তালের শাঁসের মায়াবী মধুবেলা: দোহারে গ্রীষ্মের গল্প

প্রকাশ:

শেয়ার করুন:

মাহমুদুল হাসান সুমন : রোদের উত্তাপে যখন জনজীবন হাঁসফাঁস, চারপাশের ধূসর ধুলোর স্তব্ধতায় মন যেন পুড়ে যায়, তখনই এক পশলা স্বস্তির মতো হাজির হয় তালের শাঁস। দোহার উপজেলার প্রতিটি বাজার, পথের মোড়, স্কুলের সামনের ফটক কিংবা গ্রামের প্রান্তের খেজুরতলা—যেদিকেই তাকানো যায়, চোখে পড়ে শীতল তালের শাঁসের সরব উপস্থিতি। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের কণ্ঠে যেন একই সুর, “একটা তাল শাঁস দেবেন, ভাই?”

গ্রীষ্মকালের এই উপহার শুধু একটি ফল নয়, বরং এক টুকরো নস্টালজিয়া, এক ছায়াময় আশ্বাস। তালগাছের ছায়ায় ছোটবেলার খেলাধুলা, ঠাকুরমার হাঁপ ধরা কণ্ঠে রূপকথার গল্প আর মাটির ঘরের চালে তালপাতার পাখার শোঁ শোঁ শব্দ—সব মিলিয়ে তাল যেন বাংলার মাটিতে এক বেঁচে থাকা স্মৃতি।

এই প্রাকৃতিক ফলটির বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer হলেও দোহারবাসীর কাছে এটি শুধুই “তাল”—ভালোবাসার নাম, জীবনযাপনের অংশ। এতে রয়েছে শতভাগ প্রাকৃতিক ঠান্ডক, পানি ও খনিজসমৃদ্ধ এই ফল শরীরে জোগায় স্নিগ্ধ প্রশান্তি, দূর করে ক্লান্তির গ্লানি। সামান্য শাঁসের নিচে যেন লুকিয়ে আছে বিশাল জীবনীশক্তি।

তাল বিক্রেতা সজীবের মুখে গ্রীষ্মের হাসি—“প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ টাকার বিক্রি করি। গরম যত বাড়ে, বিক্রি ততই চড়ে। শাঁস ঠান্ডা রাখার জন্য বরফ ব্যবহার করি, তবে চেষ্টা করি যেন প্রাকৃতিক স্বাদ নষ্ট না হয়।” তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই একটি ছোট্ট মেয়ে এসে বলল, “আম্মু বলে তিনটা শাঁস দিতে, যেন ভাইয়াও পায়।”

এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আবুল কাশেম নামের এক ক্রেতা জানান, “তাল এখন শুধু ফল নয়, একরকম আত্মবিশ্বাস। বাজারে যখন ফল থেকে শুরু করে সবজিতেও ফরমালিনের ভয়, তখন এই দেশি ফলটাই নিরাপদ ও তৃপ্তিদায়ক মনে হয়।”

তালগাছের জীবনচক্রও যেন এক অনন্য কাব্য। একবার জন্ম নিয়ে শতবর্ষ বেঁচে থাকা এই গাছটি যেন বাংলার প্রাচীনতার প্রতীক। শত ঝড়ঝাপটা উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের গায়ে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও অর্থনীতির গল্প। বজ্রপাত প্রতিরোধে সহায়ক এই গাছের কাঠ যেমন টেকসই, তেমনি এর পাতা দিয়ে তৈরি হাতপাখা এখনও অনেক গৃহস্থ বাড়ির শোভা।

দুঃখের কথা একটাই—এই গাছ ফল দিতে শুরু করে প্রায় বিশ বছর পর, আর এ দীর্ঘ অপেক্ষার ধৈর্য আমাদের গ্রামবাংলার অনেকেই আর রাখতে চান না। ফলে, সময়ের আগে কেটে ফেলা হয় সম্ভাবনাময় গাছগুলো। এতে হারিয়ে যাচ্ছে তাল, হারিয়ে যাচ্ছে তাল-ভিত্তিক গ্রামীণ সংস্কৃতিও।

তবু আশার কথা শোনা যায় স্থানীয় যুবকদের কণ্ঠে—“আমরা তালগাছ লাগাই, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই শাঁসের স্বাদ পায়, আর তালপাতার পাখায় গ্রীষ্মের গল্প বলে।”

তালের শাঁস তাই দোহারে এখন শুধুই পণ্য নয়—এ এক মৌসুমি উৎসব, স্মৃতি ও সংস্কৃতির এক তরল গল্প। গ্রীষ্মের অসহনীয় দিনগুলোতে এক কাপড় জড়ানো ঠান্ডা শাঁসের মধ্য দিয়ে বয়ে যায় বাংলার সহজ-সরল জীবন, বয়ে চলে অমলিন আবেগ।

এ যেন প্রকৃতির এক পরম উপহার—তালের শাঁসে জমে থাকা দোহারবাসীর গ্রীষ্মের মধুময় মায়া।

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ সংবাদ

এই রকম আরও

বান্দুরা থেকে সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী আটক

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার পুরাতন বান্দুরা পিত্তিতলা এলাকা থেকে তৌকির নামে এক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে স্থানীয় যুবসমাজ।...

জয়পাড়ায় দোকান থেকে কর্মচারীকে তুলে নিয়ে নির্যাতন, আটক ২

ঢাকার দোহারে এক দোকান কর্মচারীকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করার অভিযোগে দুই যুবককে আটক...

দোহার প্রেসক্লাব থেকে সাংবাদিক তানজিম ইসলামকে স্থায়ী বহিষ্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকার দোহার প্রেসক্লাবের সাধারণ সদস্যপদ থেকে সাংবাদিক তানজিম ইসলাম আহাদকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রেসক্লাবের...

মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শোল্লা ইউনিয়নের যুবসমাজের ‘রণহুঙ্কার’: ঐক্যবদ্ধ গ্রামবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক, নবাবগঞ্জ: ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার শোল্লা ইউনিয়নে মাদকের নীল দংশন আর সন্ত্রাসের রাজত্বের বিরুদ্ধে এবার রুখে দাঁড়িয়েছে...