হারিয়ে গেছে দোহারের মসলিন, বাঁচানো যাচ্ছে না তাঁতশিল্প

প্রকাশ:

শেয়ার করুন:

হারিয়ে গেছে দোহারের মসলিন, বাঁচানো যাচ্ছে না তাঁতশিল্প । উঠে গেছে পুরনো সব তাঁতপল্লী। কারিগরদেরও এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বিদেশমুখী প্রবণতা আর হাতে বুনা তাঁতের প্রতি অনীহার কারণে ঘরে ঘরে গড়ে ওঠা তাঁত কারখানাগুলোও এখন আর নেই।

স্থানীয়দের অনেকেই জানে না যে, একটি সময় ছিল যখন দোহার-নবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকা সঙ্করদিয়া ও মালিকান্দা এলাকায় তৈরী মসলিন শাড়ি-কাপড় পৌঁছতে পেরেছিল ব্রিটিশ রাজদরবার পর্যন্ত। রাজপরিবারের নারীদের কাছে এ কাপড়ের বিশেষ কদর ছিল। প্রায় তিন শ’ বছর আগে গোড়া এ শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল দোহারে। সেই সময় গোয়ালন্দ ইস্টিমারঘাট হয়ে ভারতীয় পাইকাররা সরাসরি চলে আসতেন দোহারের মসলিন, চাদর ও ধুতির লোভে। মিহি সুতার কারুকাজ হওয়ায় ভারতবর্ষেও এর দারুণ কদর ছিল।

সেই মসলিনের কারিগরও নেই, মসলিনও নেই; কিন্তু এখনো ধুঁকে ধুঁকে টিকে আসে লুঙ্গি ও গামছাশিল্প। অনুসন্ধানে জানা যায়, দোহার থেকে এখনো প্রচুর হাতে বোনা লুঙ্গি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় রফতানি হয়। এখানে সাধারণ ব্যবহার্য লুঙ্গির পাশাপাশি অতি উন্নতমানের সৌখিন লুঙ্গি তৈরি হয়। হাতে বুনানো হওয়ায় এর বিশেষ কদর রয়েছে। জানা গেছে, কোনো কোনো কারিগর ৪ শ’ টাকা থেকে শুরু করে ৪ হাজার টাকা দামের লুঙ্গিও তৈরি করে থাকেন। বিশেষত পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাদা রঙের লুঙ্গির প্রধান চালান আসে এখান থেকে। দেশের বিভিন্ন এলাকার নামিদামী ব্র্যান্ডের লুঙ্গিও এখান থেকে নিয়ে বাজারে সরবরাহ করা হয়।

জানা গেছে, দোহারে স্থানীয়দের চেয়ে বহিরাগতরাই এসব তাঁত চালিয়ে থাকেন। বিশেষ করে কুমিল্লা, পাবনা সহ উত্তর বঙ্গের তাঁতীরা বুননের কাজ করেন। তবে তাঁত কমে যাওয়ায় তাদের এখন তেমন দেখা যায় না।  গত কয়েক বছরে স্থানীয়রা বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি যান্ত্রিক তাঁতকল বসানোয় শ্রমিকেরা সেই দিকে ঝুঁকেছেন। কেননা এসব কারখানায় কম পরিশ্রমে অধিক উপার্জন হয়।

ধীরে ধীরে হস্তচালিত তাঁতগুলো বন্ধ হতে বসেছে। এসব ক্ষুদ্র শিল্পমালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে নানা সমস্যার কথা। তারা জানান, সরকারের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তারা এ ব্যবসায় ছেড়ে দিচ্ছেন। কেননা কারিগরের স্বল্পতা, অধিক মজুরি, সুতা ও রঙের উচ্চমূল্য এবং দুষ্প্রাপ্যতা ইত্যাদি কারণে তারা তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক কারিগরই ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁত মালিকদের অভিযোগ নির্বাচন এলে রাজনৈতিক নেতারা তাদের কাছে ভোটের জন্য আসেন; কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁতশিল্পের উন্নয়নে তারা আর এগিয়ে আসেন না। দোহার তাঁত বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখনো এখানে ১৫ হাজার তাঁতি পরিবার রয়েছে; কিন্তু তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে জয়পাড়া এলাকার প্রান্তিক তাঁতি মো: সোহেল বলেন, বর্তমানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিরাজগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে মেশিনে তৈরি লুঙ্গি ক্রয় করে তাতে স্টিকার লাগিয়ে দোহারের লুঙ্গি বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এতে এক দিকে যেমন ক্রেতারা ঠকছেন, অন্য দিকে সুনাম হারাচ্ছে দোহারের লুঙ্গির। মালিকান্দা গ্রামের আরিফ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েক বছর আগেও সপ্তাহে দুই দিন তাঁতিদের উৎপাদিত লুঙ্গির জমজমাট হাট বসত জয়পাড়া ও শিবরামপুরে। এখন আর হাটগুলোয় আগের মতো ক্রেতাসমাগম হয় না। এ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থাসহ সুতা ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম কমাতে হবে। লক্ষ্মীপ্রাসাদ এলাকার শতবর্ষী তাঁতি ফালু বেপারী অভিযোগে করে বলেন, আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে দোহারের তাঁতির মসলিন কাপড় বুনতেন। দেশ স্বাধীনের পর থেকে তাঁতি সম্প্রদায়ের লোকজন এ পেশা ছেড়ে দিয়ে বিদেশমুখী হওয়ায় ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এ শিল্পটি।

এ দিকে তাঁতিদের স্বার্থ সংরক্ষণে ১৯৪৭ সালে দোহার-নবাবগঞ্জ উইভার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি নামে একটি সমবায় গঠন করা হয়। তাঁতিদের শ্রম আর ঘামে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কোটি কোটি টাকা সম্পদ করা হলেও তাঁতিদের ভাগ্য উন্নয়নে এর অবদান সামান্যই। এমনটিই অভিযোগ সাধারণ তাঁতিদের। এ প্রসঙ্গে দোহার নবাবগঞ্জ উইভার্স সমবায় সোসাইটির সভাপতি জসিমউদ্দিন বলেন, বিগত দিনগুলোয় যারা এই সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কিছুই করেননি। আমরা সবার সাথে আলাপ-আলোচনা করে আগামীতে তাঁতশিল্পের উন্নয়নের কিছু একটা করার উদ্যোগ নেব। তবে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুন বিনিয়োগ না এলে এ শিল্প ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না।

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ সংবাদ

এই রকম আরও

উপজেলায় প্রথম, এবার জেলা পর্যায়ে বেগম আয়েশা পাইলট

নিজস্ব প্রতিবেদক: “মেধা, বিজ্ঞান, উদ্যোগ ও উদ্ভাবনের দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” শীর্ষক স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন শোকেসিং...

দোহারে জনগণকে গ্রাম আদালত সম্পর্কে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে

আল আমিন: দোহারে গ্রাম আদালত সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি...

দোহারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে তিন ফার্মেসিকে জরিমানা

মো সোহেল: দোহার (ঢাকা) প্রতিনিধি: দোহারে ওষুধ ও কসমেটিকস আইন অমান্য করার দায়ে ৩টি ফার্মেসিকে মোট ১৩ হাজার...

রাশিয়া যুদ্ধে নিহত নবাবগঞ্জের সাঈদ মোল্লা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামের সাঈদ মোল্লা (৩৫)। তিনি ১৬ লাখ টাকা...