আশিক শেখ, নবাবগঞ্জ, ঢাকা | অবশেষে প্রাণ ফিরতে যাচ্ছে এক সময়ের উজ্বল জলধারায় বয়ে চলা ইছামতী নদীতে। মংগলবারদীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠপর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শন করেছে। প্রায় দুই দশক ধরে কাশিয়াখালি বেড়িবাঁধের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে মুখ বন্ধ করে রাখা ইছামতী নদীর প্রবাহ এখন মুক্তির অপেক্ষায়। নানা প্রতিকূলতা ও প্রশাসনিক অবহেলার পর এবার যেন আশার আলো দেখছেন নদীপাড়ের মানুষ, কৃষক, সংগঠক ও পরিবেশকর্মীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নির্দেশে ইছামতী নদীর সোনাবাজু অংশ পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা বিভাগের দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী—ফরিদ উদ্দিন ও কালি কিংকর সাহা। পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সোনাবাজু বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি কার্যকর স্লুইচগেট স্থাপন করে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্যতা নিরূপণ।
পরিদর্শনের সময় স্থানীয়দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের নেতৃবৃন্দ, নদী বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীরা এবং ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন বলেন,“ইছামতী নদীর জলাবদ্ধতা দূর করতে স্লুইচগেট স্থাপনের বিকল্প নেই। আমরা সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখেছি এবং প্রাথমিকভাবে মনে করছি, এখানে একটি বা একাধিক স্লুইচগেট স্থাপন করে নদী ও কৃষিজমির স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
এক যুগেরও বেশি সময়ের দাবি:
এই স্লুইচগেট স্থাপনের দাবিটি নতুন নয়। দৈনিক মানবজমিনের আদালত প্রতিনিধি ও নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা জানান, “আমরা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ দাবি জানিয়ে আসছি। বিভিন্ন কর্মসূচি, স্মারকলিপি, মানববন্ধনের পর ২০১৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাজেট প্রস্তাব প্রেরণ করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা এখনও অনুমোদনের আলো দেখেনি।”
তবে সাম্প্রতিক এই সরকারি তৎপরতা আন্দোলনের ফল বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল যে কৃষিভিত্তিক জনজীবন, তা আজ প্রায় ধ্বংসের পথে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, খরা মৌসুমে চাষাবাদে পানির অভাব—এই দ্বৈত সমস্যায় ভুগছে কোঠাবাড়ি, চকসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা।
ইছামতী কেবল একটি নদী নয়—এটি একটি ঐতিহ্যের ধারক। এই নদী ঘিরে ছিল বর্ষাকালের নৌকা বাইচ, ঘাট সংস্কৃতি ও জলভিত্তিক জীবনের ছন্দ। স্লুইচগেট নির্মাণের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত হলে একদিকে যেমন কৃষি পুনর্জীবিত হবে, অন্যদিকে নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনাও জেগে উঠবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, খুব দ্রুত এ বিষয়ে একটি সুপারিশ প্রতিবেদন প্রণয়ন করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। স্থানীয় পরিবেশবাদী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রত্যাশা, এবার আর যেন প্রকল্পটি “ফাইলবন্দী স্বপ্ন” হয়ে না থাকে।
এই প্রসঙ্গে সেভ দ্য সোসাইটি ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক মোশতাক আহমেদ বলেন, “এই নদী আমাদের পরিবেশ, কৃষি ও সংস্কৃতির প্রাণ। দেরিতে হলেও প্রশাসন আমাদের কণ্ঠ শুনছে—এটাই বড় প্রাপ্তি।”
