চুড়াইনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন বিদ্রোহী প্রার্থী

নবাবগঞ্জে চুড়াইন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নিজের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ালেন উপজেলা আ.লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া। গত সোমবার সন্ধ্যায় চুড়াইন ইউনিয়নের আকারবাগ স্কুল মাঠে আয়োজিত দলীয় সভায় তিনি এ ঘোষণা দেন।

জানা গেছে, তফসিল অনুযায়ী নবাবগঞ্জের ১৪ ইউপিতে আগামী ৭ মে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দলীয় প্রার্থী, মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রার্থী বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। দলের ঘোষণায় চুড়াইন ইউপির আ.লীগের মনোনীত প্রার্থী আব্দুল জলিল বেপারি। গত সোমবার বিকালে দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া প্রার্থিতা থেকে সরে গিয়ে জলিল বেপারিকে সমর্থনের ঘোষণা দেন।

এ সময় দলের নেতাকর্মীরা তাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে বরণ করে নেন।

গতকাল বিকালে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

নবাবগঞ্জের ১৪ ইউপিতে প্রতীক চুড়ান্ত

চতুর্থ ধাপে আগামী ৭ মে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে নিবার্চন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৯ এপ্রিল মঙ্গলবার আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও জাতীয়পার্টি, জাসদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিক বরাদ্দ করা হয়। উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়-

কলাকোপা ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের মনোনিত প্রার্থী আলহাজ্ব মো. ইব্রাহীম খলিল (নৌকা), বিএনপির মহসিন রহমান তুষার (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র মীর আরিফ (আনারস)।

চূড়াইন ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের প্রার্থী হাজী আব্দুল জলিল (নৌকা), জাতীয়পার্টির আসমা আক্তার রুমি (লাঙ্গল), বিএনপির হাজী ইউসুফ আলী খান (ধানের শীষ)।

বান্দুরা ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের নাসির উদ্দিন (নৌকা), স্বতন্ত্র হিল্লাল মিয়া (আনারস)।

নয়নশ্রী ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের পলাশ চৌধুরী (নৌকা), জাতীয় পার্টির রিপন মোল্লা (লাঙ্গল),  বিএনপির হাবিবুর রহমান খান (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সারোয়ার আলম (হাতপাখা), স্বতন্ত্র হাবিবুর রহমান (আনারস), স্বতন্ত্র মো মাসুদ মোল্লা (চশমা), স্বতন্ত্র সোরহাব হোসেন (টেবিল ফ্যান), মো. আলমগীর (ঘোড়া), স্বতন্ত্র মো. হাবিবুর রহমান (মটর সাইকেল)।

যন্ত্রাইল ইউনিয়ন: আওয়ামী লীগের নন্দ লাল সিং (নৌকা), বিএনপির মো. সেন্টু (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র আকুল বেপারী (ঘোড়া), স্বতন্ত্র মো. বারেকুর রহমান (আনারস)।

শোল্লা ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের দেওয়ান তুহিন রহমান (নৌকা), বিএনপির নাসির আহসান পলাশ (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র দেলোয়ার হোসেন খান (আনারস), স্বতন্ত্র মো. ফজলুল হক (চশমা), জাসদের আইয়ুব খাঁন (মশাল)।

কৈলাইল ইউনিয়ন: জাতীয় পার্টির প্রার্থী আয়নুল চৌধুরী (লাঙ্গল), আওয়ামীলীগের পান্নু মাদবর (নৌকা), বিএনপির সেলিম শেখ (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র মোক্তার হোসেন (চশমা), স্বতন্ত্র নাসির উদ্দিন (আনারস), স্বতন্ত্র ডা. জুলহাস উদ্দিন (মটর সাইকেল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোজাম্মেল হক টুলু (হাত পাখা)।

বক্সনগর ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের আব্দুল ওয়াদুদ মিয়া (নৌকা), বিএনপির এরশাদ আল-মামুন (ধানের শীষ)।

বাহ্রা ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের অ্যাডভোকেট সাফিল উদ্দিন মিয়া (নৌকা), বিএনপির হাজী আব্দুস সালাম (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র সুবেদ্দুজ্জামান সুবেদ (আনারস)।

আগলা ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের সুরুজ খান (নৌকা), বিএনপির আবেদ হোসেন (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র  মো. রাসেদ খান (আনারস), স্বতন্ত্র এস এম মোক্তারুজ্জামান মিল্টন (মটর সাইকেল)।

গালিমপুর ইউনিয়ন: জাতীয় পার্টির শিল্পী ইসলাম (লাঙ্গল), আওয়ামীলীগের আজিজুর রহমান ভূইয়া (নৌকা), বিএনপির তপন মোল্লা (ধানের শীষ)।

জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের আবুল হোসেন (নৌকা), বিএনপির মাসুদুর রহমান (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র মো. কামাল হোসেন (আনারস). মো মাহফুজ খান (চশমা), মোতাহার হোসেন (মটর সাইকেল)।

শিকারীপাড়া ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের আলীমোর রহমান খান পিয়ারা (নৌকা), বিএনপির আব্দুল জব্বার (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র মোজাম্মেল হক টিপু (আনারস)।

বারুয়াখালী ইউনিয়ন: আওয়ামীলীগের ইঞ্জিনিয়ার আরিফ শিকদার (নৌকা), বিএনপির আবদুল্লাহ আল-মামুন (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র রজ্জব মোল্লা (আনারস) প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়।

এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা আসনে ১২৬ ও সাধারণ সদস্য পদে ৪৬০ প্রার্থী প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শেখ হাবিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

শিকারীপাড়ায় আ.লীগ বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মীদের ওপর হামলা

নবাবগঞ্জ উপজেলার শিকারীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ‍প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ সময় ৮টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে হামলাকারীরা। এতে বিদ্রোহী প্রার্থীর ৫ সমর্থক আহত হন।

মঙ্গলবার (১৯ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার হাগ্রাদী বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিদ্রোহী প্রার্থী মোজাম্মেল হক টিপুর সমর্থকরা মোটরসাইকেল বহর নিয়ে শিকারীপাড়া বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় হাগ্রাদী বাজার এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলিমোর রহমান খানের সমর্থকরা লাঠি-সোটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা করেন।

হামলায় টিপুর ৫ কর্মী আহত হন। তাদের মধ্যে নূর ইসলামকে নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অন্যদের স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

বিদ্রোহী প্রার্থী মোজাম্মেল হক টিপুর অভিযোগ পরিকল্পিতভাবে তার সমর্থকদের ওপর হামলা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলিমোর রহমান খান পিয়ারার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

নবাবগঞ্জ থানার ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম সুমন জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।

বৃহত্তর বাংলা ও ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের সুপরিকল্পিত গণহত্যা

পৃথিবীর ইতিহাস সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। সত্য ইতিহাস হচ্ছে সভ্যতার প্রকৃত দর্পণ। আর প্রকৃত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি ও অগ্রগতির সোপানগুলো অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু বলা হয় শক্তিমান ও বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে। জালিম ও আধিপত্যকামী শক্তিগুলো যুগে যুগে ইতিহাসকে তাদের স্বার্থে করেছে বিকৃত। বিশেষ করে উপনিবেশবাদী পশ্চিমা শক্তিগুলো দেশে দেশে তাদের শোষণ-লুণ্ঠন, হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতাসহ নানা অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে, কিংবা সেইসব অপরাধের পক্ষে নানা অপযুক্তি দেখিয়ে সেগুলোকে বৈধ ও অনিবার্য বলে দেখানোর চেষ্টা করেছে।

অবশ্য বড় ধরনের অপরাধগুলো কখনও পুরোপুরি গোপন রাখা যায় না এবং হাজারো অপযুক্তি দেখিয়েও সেসবকে বৈধ বলে চালিয়ে দেয়া যায় না। বিশ্বের নানা অঞ্চলে উপনিবেশবাদী ব্রিটেনের অপরাধযজ্ঞও এমনই একটি বিষয়। ভারত উপমহাদেশের বৃহত্তর বাংলায় ১১৭৬ বাংলা সনের তথা ১৭৬৯-৭০ খ্রিস্টাব্দের মহা-দুর্ভিক্ষকে অনেক গবেষকই ব্রিটিশদের পরিকল্পিত গণহত্যা বলে মনে করছেন।  সেই থেকে ১৮টি দশক তথা ১৮০ বছর ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা বৃহত্তর বাংলা ও ভারতের নানা অঞ্চলে ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রায় দশ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে বলে তারা প্রামাণ্য নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন।

বলা হয় ১৭৬৯ থেকে ১৭৭৩ সালের খরায় নিহত হয়েছিল এক কোটি বাঙ্গালি। বৃহত্তর বাংলার এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা কমে যায় এর ফলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজরা একদল বিশ্বাসঘাতক ও লোভী কর্মকর্তা আর ব্যবসায়ীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে প্রহসনের এক যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত ও শহীদ করার ৫ বছরের মধ্যেই ঘটানো হয় এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ।  এ দুর্ভিক্ষে বাংলার মানুষ যখন ক্ষুধার জ্বালায় মরছিল তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা লন্ডনে তাদের মনিবদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছিল যে তারা বাণিজ্য হতে ও বিপুল পরিমাণ খাদ্য রপ্তানি করে সর্বোচ্চ মাত্রার মুনাফা অর্জন করেছে!

এ সময় ইংরেজরা পুতুল সরকার হিসেবে মিরজাফরকে নামেমাত্র নবাবের  পদে রাখলেও রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব পায় তাদের কোম্পানি। আর এই সুযোগে কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়।  বিপুল অংকের খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে কৃষকরা অর্থহীন ও শস্যহীন হয়ে পড়েছিল। ফলে তাদের চাষাবাদের ক্ষমতা রহিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় আগেই সব শস্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার পর  খরা দেখা দেয়ায় কৃষকরা সপরিবারে মারা যায় অনাহারে। ব্রিটিশদের অনুচর মুসলমান-বিদ্বেষী জমিদাররা অতি উচ্চ হারের খাজনা মওকুফ করলে বা খাজনার চড়া হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনলে এবং কিছুটা খাদ্য ত্রাণ সাহায্য হিসেবে বিতরণ করা হলে এই গণহত্যা ঘটতো না।

সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামল ও নদীমাতৃক বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাকে বলা হত গোটা ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় শস্য-ভাণ্ডার। গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল সে সময়কার বাংলার সাধারণ চিত্র। গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল পুকুর যা এখনও আছে। কিন্তু ব্রিটিশদের দানবীয় হস্তক্ষেপ আগুন জ্বালিয়ে দিল এই সুখের রাজ্যে। ব্রিটিশরা বাংলার ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ অঞ্চলে ত্রিশ থেকে ৪০টি ছোট-বড় দুর্ভিক্ষ হয়েছে। এসব দুর্ভিক্ষে নিহতের যেসব সংখ্যা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসকরা উল্লেখ করে গেছে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

বাংলায় ব্রিটিশ শাসকদের মাধ্যমে সর্বশেষ বড় দুর্ভিক্ষটি ঘটানো হয় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে। ব্রিটিশদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ তিন বছরে কমপক্ষে চার কোটি মানুষ মারা যায় অনাহারে।

১৯৪২ সালের মে মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানি সেনারা বার্মা দখল করে নেয়। ওদিকে সুভাস চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী ভারতের জাতীয় সেনাদলও পূর্ব দিক থেকে ভারতে হামলা করতে পারে বলে ব্রিটিশ দখলদাররা আশঙ্কা করছিল। এ সময় নিষ্ঠুর ব্রিটিশরা পোড়ামাটির নীতি গ্রহণ করে। এ কূটচাল অনুযায়ী জাপানি সেনারা যাতে খাদ্য পেতে না পারে সে জন্য সব খাদ্য কিনে নেয় ব্রিটিশরা। অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সেনারা খাদ্য লুট করে ও বহু স্থানীয় অধিবাসীকে হত্যা করে। জাপানিদের হাতে বিতাড়িত ব্রিটিশ সেনারা আশ্রয় নিতে থাকে কোলকাতা ও চট্টগ্রামে। ব্রিটিশ সরকার তাদের জন্য খাদ্য কিনতে থাকায় খাদ্যের দাম আকাশস্পর্শী হয়ে ওঠে।

জাপানি সেনারা যাতে বঙ্গোপসাগরে নৌকা ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য জেলেদের প্রায় ৭০ হাজার নৌকা আটক করে ব্রিটিশ সরকার। ফলে একদিকে যেমন মাছ ধরা অসম্ভব হয়ে পড়ে তেমনি ধান ও পাট বাজারে আনাও কৃষকদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে। বিমানবন্দর, সেনা-ঘাঁটি ও শরণার্থী শিবিরের মত নানা স্থাপনা নির্মাণের জন্য ব্রিটিশরা প্রায় দুই লাখ বাঙ্গালির জমি কেড়ে নেয়। ফলে তারা হয়ে পড়ে গৃহহারা।

ব্রিটিশ সরকার ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাংলায় খাদ্য পাঠানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাপানিরা সম্ভাব্য হামলার সময় যাতে খাদ্য না পায় সে জন্য এই বর্বর পদক্ষেপ নেয় দখলদার ব্রিটিশ সরকার।

অন্যদিকে অপেশাদার ব্যবসায়ীদেরকে এ সুযোগ দেয়া হয় যে তারা যে কোনো অঞ্চল থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে খুব চড়া দামে তা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এভাবে বাংলার সমস্ত খাদ্য-শস্য জমা হতে থাকে কেবল সরকারি গুদামে। অন্যদিকে খাদ্য-শস্যের দাম আগুন হয়ে ওঠে। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও চড়া দামে সরকারের কাছে শস্য বিক্রির আশায় বাজারে খাদ্য না বেচে মজুতদারির আশ্রয় নেয়।

এদিকে ব্রিটিশ সরকার সেনাদের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য ব্যাপক পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপায়। ফলে দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি। অন্য কথায় জনগণের কাছে থাকা অর্থের ক্রয়মূল্য কমে যায়।  এভাবে দেখা দেয় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। কিন্তু দখলদার ব্রিটিশ সরকার তা স্বীকার করেনি এবং জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেনি, ত্রাণ সাহায্য দেয়া তো দূরের কথা।

যুদ্ধের আগে দখলদার ব্রিটিশ সরকার প্রায় দুই কোটি টন খাদ্য কিনেছিল। ৪২-৪৩ সনে রেকর্ড মাত্রায় উদ্বৃত্ত খাদ্য ছিল বলেও ওই সরকার স্বীকার করেছিল। বাংলার শোচনীয় অবস্থার কথা ব্রিটেনের সংসদে তোলা হয়। ফলে ৪৩ ও ৪৪ সনে ভারতে মাত্র প্রায় ৫ লাখ টন খাদ্য পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। অথচ কেবল ৪৩ সনে ব্রিটেনের ৫ কোটি নাগরিকের জন্য কেনা হয়েছিল এক কোটি টন খাদ্য।  ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বার বার ভারতে খাদ্য রপ্তানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল যদিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রায় ২৫ লাখ ভারতীয় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়।

বলা হয় সেই দুর্ভিক্ষে বাঙালীদের মৃত্যুতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেনারেল উইনস্টন চার্চিল উল্লাস করেছিল!

অস্ট্রেলিয়ান প্রাণ-রসায়নবিদ ড. গিদেন পলইয়া তৎকালীন বাংলার ঐ দুর্ভিক্ষকে ‘মানবসৃষ্ট গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ চার্চিলের নীতিই ঐ দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল। ১৯৪২ সালেও বাংলায় বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ভারত থেকে ব্রিটেনে নিয়ে যায়। যার ফলে এখানে ব্যাপক খাদ্যাভাব দেখা যায়। বর্তমান সময়ের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, বিহার এবং বাংলাদেশে ঐ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে অনাহারে ধুকে ধুকে মরতে থাকা মানুষের ছবি এঁকে বিখ্যাত হয়েছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন।

মধুশ্রী মুখার্জির লেখায় ঐ দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের কথা উঠে এসেছে। দুর্ভিক্ষে নিহতদের পরিবার সদস্য এবং দুর্ভিক্ষে বেঁচে যাওয়া মানুষদের জবানিতে ঐ চরম সময়ের কথা উঠে এসেছে।

চার্চিলের ঐ গোপন যুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেন: ‘মা বাবারা তাদের ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েদেরকে কুয়াতে ও নদীতে ফেলে দিতো। অনেকে ট্রেনের সামনে নিজেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা করতো। ক্ষুধার্ত মানুষ ভাতের মাড় চেয়ে ভিক্ষা করতো। শিশুরা পাতা, ফুল, ঘাস এবং বিভিন্ন তৃণমূল খেত। মানুষ এতই দুর্বল ছিল যে তারা তাদের প্রিয়জনদের দাফন পর্যন্ত করতে পারতো না।’

দুর্ভিক্ষে বেঁচে যাওয়া এক ব্যক্তি মুখার্জিকে বলেন, ‘শেষকৃত্য করার মত কারও গায়ে শক্তি ছিল না। বাংলার গ্রামগুলোতে মরদেহের স্তূপ থেকে কুকুর শিয়ালরা তাদের ভুরিভোজ করতো। মায়েরা খুনিতে পরিণত হয়েছিল, গ্রামগুলো হয়ে পড়ে পতিতা-পল্লী। আর বাবারা ছিল কন্যা সন্তান পাচারকারী।’

মনি ভৌমিক নামের একজন বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ, সেই দুর্ভিক্ষ নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, তাকে এক মুঠো খাবার দেয়ার জন্য তার নানী তার অল্প খাবারটুকুও তাকে দিয়ে দিতেন। এতে তিনি না খেয়ে মারা যান।

১৯৪৩ সালে ক্ষুধার্ত মানুষের দল কলকাতায় এসে ভিড় জমায় যাদের বেশিরভাগই রাস্তায় মারা যায়। এরকম ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে হৃষ্টপুষ্ট ব্রিটিশ সেনাদের উপস্থিতিকে ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শেষ রায়’ হিসেবে দেখেন ইংরেজ-ভক্ত জওয়াহারলাল নেহরু।

চার্চিল খুব সহজেই এই দুর্ভিক্ষটি এড়াতে পারত। এমনকি কয়েক জাহাজ খাবার পাঠাইলেই অনেক উপকার হতো। কিন্তু একে একে দুজন ভাইসরয়ের আবেদনকে একগুঁয়েমির সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির আবেদনের প্রতিও কর্ণপাত করেননি।

নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু তখন অক্ষ শক্তির পক্ষ নিয়ে লড়াই করছিলেন। তিনি মায়ানমার (বার্মা) থেকে চাল পাঠানোর প্রস্তাব করেন। ব্রিটিশরা তো তার চাল আসতে দেয়নি এমনকি সুভাস বসুর প্রস্তাবের খবরটি পর্যন্ত চাপা দিয়ে রেখেছিল।

নিষ্ঠুর চার্চিল বাঙালীদেরকে মৃত্যুর মিছিলে রেখে খাদ্য শস্য ব্রিটিশ সেনা ও গ্রিক নাগরিকদের জন্য পাঠাচ্ছিল। তার কাছে ‘ভুখা বাঙালীর না খেয়ে থাকার চেয়ে সবল গ্রিকদের না খেয়ে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।’ তার এই মতকে সমর্থন দিয়েছিল তৎকালীন ‘ভারত ও বার্মা বিষয়ক’ ব্রিটিশ মন্ত্রী লিওপল্ড এমেরি।

এমেরি ছিল একজন কড়া উপনিবেশবাদী। তারপরও তিনি চার্চিলের ‘হিটলারের মত মনোভাবের’ নিন্দা করেছিল। চার্চিল শস্য পাঠানোর জন্য এমেরির জরুরি আবেদন এবং তৎকালীন ভাইসরয় আর্চিবাল্ড ওয়াভেল এর প্রার্থনার উত্তর দেয় একটি টেলিগ্রামে। সেখানে চার্চিল লিখেছিল, গান্ধী কেন তখনো মরেন নি!

ওয়াভেল লন্ডনকে অবহিত করে যে ঐ দুর্ভিক্ষটা ‘ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলে মানুষের উপর নামা সবচেয়ে বড় দুর্যোগ’। তিনি বলেন, যখন হল্যান্ডে খাদ্যাভাব দেখা দেয় তখন বলা হয় ‘খাদ্য-জাহাজ অবশ্যই সরবরাহ করা হবে। এর উল্টো উত্তরটিই বরাদ্দ থাকে ইন্ডিয়াতে খাবার সরবরাহের বেলায়।’

চার্চিল কি অজুহাতে এখানে খাবার পাঠানোর অনুমতি দেয়নি? বর্তমানে চার্চিলের পরিবারের সদস্য ও তার সমর্থকরা বলার চেষ্টা করেন যে ব্রিটেন জরুরী খাদ্য সরবরাহ কাজে জাহাজগুলোকে নিযুক্ত করতে চাচ্ছিল না। কারণ যুদ্ধের জন্য সব জাহাজ প্রস্তুত রাখতে হয়েছিল। কিন্তু মধুশ্রী মুখার্জির লেখায় সব প্রমাণ বের হয়েছে, সব রহস্য উদঘাটিত হয়েছে যে তখন ঠিকই ব্রিটেনের জাহাজ অস্ট্রেলিয়া থেকে খাদ্য শস্য নিয়ে ইন্ডিয়ার পথ দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে রওনা হতো।

ভারতীয়দের প্রতি চার্চিলের বিদ্বেষ একটি জানা ঘটনা। চার্চিল তার ওয়ার কেবিনেট বা যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভার বৈঠকে এই দুর্ভিক্ষের জন্য ইন্ডিয়ানদেরকেই দায়ী করে। ‘এরা খরগোশের মত বাচ্চা পয়দা করে’ -এমন অশালীন মন্তব্যও বের হয়েছে তার মুখ থেকে। ভারতীয়দের প্রতি তার মনোভাব এমেরির কাছে তুলে-ধরা তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। চার্চিল বলেছিল ‘আমি ইন্ডিয়ানদের ঘৃণা করি। তারা একটি জঘন্য ধর্মের জঘন্য মানুষ ( বিশ্রী ধর্মের বিশ্রী মানুষ’)’। চার্চিল অন্য এক সময় বলেছিল ‘ভারতীয়রা হচ্ছে জার্মানদের পর সবচেয়ে জঘন্য মানুষ।’

মুখার্জির মতে, ‘ভারতের প্রতি চার্চিলের মনোভাব ছিল একেবারে চরম এবং তিনি ইন্ডিয়ানদেরকে ভীষণ ঘৃণা করতেন। তারা যে আর ইন্ডিয়াকে বেশিদিন নিজেদের করে রাখতে পারছে না -এই অভাব-বোধ থেকেই তার এই তীব্র ঘৃণা জন্মাতে পারে। চার্চিল হাফিংটন পোস্টে লেখেন, অ-শ্বেতাঙ্গ লোকদের পেছনে গম খরচ করা অনেক খরচের ব্যাপার, তাও আবার বিদ্রোহীদের পেছনে যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে স্বাধীনতা দাবি করে আসছে। চার্চিল তার সংরক্ষিত খাদ্যশস্য যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয়দের খাওয়ানোকেই শ্রেয় মনে করলেন।’

১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাস। তখন দুর্ভিক্ষ চরম সীমায়। ওয়াভেলকে নিয়োগ উপলক্ষে একটি বিশাল ভোজ-উৎসবে চার্চিল বলেছিল, ‘আমরা যখন পেছনের বছরগুলোর দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই একটি অঞ্চলে তিন প্রজন্ম পর্যন্ত কোন যুদ্ধ নেই, দুর্ভিক্ষ পালিয়ে গেছে। শুধু সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত যুদ্ধ আমাদেরকে সেই পুরনো স্বাদ দিচ্ছে…মহামারি আর নেই..ইন্ডিয়ান ইতিহাসে এই সময়কালটা একটি সোনালী অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। ব্রিটিশরা তাদেরকে শান্তি দিয়েছিল, শৃঙ্খলা দিয়েছিল এবং দিয়েছিল গরীবদের জন্য ন্যায়বিচার এবং বিদেশী আক্রমণের শঙ্কা থেকে মুক্তি।’!!!

চার্চিল যে শুধু বর্ণবাদীই ছিল তা নয়, একইসঙ্গে ছিল এক বড় মাপের মিথ্যুকও।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলায় চার্চিলের পলিসি আসলে ভারতের প্রতি ব্রিটিশদের আগের পলিসিরই অনুকরণ। ভিক্টোরিয়া শাসনকালের শেষের দিকে গণহত্যা বিশেষজ্ঞ মাইক ডেভিস দেখান যে ব্রিটিশদের ১২০ বছরের ইতিহাসে ৩১ টি ভয়ানক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। অথচ  ব্রিটিশদের আসার আগের দুই হাজার বছরে ১৭টি দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

তার বইয়ে ডেভিস ঐ দুর্ভিক্ষের গল্পগুলো বলছিলেন যেখানে ২৯ মিলিয়ন ইন্ডিয়ান (প্রায় তিন কোটি ইন্ডিয়ান) মারা গিয়েছিল। ঐ লোকগুলো আসলে ব্রিটিশ পলিসির কারণে মারা গিয়েছিল। ১৮৭৬ সালে খরার কারণে যেখানে ডেকান বা দাক্ষিণাত্যের মালভূমিতে কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হচ্ছিলেন সে বছর ইন্ডিয়াতে ধান ও গমের নেট উদ্বৃত্ত হয়েছিল। কিন্তু ভাইসরয় রবার্ট বুলওয়ার লিটন জোর দেন যে ইংল্যান্ডে  শস্য রপ্তানি করা থেকে কোন কিছুই তাকে বিরত রাখতে পারবে না।

১৮৭৭ ও ১৮৭৮ সালে দুর্ভিক্ষের চরমসীমায় শস্য ব্যবসায়ীরা রেকর্ড পরিমাণ শস্য রপ্তানি করেছিল। যখন কৃষকরা না খেয়ে মরছিল তখন ‘সবধরনের ত্রাণ কাজকে নিরুৎসাহিত করার জন্য’ সরকার থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

শুধু শ্রমিক ছাউনিতে ত্রাণ দেয়া হতো। ঐ শ্রমিক ছাউনিগুলোতে যে পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হতো তার চেয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বন্দী শিবিরে বেশি খাবার সরবরাহ করা হতো।

যখন লাখ লাখ ইন্ডিয়ান মারা যাচ্ছিল তখন লিটন ভারতীয়দের কষ্ট লাঘবের কোন চেষ্টাই করেনি। বরং ইন্ডিয়ার সম্রাজ্ঞী হিসেবে রাণী ভিক্টোরিয়ার অভিষেক আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এক সপ্তাহ ব্যাপী ঐ ভোজন উৎসবে ৬৮ হাজার অতিথি আপ্যায়িত হয়েছিল যেখানে রাণী জাতির কাছে ‘সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

১৮৯০’র দিকের দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৯ মিলিয়ন ভারতীয় (প্রায় দুই কোটি) মারা গেছে বলে অনুমান দ্য লেনসেট সাময়িকীর। ১৯০১ সালে  চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই সাময়িকীতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মৃত্যুহার এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে কারণ ছিল ব্রিটিশরা দুর্ভিক্ষকালীন ত্রাণ বিতরণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

ডেভিস বলেন, ১৮৭২ থেকে ১৯২১ পর্যন্ত এই সময়কালটিতে ভারতীয়দের গড় আয়ু ২০ শতাংশ কমে এসেছিল। তাই এটা খুব বিস্ময়ের ব্যাপার না যে, হিটলারের প্রিয় সিনেমা ছিল ‘দ্য লাইবস্ অব এ বেঙ্গল ল্যান্সার’ যেখানে দেখানো হয়েছিল গোটা কয়েক ব্রিটিশ কিভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রেখেছিল। নাৎসি নেতা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড ওড (আর্ল অব হ্যালিফ্যাক্স) এর সাথে বলেন যে, তার প্রিয় সিনেমা ওটা কারণ ‘এভাবেই একটি উচ্চতর জাতির আচরণ করা উচিত’ এবং এই ছায়াছবি দেখা নাৎসিদের জন্য বাধ্যতামূলক বলা হতো।

যেখানে ব্রিটেন অন্যান্য জাতিসমূহের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে সেখানে ইন্ডিয়া এই গণহত্যার বিষয়টি কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। মাও মাও হত্যাকাণ্ডের জন্য কেনিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে ব্রিটেন। অন্যান্য জাতিও আমাদের জন্য ভালো উদাহরণ উপস্থাপন করে রেখেছে।

যেমন ইহুদিবাদী ইসরাইল কথিত গণহত্যা বা হলোকাস্টের কথা বলে এখনো  মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আদায় করছে জার্মানির কাছ থেকে এবং তারা জার্মানির কাছ থেকে সামরিক সহায়তাও আদায় করে নিচ্ছে। যদিও অনেকেই মনে করেন যতটা প্রচার করা হয় তার দশ ভাগের একভাগ ইহুদিকেও হত্যা করেনি হিটলারের নাৎসি বাহিনী।

আর্মেনিয়াও দাবি করে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি বাহিনী  ১৮ লক্ষ আর্মেনিয়ানকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।  তুরস্ক এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। (তারা বলে, কেবল আর্মেনীয় বিদ্রোহী ও লুটেরাদেরই হত্যা করা হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে।) জোসেফ স্ট্যালিনের কাতিয়ান হত্যাকাণ্ডের কথা ভুলবে না পোলিশরা। চাইনিজরা এখনো জাপানের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে আসছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নানকিং এ ৪০ হাজার খুন হয় এবং অসংখ্য নারী ধর্ষিত হয়। এবং তারপর এক মজার ঘটনা ঘটলো ইউক্রেনে। ইউক্রেনিয়ানরা তাদের দেশে দেখা দেয়া দুর্ভিক্ষের পেছনে স্টালিনের অর্থনৈতিক নীতিকে দায়ী করেছেন। এমনকি তারা এর নতুন নামকরণ করেছেন। নামটা হলোকাস্টের অনেক কাছাকাছি ‘হলোদমোর’।

 উল্লেখ্য ১৯৪৩ সালের দিকে মিত্র বাহিনীর হয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ২৫ লক্ষ ভারতীয় সেনা যুদ্ধ করেছিল। ব্রিটেনের তেমন কোন খরচ ছাড়া-ই বিশাল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়েছে এখান থেকে। ইউরোপে জাহাজে করে পাঠানোর ক্ষেত্রেও ব্রিটেনের তেমন খরচ করতে হয়নি।

ভারতের  কাছে ব্রিটেনের যে ঋণ তা দুদেশের কেউই অবজ্ঞা করতে পারবে না। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক টিম হার্পার ও ক্রিস্টোফার বেইলির মতে, ‘ভারতীয় সেনা, বেসামরিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণেই ১৯৪৫ সালের বিজয় সম্ভবপর হয়েছিল। তার মূল্য হচ্ছে খুব দ্রুত ভারতের  স্বাধীনতা।’

২৫০ বছরের ঔপনিবেশিক লুটপাটের ক্ষতিপূরণের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নেই পুরো ইউরোপেও। অর্থের কথা না হয় বাদই দিলাম একটা ক্ষমা প্রার্থনা করার মত সৎ সাহসও কি নাই ব্রিটিশদের? অথবা তারা কি চার্চিলের মত নিজেদেরকে এই আত্মপ্রবঞ্চনা দিয়েই রাখবে যে, ভারতে ইংরেজদের শাসন ছিল একটা ‘স্বর্ণযুগ’ (গোল্ডেন এজ)?

বলা হয় হিটলার লাখ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছিল জাতিগত বিদ্বেষ বা ঘৃণার কারণে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার কেন কোটি কোটি বাঙালীকে হত্যা করেছিল? ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পরও বাংলা  ও ভারতে অনেক দুর্ভিক্ষ হয়েছে। কিন্তু এসব দুর্ভিক্ষে যত মানুষ মারা গেছে তার সংখ্যা ব্রিটিশদের সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ও বর্বর আচরণে নিহত মানুষের এক দশমাংশেরও কম হবে।

দুর্নীতিবাজ ও বর্বর ব্রিটিশদের অন্ধ-অনুচর টাইপের একদল বাঙালী ও ভারতীয় বুদ্ধিজীবী বলেন, ব্রিটিশ দখলদাররা নাকি এ অঞ্চলে সুশাসন, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র এনেছে ইত্যাদি!

অথচ এর আগে নবাবদের আমলে, মোঘল শাসনে ও সুলতানি যুগে কখনও এমন নিষ্ঠুরভাবে খাদ্য-শস্যকে গুদামে রেখে সাধারণ জনগণকে হত্যা করেনি কোনো সরকার। ব্রিটিশ শাসকদের এসব অপরাধ মানবজাতির অতীতের সব অপরাধের নৃশংসতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাই অনেকেই বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে সেইসব অপরাধের জন্য ব্রিটিশ শাসকদের বিচার করা উচিত ছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-অপরাধ আদালতে ঠিক যেভাবে জার্মান নাৎসিদের বিচার করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-অপরাধ আদালতে। আজও নাৎসিদের খুঁজে বেড়ানো হয় বিচার করার জন্য।

বৃহত্তর বাংলায় যে হলোকাস্ট চালিয়েছিল ব্রিটিশ দখলদাররা সে জন্য কি ব্রিটেনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা কি উচিত নয়? বাঙ্গালী জাতির যদি মান-সম্মানবোধ বলে কিছু থেকে থাকে তাহলে ৪২-৪৩ সনে ক্ষমতায় থাকা চার্চিল ও তার আগে ক্ষমতায় থাকা ব্রিটিশদের সব অপরাধের  ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য তাদের সক্রিয় হতে হবে। সাদা চামড়ার ইহুদিদের হত্যার জন্য যদি জার্মান নাৎসিদের বিচার হতে পারে তাহলে কালো চামড়ার বাঙ্গালীদের ওপর গণহত্যার বিষয়টি কি তাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না? এ নিয়ে কেনো আজও একটি স্মৃতি-স্তম্ভও গড়া হয়নি?

দেশে দেশে সুপরিকল্পিত নানা গণহত্যার হোতা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন, আমেরিকা, ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং তাদের সহযোগী শক্তিগুলো ও তাদের সেবাদাস সরকার আর অন্ধ অনুসারীদের ধিক্কার দিয়ে আজ বলা উচিত:

এ কোন্ সভ্যতা  আজ মানুষের চরম সত্তাকে করে পরিহাস?

কোন্ ইবলিস আজ মানুষেরে ফেলি মৃত্যুপাকে করে পরিহাস?

… জড়পিণ্ড হে নিঃস্ব সভ্যতা!

তুমি কার দাস?

অথবা তোমারি দাস কোন্ পশুদল!

মানুষের কী নিকৃষ্ট স্তর!

যার অত্যাচারে আজ প্রশান্তি; মাটির ঘর: জীবন্ত কবর

মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে ধরণীর ‘পর।…..

তাহাদেরি শোষণের ত্রাস

করিয়াছে গ্রাস

প্রশান্তির ঘর,

যেথা মুখ গুঁজে আছে শীর্ণ ধরণীর ‘পর ।

হে জড় সভ্যতা!

মৃত-সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ!

মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ;

তারপর আসিলে সময়

 বিশ্বময়

তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিণ্ডে পদাঘাত হানি’

নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বারপ্রান্তে টানি’;

আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের  অভিশাপ বও:

ধ্বংস হও

তুমি ধ্বংস হও।।

[ তথ্যসূত্র: ‘নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’-এ প্রকাশিত ‘ভারতের ভুলে যাওয়া গণহত্যা’, ১১৭৬ সালের মনন্তর (উইকিপিডিয়া) ও Anil Chawla’র লেখা ‘THE GREAT HOLOCAUST OF BENGAL’ ]

মু. আমির হোসেন

প্রতীক বরাদ্দের আগেই গালিমপুরে ঝুলছে পোস্টার!

নবাবগঞ্জের ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন আগামী ৭মে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার শেষ হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী ১৯ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দের তারিখ নির্ধারণ করা আছে। তবে ১৮ তারিখ রাতেই প্রতীক ব্যবহার করে পোস্টারে প্রচারণা শুরু করেছেন গালিমপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজিজুর রহমান ভূইয়া। এমনি অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ইউনিয়নটির জয়নগর, আন্ধারকোঠা-আগলা ব্রীজের ঢাল, নোয়াদ্দা, গালিমপুর আফা শাহ্’র মাঝার সংলগ্ন দেলোয়ারের চায়ের দোকান, বিপরীত দিকের একটি মোবাইল রিচার্জ দোকান, গালিমপুর রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ইছামতি কলেজ ফটকের সামনে রশিতে ঝুলিয়ে নৌকা মার্কার পোস্টার লাগানো রয়েছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এর কোনটি রাতে আবার কোনটি ভোরের দিকে লাগানো রয়েছে।

চায়ের দোকানী দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত রাত থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত দোকানে মা ছিল। মনে হয় ভোরের দিকে লাগানো হয়েছে।

এবিষয়ে গালিমপুর ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের প্রার্থী আজিজুর রহমান ভূইয়া বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আজতো প্রতিক বরাদ্দ তাই পোস্টার লাগানো হতে পারে। তারপরও আমি বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শেখ হাবিবুর রহমান বলেন, প্রতীক বরাদ্দের আগে পোস্টার ব্যবহার নির্বাচন আচরণ বিধি লঙ্ঘন। বিষয়টিতে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ইছামতি নদী

ইছামতি নদীর পানি দিন-দিন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এ নদীর মূল উৎস পদ্মা থেকে। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার সৈয়দপুর থেকে নদীটি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে মানিকগঞ্জ থেকে আগত কালিগঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এক সময় গোয়ালন্দ থেকে রাজধানীতে বড়-বড় লঞ্চ চলাচল করত, এখন সেখানে নৌকাও ঠিকমতো চলাচল করতে পারছেনা।

কিছু-কিছু এলাকায় নদীতে একদম পানি নেই আবার কিছু-কিছু এলাকায় হাঁটুপানি থাকলেও কচুরিপানায় ঢেকে আছে। কচুরিপানার পচনে সৃষ্টি হচ্ছে দূর্গন্ধ। এতে বেশ কিছু স্থানে মশার বসতি। ইছামতি নদীর ওপর কার্তিকপুর এলাকায় রাস্তা নির্মাণ করায় লঞ্চ চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। কালিয়াখালি এলাকায় বেড়িবাঁধ দেয়ায় ওই পথেও ইছামতি নদীতে পানি আসা বন্ধ।

এ নদীর তীরে কমপক্ষে চার লাখ লোকের বসবাস। তাদের বেশির ভাগই কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন। এলাকার বেশির ভাগ হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, উপজেলার নির্বাহী কার্যালয়, অন্যান্য অফিস এমনকি হাসপাতালও নদীর তীরে। রাজধানী থেকে প্রত্যহ যাবতীয় মালামাল এমনকি নির্মাণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নৌকায় বান্দুরা পর্যন্ত আসে। জোয়ার-ভাটায় নদীর পানি অত্যাধিক পরিস্কার ও স্বচ্ছ থাকে কিন্তু ভাটার সময় মালামাল বোঝাই নৌকা স্থানে-স্থানে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকে পানি স্বল্পতা কারনে।

এতে শুকিয়ে গেছে কাশিয়াখালী থেকে শিকারীপাড়া বারুয়াখালী বান্দুরা পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদীপথ। সমস্যায় পড়েছে স্থানীয় ৫ হাজার জেলে পরিবারের প্রায় ২৫ হাজার সদস্য। সে সঙ্গে বেকার হয়ে পড়েছে নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজারও পেশার মানুষ। আর এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বাসিন্দারা। বিশেষ করে নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার প্রায় ৫ লক্ষাধিক বাসিন্দাদের পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।

ইছামতি বাঁচাও আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট সাবেক মেজর সুধীর সাহা বলেন, ইছামতি ও পদ্মার সংযোগস্থল কাশিয়াখালী বাঁধের মূল নদীতে স্লুইস গেট না থাকায়ই আজ ইছামতি নদীর এ দুরবস্থা। ইছামতির এ দুরবস্থা নিরসনের জন্য প্রয়োজন মূল নদীতে একটি স্লুইস গেট নির্মাণ। তা নাহলে মৃতপ্রায় ইছামতি চলে যাবে প্রভাবশালী মহলের দখলে। ইতিমধ্যে অনেক স্থানে নদীর অংশ বিশেষ দখল হয়ে গেছে। নদীর এ দুরবস্থা নিরসনে নৌ পরিবহনমন্ত্রী মো. শাজাহান খান মানবজমিনকে বলেন, নবাবগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি ও কালিগঙ্গা নদীর নাব্য সংকট নিরসনে শিগগিরই ড্রেজিং করা হবে। সেই সঙ্গে সংযোগস্থল কাশিয়াখালী বাঁধে স্থাপন করা হবে একটি স্লুইস গেট।

সরজমিন ইছামতি নদীর তীর ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা জেলার অন্যতম বৃহত্তম কোঠাবাড়ীর বিলে আজ পানির অভাবে ধান চাষ করতে পারছেন না কৃষক। এক সময় এই বিলেই চাষ হতো লাখ লাখ হেক্টর ইরি-বোরো। বিলের উৎপাদিত ধানই নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলাবাসীর চালের চাহিদা মেটাতো। অপরদিকে বর্ষা মওসুমে জেলেরা এ বিলের পানিতে রাত-দিন মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকতো। আর সেই মাছ বিক্রি করেই সংসার চলতো জেলে পরিবারগুলোর। এখানে পাওয়া যেত দেশীর প্রজাতির হরেক রকম সুস্বাদু মাছ। কিন্তু এখন মাছ পাওয়াতো দূরের কথা দেখা দিয়েছে পানির চরম অভাব।

পানির অভাবে নৌপথ বন্ধসূত্র জানায়, চিরচেনা সদরঘাট থেকে কলাকোপা বান্দুরা লঞ্চ অতিপরিচিত একটি নাম। উপজেলা হিসেবে নবাবগঞ্জকে বাংলাদেশের অনেক মানুষ না চিনলেও কলাকোপা বান্দুরাকে চিনতো সবাই। চেনার অন্যতম কারণ ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মাসব্যাপী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। ভাদ্র মাসের ১ তারিখে খানেপুর-তুইতাল এলাকায় ইছামতি নদীতে শুরু হতো নৌকাবাইচ। এভাবে ভাদ্র মাসজুড়েই চলতো নৌকাবাইচ। নবাবগঞ্জ উপজেলা নৌকাবাইচের সমন্বয়ক মো. মাসুদ মোল্লা বলেন, ভাদ্র মাস এলেই নৌকা বাইচের নেশায় ঘুম আসতো না।

পুরো মাসের রাত-দিন ইছামতি নদীর সঙ্গে কাটতো। কিন্তু আজ সেই স্বপ্নের ইছামতি পানি স্বল্পতায় আমার সে নেশা পণ্ড হয়ে গেছে। আজ আর বর্ষা মওসুমে বাইচাদের (মাঝি) বাঁশির শব্দ শোনা যায় না। নদীতে এখন আর নৌকা চলে না, দুই পাড়ের মানুষ এখন হেঁটেই পার হয় নদী। জেগে উঠা নদীর বিভিন্ন স্থানে আবাদ হচ্ছে ধান, কেউবা আবার মাঝ নদী জাল আটকে চাষ করছে মাছ। কোথাও আবার জমে থাকা কচুরিপানায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে পানি।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত প্রায় দেড় যুগ ধরে বর্ষা মওসুমে পদ্মার পানি প্রবেশ করতে না পারায় স্রোতের প্রবাহ নেই। বন্ধ হয়ে গেছে ইছামতির সঙ্গে পদ্মার সংযোগ। ফলে শুকিয়ে গেছে নদী। চৈত্র মাস আর শ্রাবণ মাসের যেন কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। বন্ধ হওয়া পয়েন্টগুলো হলো সাদাপুর খাল, আড়িয়ল বিলের গোবিন্দপুর খাল, কার্তিকপুর বেড়িবাঁধ ও কাশিয়াখালী বাঁধ এলাকা। এসব স্থানে পদ্মার সঙ্গে সংযোগ ক্যানেলগুলো ভরাট হওয়ায় ইছামতি আজ মরা নদীতে পরিণত হয়েছে।

আশির দশকজুড়েই এ অঞ্চলের মানুষের ঢাকা যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল লঞ্চ। ইছামতিজুড়েই যেন কচুরিপানার দখল। ইছামতির সঙ্গে পদ্মা নদীর সব সংযোগ খাল ভরাট ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে ইছামতিকে সচল করতে এলাকার কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাবি-দাওয়া থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মাথাব্যথা নেই। আর সাবেক গণপরিষদ সদস্য সুবিদ আলী টিপু জানান, ১৯৭২ সালে ইছামতিকে সচল করতে কোমরগঞ্জ থেকে মরিচা পর্যন্ত ড্রেজিং করে ১০ কি. মি. খনন করা হয়। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন সরকারের শাসন আমলে ঢাকা-১ দোহারের সংসদ সদস্য ও নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন নুরুল হক ইছামতি নদীর নাব্যতা ফিরে আনতে ড্রেজিং করেন।

বিগত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দোহার-নবাবগঞ্জ এবং হরিরামপুর উপজেলাকে পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য দোহারের অরঙ্গাবাদ থেকে মানিকগঞ্জের হাটিপাড়া বংখুরী পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

ইছামতির সঙ্গে পদ্মার সংযোগস্থলগুলোতে স্লুইস গেট নির্মাণ না করায় ইছামতি নদী খরস্রোত হারিয়ে নাব্যতার সংকট সৃষ্টি হয়। ফলে শুকনা মওসুমে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার সৈয়দপুর হতে মানিকগঞ্জের কাশিয়াখালী পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কি. মি. জলপথে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পণ্যসামগ্রী, কাঁচামাল, বাড়িঘর নির্মাণ সামগ্রী নৌপথে স্বল্প খরচে আনা-নেয়া করতে পারছে না। এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। ইছামতি নদী পথে সৈয়দপুর, মরিচা, ভাঙাভিটা, হরিস্কুল, কলাকোপা পোদ্দারবাজার, ধাপারী, গোল্লা, বান্দুরা, খানেপুর, আলালপুর, দাউদপুর, বারুয়াখালী ও শিকারীপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে নদীর পানি শুকিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দাউদপুরের মৎস্যজীবী সুকুমার হালদার বলেন, ইছামতি মরে যাওয়ায় আজ অনেকে বাপ-দাদার পেশা ফেলে বিভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে।

ধাপারী বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, নদীপথে কম খরচে বেশি মালামাল আনা-নেয়া যায়। বর্তমানে সড়কপথে মালামাল পরিবহন করতে ট্রাফিক, মাস্তানদের চাঁদা প্রদানসহ নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। নদীতে ড্রেজিং করা হলে এলাকাবাসী স্বল্প খরচে নৌযানে মালামাল বহন করতে পারবে। বারুয়াখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, নদী মরে যাওয়ায় এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের, কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাই দ্রুত নদীটি খননের দাবি জানান তিনি। একইভাবে শিকারীপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধ এলাকায় স্লুইস গেট নির্মাণসহ জরুরি ভিত্তিতে নদীটি খনন করে সারা বছর নৌ চলাচলের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য নিরাপদ মাধ্যম হচ্ছে নদীপথ। কিন্তু পানি না থাকায় আজ বন্দ হয়ে গেছে নদীপথ। এতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে এলাকার পরিবেশ।

ইতিহাসের আলোকে মুজিব নগর সরকার

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার বা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ই এপ্রিল তারিখে। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল এই সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৬এ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশের জনগণের প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মুক্তিবাহিনী সংগঠন ও সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় এবং এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী রাষ্ট্র ভারতের সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক রক্ষায় এই সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এই সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ প্রবল যুদ্ধে রূপ নেয় এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিজয় অর্জন ত্বরান্বিত হয়।

পেছনের কথা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট সংঘটিত হবার সময় যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে পাকিস্তানী বাহিনী গ্রেফতার করে তার আগ মুহূর্তে ২৫ মার্চ দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ইপিআর এর একটি ছোট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।এরপর ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র হতে মেজর জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ হতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। মূলত সেই দিন হতেই বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

এদিকে ২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে যান। এসময়েই তিনি বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন। প্রথমে আত্মরক্ষা তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পালটা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন। এরই মধ্যে ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ফরিদপুর-কুষ্টিয়া পথে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে পৌছান। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার বিষয়ে মেহেরপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী তাদের সার্বিক সহায়তা করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। গোলক মজুমদারের কাছে সংবাদ পেয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কেএফ রুস্তামজী তাদের আশ্রয়স্থলে এবং তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন এবং পূর্ববাংলা সার্বিক পরিস্থিতি এবং বাঙালির স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পৃহা সম্পর্কে সম্যক অবগত হন। সীমান্তে পৌছে তাজউদ্দীন দেখেন যে বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারত সরকার থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছুই করার নেই। মুক্তিফৌজ গঠনের ব্যপারে তাজউদ্দীন আহমদ বিএসএফ এর সাহায্য চাইলে তৎকালীন বিএসএফ প্রধান তাকে বলেন যে মুক্তিসেনাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র প্রদান সময় সাপেক্ষ কাজ । তিনি আরো বলেন যে ট্রেনিংয়ের বিষয়ে তখন পর্যন্ত ভারত সরকারের কোন নির্দেশ না থাকায় তিনি মুক্তিবাহিনীকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে পারবেন না। কেএফ রুস্তামজী দিল্লির ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে দিল্লি যাওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তাজউদ্দীন আহমদের বৈঠক। দিল্লিতে পৌছানোর পর ভারত সরকার বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হন যে, তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের কয়েক দফা বৈঠক হয় এবং তিনি তাদের বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার জন্য যেসব সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন তা বুঝিয়ে বলেন। এসময় তিনি উপলব্ধি করেন যে আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে তিনি যদি সাক্ষাৎ করেন তবে সামান্য সহানুভূতি ও সমবেদনা ছাড়া তেমন কিছু আশা করা যায় না। সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐ সরকারের দৃঢ় সমর্থন ছাড়া বিশ্বের কোন দেশই বাংলাদেশের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে না। এছাড়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের আগের দিন এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চান যে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কোনো সরকার গঠিত হয়েছে কিনা। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে নিজেকে তুলে ধরবেন। কারণ এতে ‘পূর্ব বাংলার জনগণের সংগ্রামকে সাহায্য করার জন্য ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্টে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়’ তা কার্যকর রূপ লাভ করতে পারে বলে তাজউদ্দীনের ধারনা হয়। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দীন জানান যে পাকিস্তানী আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সকল প্রবীণ সহকর্মীই মন্ত্রীসভার সদস্য। শেখ মুজিবের গ্রেফতার ছাড়া তখন পর্যন্ত দলের অন্যান্য প্রবীণ নেতাকর্মীর খবর অজানা থাকায় সমাবেত দলীয় প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শক্রমে দিল্লীর উক্ত সভায় তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরেন। ঐ বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে। এভাবেই অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ধারনার সূচনা।

আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠন

ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক শেষে তিনি বাংলাদেশকে সর্বপ্রকার সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলে তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ(M.N.A) এবং এমপিএ(M.P.A)দের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশন আহ্বান করেন।

১৯৭১ সালের ১৭ ই এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান উক্ত অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়।

এই মন্ত্রিপরিষদ এবং এমএনএ ও এমপিএ-গণ ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী,ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী,খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়। ১১ এপ্রিল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারে মন্ত্রিপরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়ে ভাষণ প্রদান করেন।

১৯৭১ সালের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবৃন্দ

এরপর ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ পূর্ব ঘোষনা মোতাবেক কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে বৈদ্যনাথ তলার এক আমবাগানে মন্ত্রিপরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সকাল ৯ টা থেকেই সেখানে নেতৃবৃন্দ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের আগমন শুরু হয়। দেশি বিদেশি প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয় ।কোরআন তেলাওয়াত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এবং শুরুতেই বাংলাদেশকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ রূপে ঘোষণা করা হয়। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি একে একে প্রধানমন্ত্রী ও তার তিন সহকর্মীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর নতুন রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে কর্নেল এম এ জি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম ঘোষণা করেন। এরপর সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। এই ঘোষণাপত্র এর আগেও ১০ এপ্রিল প্রচার করা হয় এবং এর কার্যকারিতা ঘোষণা করা হয় ২৬ই মার্চ ১৯৭১ থেকে। ঐদিন থেকে ঐ স্থানের নাম দেয়া হয় মুজিবনগর। ঐ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই বক্তব্য পেশ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন।

বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম, বিশ্বের আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোন জাতি আমাদের চাইতে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি। অধিকতর ত্যাগ স্বীকার করেনি। জয়বাংলা।

অর্থাৎ এর মধ্যদিয়েই প্রধানমন্ত্রী দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানালেন আর এভাবেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সূচনা হল।

অস্থায়ী সরকারের গঠন

রাষ্ট্রপতি- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী)

উপরাষ্ট্রপতি- সৈয়দ নজরুল ইসলাম (রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন)

প্রধানমন্ত্রী- তাজউদ্দীন আহমদ

পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ক্রমশ শত্রু মুক্ত হতে থাকে। এর সাথে সাথে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে থাকে। তাই সরকার পরিস্থিতির উন্নতি সাধনের জন্য ১০ ডিসেম্বর একটি সিদ্ধান্ত নেন এবং তা বেতারে প্রচার করেন। ১৩ ডিসেম্বর হতে বেতারে পাকিস্তানী বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য বার বার আহবান জানানো হতে থাকে। পাকিস্তানী বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সকালে আত্মসমর্পণ করার ঘোষণা দেয়। ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটকে আত্মসমর্পণের সময় হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। তখন সরকারের পক্ষ হতে দুটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমত,আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে থাকবেন প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী (কিন্তু তিনি তখন প্রধান কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় এবং তার সাথে তাৎক্ষনিক যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় তার পরিবর্তে ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে বাংলাদেশের পক্ষ হতে প্রতিনিধি হিসাবে পাঠানো হয়)। দ্বিতীয়ত, আত্মসমর্পণের পর যত দ্রুত সম্ভব সরকারের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তির পর সরকারি কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে দেশে ফিরতে থাকেন।

দোহারে নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিদায় জানাল উপজেলা প্রশাসন

ঢাকার দোহারে বিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল করিম ভূইয়াকে বিদায় সংবর্ধনা দিল দোহার উপজেলা পরিষদ।রবিবার দুপুর ২ টা ৩০ মিনিটে দোহার উপজেলা সভা কক্ষে এক বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করে দোহার উপজেলা পরিষদ।দোহার উপজেলা চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনের সভাপতিত্বে উক্ত সভায়  উপস্থিত ছিলেন দোহার উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাসুদ পারভেজ,সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শামীমা রাহিম শিলা,দোহার থানা অফিসার ইনচার্জ সিরাজুল ইসলাম শেখ,উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার জসিম উদ্দিন,নয়াবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামীম আহাম্মেদ হান্নান,বিলাশপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মোল্লা,কুসুমহাটী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব দোহারী,উপজেলার সকল বিভাগের কর্মকর্তা এবংকর্মচারীবৃন্দ এবং দোহার প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকবৃন্দ।

দোহারে নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিদায় জানাল উপজেলা প্রশাসন

এসময় বক্তারা বলেন,’’আমাদের ইউ এন ও মহোদয় অনেক ভাল একজন মানুষ।তিনি দোহারে আসার পর থেকে নানা ভাবে আমাদের দোহারের উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন।তিনি চেষ্টা করেছেন দোহারকে সারা বাংলাদেশের মধ্যে মাদক এবং সন্ত্রাসমুক্ত একটি মডেল উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।সরকারি নিয়মনুযায়ী তিনি বদলি হচ্ছেন ঠিকই কিন্তু তার কাজের জন্য দোহারবাসী তাকে আজীবন মনে রাখবে ’’।

বিদায়ী অতিথির বক্ত্যবে নূরুল করিম ভুঁইয়া বলেন,’’আজ থেকে ২ বছর ১ মাস ১৫ দিন আগে আমি এই উপজেলায় এসেছিলাম দোহারের দায়িত্ব নিয়ে।আজ চলে যাচ্ছি তবে দোহার বাসীর কথা আমি সারা জীবন মনে রাখবো । এখানকার মানুষের অনেক ভালবাসা পেয়েছি আমি,পেয়েছি অনেক দোয়া,যা পরর্বতীতে আমার কাজে লাগবে।এই দুই বছরে আমি  সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি দোহারের উন্নয়ন করার জন্য।আমার কোন আচরনে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন।আমি আশা করি পরবর্তী ইউএনও মহোদয়ও দোহারের উন্নয়নে নিষ্ঠার সাথে কাজ করবেন।’’

দোহারে নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিদায় জানাল উপজেলা প্রশাসন

পরে বিদায়ী ইউ এন ও কে ফুলের তোড়া এবং মেডেল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান নব নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা।

ডিএনএসএমের কামরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের অগ্রনী ব্যাংক শাখার সদস্য নির্বাচিত

দোহার-নবাবগঞ্জ সোশ্যাল মুভমেন্টের সাধারন সম্পাদক কামরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের অগ্রনী ব্যাংক শাখার কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি অগ্রনী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় বর্তমানে র্কমরত আছেন। ১১ সদস্যের এই আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক হিসাবে আছেন মো: মামুনর রশীদ ও যুগ্ম আহ্বায়ক হিসাবে আছেন ফজলে কায়সার ও তরিকুল ইসলাম। কমিটির সদস্য সচিব হিসাবে আছেন মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল।

ভূমিকম্পের কারণ জানাল মার্কিন ভূতত্ত্ব জরিপ

বুধবার রাতে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। এতে অন্তত ১০টি ভবন হেলে পড়েছে। মার্কিন ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণ জরিপের (ইউএসজিএস) মতে মায়ানমারের মাওলাইক ছিল এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র, রিখটার  স্কেলে যেখানে এর মাত্রা ছিল ৬.৯। বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।

ইউএসজিএসের মতে, ভারতীয় এবং ইউরেশীয় প্লেটের ঠোকাঠুকির ফলে গতকালের ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এমনিতে দুইটি প্লেট পরস্পরের দিকে বছরে ৪০-৫০ মিলিমিটার করে এগিয়ে আসছে। ভারতীয় প্লেটটি এ ক্ষেত্রে ইউরেশিয় প্লেটের তলার ঢুকে যাওয়ার সময়ে এই কম্পন অনুভূত হয়।

হিমালয়ের পাদদেশে থাকা এই অঞ্চলটি বরাবরই ভূমিকম্পপ্রবণ। বেশ কয়কটি বড়সড় ভূমিকম্প এই অঞ্চলে হয়ে গিয়েছে। ১৯৩৮ সালে বিহার, ১৯০৫ সালে কাংরা, ২০০৫ সালে কাশ্মীরের ভূমিকম্প, ২০১৫ সালে নেপালের ভূমিকম্প, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পটি হয় আসামে ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট।