ইসলামি দর্শনে ‘আহলে কিতাব’ (أهل الكتاب) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সম্মানজনক পরিভাষা। আরবি ‘আহল’ শব্দটির অর্থ অধিবাসী, অনুসারী বা সম্পর্কিত গোষ্ঠী এবং ‘কিতাব’ শব্দের অর্থ ঐশী গ্রন্থ বা আসমানি কিতাব। ফলে শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে ‘আহলে কিতাব’ বলতে সেই সব ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বোঝায়, যাদের ওপর মহান আল্লাহ তাআলা কোনো নবীর মাধ্যমে আসমানি কিতাব বা অহি নাজিল করেছিলেন। মূলত ইসলামপূর্ব আব্রাহামীয় বা ইব্রাহিমী ধর্মবিশ্বাসের ধারক-বাহকদের চিহ্নিত করতেই এই পরিভাষাটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
আহলে কিতাব কারা?
ইসলামি শরিয়তের অধিকাংশ মুফাসসির, ফকিহ ও আলেমদের (জুমহুর) মতে, আহলে কিতাব বলতে মূলত ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কেই বোঝায়।
এর মূল কারণ হলো, মহান আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের ওপর মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে ‘তাওরাত’ এবং খ্রিষ্টানদের ওপর ঈসা (আ.)-এর মাধ্যমে ‘ইঞ্জিল’ নাজিল করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে তাঁদের এই পূর্ব পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়ে একাধিক স্থানে সরাসরি “يَا أَهْلَ الْكِتَابِ” (হে আহলে কিতাবগণ!) বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
আহলে কিতাব সম্পর্কে ইসলামের বিধান
ইসলামে পৌত্তলিক বা মুশরিকদের তুলনায় আহলে কিতাবদের এক বিশেষ আইনি ও মর্যাদাভিত্তিক স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষায় ইসলাম সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করেছে:
(ক) জবাই করা খাদ্য গ্রহণ
শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, আহলে কিতাব (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) সম্প্রদায়ের লোকদের বৈধভাবে জবাই করা পশুর মাংস মুসলমানদের জন্য খাওয়া হালাল—যদি না তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দেব-দেবীর নামে উৎসর্গ বা জবাই করা হয়।
‘আজ তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হলো এবং যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল…’ (সুরা মায়িদা: ৫)
(খ) বৈবাহিক সম্পর্ক
ইসলাম কোনো মুসলিম পুরুষকে স্বধর্মে বহাল থাকা সত্ত্বেও কোনো আহলে কিতাব (ইহুদি বা খ্রিষ্টান) নারীকে বিয়ে করার স্পষ্ট অনুমতি দিয়েছে। তবে শর্ত থাকে যে, সেই বিবাহের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তানদের মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তবে কোনো মুসলিম নারী কোনো আহলে কিতাব বা অমুসলিম পুরুষকে বিয়ে করতে পারেন না, যতক্ষণ না সে ইসলাম গ্রহণ করে।
(গ) বিশ্বাস ও উৎসবের বিধান
যদিও বৈবাহিক ও খাদ্যের আদান-প্রদান হালাল করা হয়েছে, তবে মুসলিমরা ইহুদি বা খ্রিষ্টানদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে পারবেন না। এ ছাড়া তাঁদের যেসব আকিদা ও ঐতিহ্য ইসলামের তৌহিদ বা একশ্বেবরবাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক (যেমন: খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদ বা ইবনুল্লাহ বিশ্বাস), সেগুলো ইসলামে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। (সুরা মায়িদা: ৭২-৭৩)
