারখানা, ডাইয়িং অ্যান্ড ওয়াশিং করখানা বন্ধ করে দিয়েছি। এখানে সেখানে ময়লা ফেলতেও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা জিনজিরা ইউনিয়নে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শোধনাগার ডাম্পিং মেশিন স্থাপন করেছি। মাননীয় বিদ্যুৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু দেশের প্রথম বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালুর যে ঘোষণা দিয়েছেন এটাও হচ্ছে কেরানীগঞ্জে। আশা করি অতিশীঘ্রই এর সুফল উপভোগ করবে কেরানীগঞ্জবাসী।

Comments

comments