মোঃআল-আমিন,দোহার: স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা আর প্রবাসজীবনের দুর্ঘটনা—একের পর এক দুঃসহ অভিজ্ঞতায় জীবন যেন থমকে গিয়েছিল আনোয়ারা বেগমের। তবে হতাশার সেই অন্ধকার থেকে তাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
ঢাকার দোহার উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের চরকুসুমহাটি গ্রামের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম ২০২১ সালে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান। বিচ্ছেদের পর একমাত্র সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন নিয়েই ছিল তার এই বিদেশযাত্রা।
প্রথম প্রায় ৩০ মাস কর্মজীবন ভালোই চলছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের পবিত্র ঈদুল আজহার দিন এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। চিকিৎসক দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলেও নিয়োগকর্তা চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ছাড়াই শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাতে হয় তাকে।
পরিস্থিতির অবনতি হলে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই তিনি দেশে ফিরে আসেন। দোহার উপজেলা সদরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার করালেও ব্যথা কমেনি। অন্যদিকে ঋণের চাপ ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি।
আনোয়ারা বেগম বলেন, “আমি আর কষ্ট সহ্য করতে পারছিলাম না। মনে হতো, মরে গেলেই হয়তো সব কষ্ট শেষ হবে।”
এমন সময় তার বাড়ির কাছেই ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একটি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গিয়ে নিজের জীবনের সব কথা খুলে বলেন ব্র্যাকের কর্মসূচি সংগঠক রাবেয়া বসরির কাছে।
আনোয়ারার ভাষ্য, “আমি বিদেশে যাওয়ার গল্প, দুর্ঘটনা, অপারেশন, ঋণ আর ছেলের ভবিষ্যতের কথা বলি। রাবেয়া আপা আমার অবস্থা বুঝে বলেন, ‘ভয় পাবেন না, আমরা আছি।’ সেই কথাটাই আমাকে নতুন করে সাহস দিয়েছে।”
পরবর্তীতে ব্র্যাক তার তথ্য যাচাই-বাছাই করে সহায়তার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে। তাকে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, ওষুধ, কাপড়ের ব্যবসা শুরু করার জন্য পুঁজি এবং একটি ছাগল প্রদান করা হয়। এছাড়া তার প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের ব্যয়ও ব্র্যাক বহন করবে।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আনোয়ারা বলেন, “আজ আমি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি। আমার ছেলে পড়াশোনা করবে, বড় মানুষ হবে। আমি আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। ব্র্যাক আমার জীবনে আশার আলো হয়ে এসেছে।”
ব্র্যাকের ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. বজলুর রশিদ জানান, ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশফেরত কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক সহায়তা (সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং), উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ইন-কাইন্ড সহায়তা এবং চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ধরনের পুনর্বাসন সেবা দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈধ উপায়ে বিদেশগমন নিশ্চিত করতে নিয়মিত কাজ করছে ব্র্যাক।
তিনি আরও জানান, শুধু দোহার উপজেলাতেই এ পর্যন্ত ৪১ জন ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশফেরত কর্মীকে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এই কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
বিদেশফেরত অসহায় কর্মীদের জন্য ব্র্যাকের এই উদ্যোগ শুধু চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনে সমাজে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসিত করার একটি মানবিক প্রচেষ্টা। আনোয়ারা বেগমের জীবনসংগ্রাম ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
পায়ে আঘাত, মনে ভাঙন—ব্র্যাকের সহায়তায় নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছেন বিদেশফেরত আনোয়ারা
প্রকাশ:
শেয়ার করুন:
আপনার মতামত দিন
