কেমন আছেন দোহার-নবাবগঞ্জের করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীরা

375
কেমন আছেন করোনাভাইরাস রোগী

সারাবিশ্বে করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত। সারা বিশ্বের মতো দোহার নবাবগঞ্জেও প্রতিদিন শনাক্ত হচ্ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এই পর্যন্ত দোহারে করোনা সনাক্ত হয়েছে ৯১ জন, নবাবগঞ্জে শনাক্ত হয়েছে ১৫২ জন। এর মাঝে করোনা আক্রান্ত হয়ে দোহারে মারা গেছেন ২ জন, নবাবগঞ্জে ১ জন। কিন্তু কেমন আছেন দোহার-নবাবগঞ্জের করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীরা? তারা কি সামাজিক ভাবে কোন সমস্যায় পড়েছেন নাকি সামাজিক ভাবে সমর্থন পেয়ে করোনাকে মোকাবেলা করছেন। নিউজ৩৯.নেট চেষ্টা করেছে এই করোনা আক্রান্তদের বর্তমান অবস্থা সবার সামনে তুলে ধরতে। তুলে ধরার মাঝে যেমন কিছু নোংরা দিক বের হবে, ঠিক তেমনি ভাবে পাওয়া যাবে নিস্বার্থ ভাবে এই করোনা আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো কিছু মানুষের কথা।

প্রথমেই আসি দোহার উপজেলার নয়াবাড়ি ইউনিয়নের এক সন্দেহভাজন করোনা আক্রান্ত রোগীর কথা দিয়ে। দোহারের নয়াবাড়ি ইউনিয়নের ধোয়াইর বাজারের পাশে গরুর ব্যবসা করা এক যুবকের কথা দিয়ে। জাকির হোসেন (৩১) গরুর ব্যবসার জন্য ঘুরে বেড়ায় সারা দেশ। করোনা মহামারী যখন সারাদেশকে স্থবির করে দিলো সেই সময় জাকির হোসেন আটকা পড়েন করোনাভাইরাসের হটস্পট নারায়নগঞ্জে। রোজার শুরুতে কোন ক্রমে তিনি বাড়ি ফেরত আসেন। স্বভাবে একটু উগ্র জাকির হোসেনকে এলাকার সবাই হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বললেও সে মাঝে মাঝেই চেষ্টা করেছে বাড়ির বাইরে বের হতে। এরই মাঝে দোহার উপজেলা থেকে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়, দুই দিন পর রেজাল্ট আসে। কিন্তু নামের গরমিলের কারনে সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে নিগৃতের শিকার হয় জাকির হোসেন। এর ফলশ্রুতিতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় জাকির হোসেন। পরে যখন নামের গরমিলের ব্যাপারটা ধরা পরে তখন আবার বাড়ি ফেরত আসে জাকির হোসেন।

অন্য খবর  দোহারে কঠোর অভিযানে প্রশাসনঃ ৫১ প্রবাসীর বাড়িতে লাল নিশান

ঠিক এর উলটো চিত্র দেখা গেছে একই ইউনিয়নে। রোজার প্রথম দিকে যখন নয়াবাড়ি ইউনিয়নে সবুজ হোসেন নামে একজনের করোনা আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়। তখন নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে নয়াবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামীম আহমেদ সবুজের বাসার জন্য একমাসের খাবার নিজে বাড়িন পৌছে দিয়ে আসেন। ঠিক একই ঘটনা ঘটে নয়াবাড়ি ইউনিয়নের ২য় করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে। তার বাসার জন্যও এক মাসের বাজার নিজে পৌছে দেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শামীম আহমেদ হান্নান।

গত তিন মাসের টানা পরিশ্রমের কারনে শামীম আহমেদ হান্নান এখন নিজেই নিউমোনিয়া, ডায়বেটিকস ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান তাবিথ আহমেদ পাভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় নবাবগঞ্জের সামনের সারিতে থাকা একজন জনপ্রতিনিধি। দিন নেই, রাত নেই যেকোন ফোনেই তিনি চষে বেড়াচ্ছেন নবাবগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়ন। কারো খাবার নেই, করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে সামাজিক ভাবে একঘরে করা পরিবারের বাড়িতেও তিনি রাতের আঁধারে পৌছে দিচ্ছেন খাবার। কোন মাদ্রাসার ছাত্রের খাবার নেই, মাদ্রাসা শিক্ষকের ঘরে খাবার নেই, সবকিছুই তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে খাবার পৌছে দিচ্ছেন তিনি বাড়িতে বাড়িতে। নিজের উদ্যোগে তিনি তৈরি করেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতদের জানাজা, কাফন করানোর জন্য স্বেচ্ছাসেবক ইউনিট।

অন্য খবর  দোহারে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ৭ জনকে অর্থদন্ড

সবার অলক্ষ্যে দোহার ও নবাবগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগের করোনা প্রতিরোধের জন্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন দোহার ও নবাবগঞ্জের দুই কৃতি সন্তান। দোহারের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ডা. জসিম উদ্দিন ও নবাবগঞ্জের করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন ডা. হরগোবিন্দ সরকার অনুপ। সম্ভাব্য করোনা রোগী চিহ্নিত করতে বাড়ি বাড়ি যেয়ে করোনা রোগী শনাক্ত করছেন এই দুই জন। রাত নেই, দিন নেই তারা ছুটে বেড়াচ্ছেন দোহার-নবাবগঞ্জের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। চিহ্নিত করছেন করোনা আক্রান্ত রোগীদের বাড়ি, সচেতনতা সৃষ্টি করছেন সাধারন মানুষের মাঝে।

কিন্তু তাদের মাঝেও রয়েছে হতাশা। তারা হতাশ সাধারন মানুষের করোনা রোগীদের প্রতি ব্যবহার নিয়ে। নিউজ৩৯.নেট-এর কাছে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ডা. জসিম উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, করোনা শুধু মাত্র একটা রোগ। এই রোগে সচেতন না হলে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে। তবে আক্রান্ত রোগীর সাথে সাধারণ মানুষের ব্যবহার খুবই দুঃখজনক। তারা অতি উৎসাহী হয়ে করোনা রোগীর বাড়ি লকডাউন দিয়ে সামাজিকভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীদের হেয় করছে। ফলে কেউ নিজের মাঝে করোনা সংক্রমনের লক্ষন দেখলেও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে আমাদের কাছে আসে না। মানুষের মাঝে সচেতনতা যেমন দরকার ঠিক তেমনিভাবে মানবিকতা বোধের বিকাশও অতি জরুরী।

Comments

comments