টেকনাফ সীমান্তে নাফ নদের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। সেখানে গড়ে উঠেছে ইয়াবা তৈরির ছোট-বড় অনেক কারখানা।
সেখান থেকে বাংলাদেশে আসছে মাদকের চালান। এখানে নদের প্রস্থ প্রায় ৩ কিলোমিটার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, নাফ নদ পেরিয়ে আগে শুধু ইয়াবা এলেও এখন পাল্লা দিয়ে আইসের চালান আসা বাড়ছে।
কক্সবাজার-টেকনাফ সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায়ই লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে শত শত চোরাকারবারি। তবুও থামছে না পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তজুড়ে তারা ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করাচ্ছে। নাফ নদ, পাহাড়ি পথ, ছড়া, উপকূলীয় এলাকা, মাছ ধরার ট্রলার এবং দুর্গম সীমান্ত করিডোরকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটগুলো মাদকের চালান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে।
মাদক পাচারের ৬০ হটস্পট
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফে মাদক আনা হচ্ছে ৬০ পয়েন্ট দিয়ে। এর মধ্যে উখিয়ার নাফ নদ ও স্থলপথ সীমান্তে সাতটি, বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী আটটি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়ত মাদকের চালান ঢুকছে। টেকনাফের নাফ নদের পাশে ২৬টি এবং বঙ্গোপসাগর তীরের ১৯টি পয়েন্ট দিয়ে মাদক আনা হচ্ছে। এসব পয়েন্ট ছাড়াও নৌপথে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, বরিশালের কুয়াকাটা দিয়েও ইয়াবার চালান আনছে পাচারকারীরা।
উখিয়ায় মাদক পাচারের কিছু পয়েন্টের মধ্যে রয়েছে থাইংখালী, পালংখালী, বালুখালী, আমতলী, ডিগলিয়া, পাতাবাড়ি, বঙ্গোপসাগরের ইনানি, পাথুয়ার টেক, সোনার পাড়া ও রেজুখাল। টেকনাফের পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ, মিস্ত্রিপাড়া, নোয়াপাড়ার মগপাড়া, ঝিনাপাড়া স্লুইস গেট, সাইটপাড়া, আছারবনিয়া, সদর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া ও কায়ুকখালী ঘাট।
নৌপথ ও মেরিন ড্রাইভে সক্রিয় পাচার চক্র
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী, শাহপরীর দ্বীপের নৌঘাট এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে মাছ ধরার আড়ালে নানা কৌশলে মাদকের চালান সাগর ও নদীপথে দেশে প্রবেশ করছে। এ কাজে কিছু রোহিঙ্গা জেলে ও স্থানীয় জেলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
জব্দ হচ্ছে লাখ লাখ ইয়াবা, তবুও থামছে না পাচার
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে কক্সবাজার জেলায় মোট ৪৩ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ পিস ইয়াবা, ৫ দশমিক ২৫০ কেজি আইস, ৪০ দশমিক ৩ কেজি গাঁজা এবং ৬৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯৮ জনকে আটক করা হয়। জব্দ মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৪২ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার ৫০০ টাকা।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বিএন) সাব্বির আলম সুজন বলেন, “দেশের যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।”
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, “সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত মাদক প্রবেশ শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। যে ইয়াবা সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকছে, তা আগামীতে একটি পরিবার ধ্বংস করছে।”
বিজিবির কক্সবাজারের রামু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, সীমান্ত এলাকায় পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে ২০২৫ সালে মোট ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯২ হাজার ৯৯৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪৩১ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৯০০ টাকা। এ সময় মাদকসংশ্লিষ্ট ঘটনায় ৭৮৪ জনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসেই উদ্ধার করা হয়েছে আরও ১ কোটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫০৩ পিস ইয়াবা, যার আনুমানিক মূল্য ৩১৬ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার ৯০০ টাকা। একই সময়ে আটক হয়েছেন ৪৩৮ জন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, “প্রতিবার বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হওয়ার খবর আসে, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এই বিশাল চালানের মূল হোতারা কারা? তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মাদক নির্মূল করা কঠিন হবে।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, “কক্সবাজার সীমান্তকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের অপচেষ্টা দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় পাচারের চেষ্টাকালে প্রায় ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক নারী যাত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়।”
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, “মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক অধ্যুষিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু চিহ্নিত মাদক পাচারের গডফাদারকে আটক করা হয়েছে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
