কুরবানি মুসলিম উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এ ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করে। কুরবানির পশুর গোশতের পাশাপাশি এর চামড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত, যার ব্যবহারে ইসলামের রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। অনেকেই না জেনে কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করেন কিংবা কসাইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে দিয়ে দেন, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরবানির চামড়া ব্যবহার, বিক্রি ও এর অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে সুন্দর নির্দেশনা দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ
‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: আয়াত ৩৭)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়— কুরবানির প্রতিটি বিষয়ই ইবাদতের অংশ। তাই চামড়ার ব্যবহার ও এর অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ইসলামের বিধান মেনে চলা জরুরি।
কুরবানির চামড়ার ব্যবহার
কুরবানিকারী ব্যক্তি চাইলে নিজের কুরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারবেন। চামড়া দাবাগাত করে তা ঘরের কাজে ব্যবহার করাও জায়েজ। ইসলামে এ বিষয়ে কোনো বাধা নেই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
اِنْتَفِعُوا بِجُلُودِهَا وَلَا تَبِيعُوهَا
‘তোমরা কুরবানির পশুর চামড়া দ্বারা উপকৃত হও; তবে তা বিক্রি করে দিও না।’ (মুসনাদে আহমাদ)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, চামড়া ব্যবহার করা বৈধ এবং তা অপচয় না করে উপকারী কাজে লাগানো উত্তম।
কুরবানির চামড়া বিক্রির বিধান
কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করা জায়েজ। তবে চামড়া বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা কুরবানিদাতা নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করতে পারবেন না। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এ অর্থ গরিব-মিসকিন ও অভাবীদের মাঝে বিতরণ করতে হবে।
হজরত আলি (রা.) বর্ণনা করেন—
أَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ أَقُومَ عَلَى بُدْنِهِ وَأَنْ أَتَصَدَّقَ بِلُحُومِهَا وَجُلُودِهَا وَأَجِلَّتِهَا وَلَا أُعْطِيَ الْجَازِرَ مِنْهَا شَيْئًا
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আমি কুরবানির পশুর গোশত, চামড়া ও আচ্ছাদন সাদকা করি এবং কসাইকে এর কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে না দিই।’ (মুসলিম ১৩১৭, বুখারি)
এ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কুরবানির পশুর চামড়া বা গোশত দিয়ে কসাইয়ের মজুরি দেওয়া জায়েজ নয়।
চামড়ার বিক্রিত অর্থ কারা পাবে
যারা জাকাত ও ফিতরা পাওয়ার উপযুক্ত, তারাই কুরবানির চামড়ার মূল্য পাওয়ার হকদার। বিশেষ করে—
তালিবুল ইলম যদি ইয়াতিম বা অভাবগ্রস্ত হয়, তাহলে তাকে কুরবানির চামড়ার অর্থ প্রদান করা অধিক সাওয়াবের কাজ। কারণ দ্বীনি শিক্ষার সহায়তা করাও একটি বড় নেক আমল।
চামড়া ও গোশত দিয়ে কসাইয়ের মজুরি দেওয়া যাবে না
অনেকেই কসাইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে গোশত বা চামড়া দিয়ে থাকেন। অথচ হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কসাইয়ের মজুরি আলাদা অর্থ দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ ছিল—
وَلَا أُعْطِيَ الْجَازِرَ مِنْهَا شَيْئًا
‘কসাইকে যেন কুরবানির পশুর কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে না দেওয়া হয়।’ (মুসলিম ১৩১৭)
ইসলামের মূল শিক্ষা
কুরবানির মূল উদ্দেশ্য শুধু পশু জবেহ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই কুরবানির চামড়াও যেন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এর মাধ্যমে গরিব-দুঃখী মানুষের উপকার হয়— ইসলাম সে দিকনির্দেশনাই দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ
‘তোমরা কখনো পূর্ণ নেকি অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা নিজেদের প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় কর।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৯২)
কুরবানির পশুর চামড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এটি অপচয় করা কিংবা এর অর্থ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করা ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। বরং চামড়া নিজে ব্যবহার করা অথবা বিক্রি করে এর অর্থ গরিব, ইয়াতিম ও দ্বীনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করাই উত্তম আমল। কুরবানির প্রতিটি বিষয় যেন সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়— সেটিই একজন মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরবানির চামড়ার যথাযথ ব্যবহার ও এর হক আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
