চায়না জালে দেশীয় মাছ সংকটে

113
চায়না জালে দেশীয় মাছ সংকটে

ইছামতী ও পদ্মা নদীবেষ্টিত ঢাকা জেলার দোহার উপজেলা। এই উপজেলায় রয়েছে আড়িয়াল বিল,বিলাশপুর চকের বিল,নারিশা চকের বিল,মুকসুদপুর চকের বিল,কোঠাবাড়ি বিল,হিলশামারী খাল, ইউসুফপুরের বিল, মাহমুদপুর বিলসহ বেশকিছু বড় বিল। যা স্থানীয়ভাবে দেশীয় মাছের বড় যোগানদাতা। ইতিমধ্যে উপজেলার নিম্নাঞ্চলে নদ-নদীর পানি ঢুকেছে। আর এই নতুন পানিতে শুরু হয়েছে মাছের প্রজনন মৌসুম।

এই মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ কারেন্ট ও বাধাই জালের পর এবার ভয়ঙ্কর চায়না ম্যাজিক জালের ফাঁদে ধরা পড়ছে দেশীয় প্রজাতির বহু মাছ। অবৈধ এই জাল দিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু জেলেরা মা মাছ নিধন করলেও মৎস্য বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসনের নেই নজরদারি। দোহার উপজেলায় এখনো সক্রিয় রয়েছে বেশ কিছু চায়না জাল উৎপন্ন কেন্দ্র। তার মধ্যে জয়পাড়াতেই রয়েছে প্রায় পাঁচটি চায়না জালের কারখানা। এপর্যন্ত জয়পাড়ার বাহিরে চায়না জালের কারখানায় ২টি অভিযান চালিয়েছে দোহার উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু জয়পাড়া বাজারের চায়না জালের কারখানার খোঁজ ম্যৎস কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহারকে দিলেও তার বিরুদ্ধে কোন অভিযান পরিচালনা করেননি তিনি। চায়না জাল কারখানার শ্রমিকদের সাথে কথা বলেলে তারা জানান সব কিছু মেনেজ করেই তারা এই জালের কারখানা চালাচ্ছে।

অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীরা নদীতে অবাধে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে চলতি বছরেই দেশীয় মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির আশঙ্কা করছে অনেকেই।

মাছের সংকট তৈরি বিষয় মাহমুদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ আলমাস বলেন, চায়না জাল দিসে যে ভাবে মাছ নিধন করা হচ্ছে এতে করে আগামীতে মাছ না খেয়ে মরতে হতে পারে আমাদের। আমি বাজারে মাছ কিনতে গেলে দেশীয় মাছ পাইনা যাও পাওয়া যায় তাও আবার অনেক দাম।

দোহার উপজেলার মুকসুদপুর ইউনিয়নের দুবলী এলাকার মনির হোসেন বলেন, চায়না দুয়ারী বা রিংজাল মূলত মাছ ধরার এক ধরণের বিশেষ ফাঁদ। একে চায়না জাল, রিং জাল, ম্যাজিক জাল এবং ঢলুক জাল নামেও ডাকা হয়। এটি প্রায় ৬০ থেকে ৮০ ফুট লম্বা। ছোট ছোট কক্ষ বিশিষ্ট খোপের মতো। এ জাল বাঁশের খুঁটির সঙ্গে জালের দু’মাথা বেঁধে ফাঁদ পেতে রাখে খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ের তলদেশ দিয়ে। জালের কাঠামোতে লোহার থাকায় জালটি পানির তলদেশে পৌঁছায়। এই জাল ক্ষুদ্র ফাঁসের কারণে সেই পথ ধরে ছোট থেকে বড় যে কোন ধরণের মাছ চলাচল করলে অনায়াসে জালের ভেতরে প্রবেশ করবে। এই জালের ফাঁদে যে কোন মাছ প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না। এ জালে আটকা পড়ে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতের মাছ। এমন ছোট পোনাও আটকা পড়ে যা কোন কাজে লাগে না বলে সেগুলো ফেলে দেন মাছ শিকারিরা। ডারকি জাল দিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ডিমওয়ালা মা ও পোনা মাছ অবাধে নিধন করছে।

অন্য খবর  দোহারে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ

তিনি আরো বলেন, অবৈধ জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন, বংশ বিস্তার ও বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাবে নদ-নদীতে মাছের প্রাচুর্য কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে পানি বৃদ্ধি ও মাছের প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা চিংড়ি, পুটি, টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, তেলাপিয়া, বড় বেলে, বোয়াল, শোল, টাকিসহ প্রাকৃতিক সব মাছ এই চায়না জালে নিধন হচ্ছে। এতে ক্রমেই মাছ শূন্য হয়ে পড়ছে নদ-নদী, খাল-বিল ও ছোট নদীগুলো। অচিরেই এসব জাল বন্ধ না হলে দেশের মৎস্য ভান্ডারে বিপর্যয় নেমে আসার শঙ্কা স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে হাজেরা ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় কারখানার ব্যবস্থাপক ঈশ্বর কুমার বলেন, ‘আমরা লোন নিয়ে এই কারখানা দিয়েছি। আমরা তো ছোট পরিসরে কারখানা করেছি, অন্যরা বড় কারখানা করছে, তাতে তো কোনো দোষ নেই?’ গত বছর তো প্রশাসন অভিযান চালিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছিল। তাহলে এখন কেন আবার চালাচ্ছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই সমিতির মাধ্যমে এই চায়না জাল তৈরি করছি। আমাদের সব সুবিধা-অসুবিধা সমিতির লোকেরাই দেখেন।’

জয়পাড়া অবকাশ হলের পেছনের নিলু শেখের কারখানার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘অনেক টাকা ঋণ করে এই কারখানা দিয়েছি। আমাদের তৈরি জাল বৈধ; কারণ, এ জালের ফাঁকা আগেরটার চেয়ে বেশি, ফলে মাছের ডিম আটকা পড়ে না, শুধু মাছই আটকা পরে।

অন্য খবর  দোহারে পাঁচ জাল কারখানায় পুলিশের অভিযান

সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মাহমুদপুর,বিলাশপুর, ইউসুফপুর, কোঠাবাড়ি, আড়িয়াল বিল, নারিশা গ্রাম ঘুরে সারি সারি চায়না জাল দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া দোহারের বিভিন্ন এলাকায় যেখানেই একটু পানি জমেছে সেখানেই এই জাল পাতা হচ্ছে। আর অবাধে ডিমওয়ালা দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা হচ্ছে। চায়না জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে নতুন পানিতে মা মাছ ডিম ছাড়তে পারছে না। যার ফলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। পোনা মাছও ধরা পড়ছে এই জালে। এভাবে অবাধে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা মাছ ধরলে মাছের অভাব দেখা দেবে।

পৌরসভা এলাকার লালমদ্দিন বলেন, এই চায়না জালের প্রতি সকল মানুষই ক্ষিপ্ত। আমি নিজেও এই সর্বনাশা জালকে সাপোর্ট করি না। ইলিশ নিধন আইনের মতো চায়না জাল দিয়ে ডিমওয়ালা মা মাছসহ ছোট ছোট মাছ নিধনের বিষয়টি আইনের আওতায় আনা হলে ভালো হয়। এই সর্বনাশা জাল দিয়ে মাছ নিধনের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া দৃষ্টি আকর্ষণ করছি দোহার উপজেলা প্রশাসনের প্রতি। তা না হলে আমরা দেশি মাছ আর খুঁজে পাব না।

স্থানীয় পেশাদার জেলে গোবিন্দ বলেন, যারা প্রকৃত জেলে সম্প্রদায় মাছ ব্যবসায়ী, তারা কখনোই এই চায়না জাল দিয়ে মাছ ধরার পক্ষে না। এই জাল দেশে আসাতে অতি শিগগিরই দেশি মাছের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেবে। চায়না জালে সব ধরণের ছোট-বড় মাছই উঠে, সহজেই মাছ ধরা যায় এবং দাম কম হওয়ায় অহরহ স্থানীয় মৌসুমী মৎস্য শিকারীরা মাছ ধরতে নেমেছে। ফলে আমরা যারা বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখে মাছ ধরি তাদের জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে চায়না জাল কিনছে। এখন চায়না জাল দিয়ে যেভাবে ছোট মাছ ধরা হচ্ছে, তাতে শুষ্ক মৌসুমে মাছের তীব্র আকাল হবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহারকে ও দোহারের নৌ পুলিশ সামছুল আলমকে কয়েকবার ফোন দিলেও পাওয়া যায় নি।

মন্তব্য