জীবন নাটকের আসল নায়ক-নায়িকা হচ্ছেন বাবা মা

683

হামিদুর রহমান ♦

মহান শ্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ। এ শাশ্বত সত্যের সাথে সকল ধর্মগ্রন্থই একমত। কেন না মানুষের কল্যাণের জন্যই ধর্ম! আর প্রত্যেক ধর্মের মূলবাণী সর্বপ্রকার শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সমাজ, সংস্কৃতি, ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত। ধর্ম মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে না, মানুষই ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে, লালন করে সকলের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য। আর এ শিক্ষার প্রাথমিক ও মূল স্তর হলো পরিবার। পরিবারের শিক্ষাই একজন মানুষকে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে সহয়তা করে। প্রাপ্তির অতিরিক্ত লোভ লালসার কাছে নিজের আদর্শ ও জীবনবোধ বিসর্জন না দিয়ে সব জানালা খুলে রেখে সত্যিকার আত্মউপলব্ধি, সত্যিকার চেতনার বিকাশ ও মাথা উঁচু রেখে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে গ্রহণ-বর্জনের মূল শিক্ষা দিতে পারে পরিবার, পরিবার এবং পরিবার। Basic learning ground হচ্ছে এই পরিবার। তাই পরিবারের শিক্ষক-শিক্ষিকা বাবা মাকে কোন ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হলে চলবে না। জীবন নাটকের আসল নায়ক-নায়িকা হচ্ছেন বাবা মা। যে কোন শিক্ষা, যে কোন শিক্ষায়াতনের শিক্ষার চেয়ে এই পারিবারিক শিক্ষাই বোধ করি বড় শিক্ষা যে জন্য আমাদের পরিবারের বাবা-মাকে শুধু ডিগ্রীধারী শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে সবার আগে। জানি বর্তমান বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে বিশেষ করে একজন মাকে শুধু ঘর সংসার নয়, বাইরেরও জীবিকা অর্জনের কাজে তাকে ব্যাস্ত থাকতে হয় তবু বলছি স্পষ্ট করে বলছি একজন সত্যিকার স্নেহময়ী, কল্যাণময়ী, মেধা ও মনন সম্পন্ন শিক্ষিতা মা-ই হচ্ছেন জীবন গড়ার শ্রেষ্ঠ কারিগর। আর এই কারিগর মাকে দিতে হবে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা। তাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সুবিধা যোগান দিতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে।

স্কুলে পড়ার সময় একজন গুণীজনের লেখায় পড়েছিলাম “মানুষ শৈশবে তার মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে যে শিক্ষা লাভ করে সে শিক্ষাই হইতেছে সব শিক্ষায়াতনের চেয়ে বড় শিক্ষা।” তাই মা-বাবাকে মর্যাদার সর্ব্বোচ্চ আসনে আসিন করতে হবে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে উত্তম কথা হল মহান আল্লাহ তা’আলার এবং সবচেয়ে সুন্দর উপদেশ হল প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স.)-এর। মা যে কেমন এবং তার গুরুত্ব ও মর্যাদা যে কতখানি এর বিশেষ বর্ণনা আল্লাহ তা’আলা এবং তাঁর রাসূল (স.) বিশেষভাবে দুনিয়াবাসীর জন্য ১৪ শত বছর পূর্বে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করে এর মাধ্যমেই বর্ণনা করে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

এ সম্পর্কে প্রিয় নবী (স.) বলেছেন যে,কোন পুণ্যবান সন্তান যদি তার পিতা-মাতার দিকে দয়ার (ভালোবাসার) দৃষ্টি দান করে আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিটি দৃষ্টির পরিবর্তে তার আমলনামায় একটি কবুল হজ্বের সওয়াব লিখে দেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন- হুজুর (স.), যদি (কোন ব্যক্তি) প্রতিদিন এইরূপ একশতবার দৃষ্টি করে? উত্তরে তিনি বললেন, হাঁ একশতবার দৃষ্টি দিলে একশতটি হজ্বের সওয়াব লিখিত হবে। কেননা, আল্লাহ তা’আলা মহান ও পবিত্র। (মেশকাত শরীফ)।

মহান আল্লাহ তা’আলা সন্তানদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালক এ আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে (আল্লাহকে) ভিন্ন অপর কারো ইবাদত করো না। আর পিতামাতার প্রতি উত্তম আচরণ করো। যদি তাদের একজন কিংবা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের উদ্দেশ্যে কখনও ‘উহ্’ (শব্দটি) পর্যন্ত বলবে না। তাদেরকে ধমক দিওনা, বরং তাঁদের সাথে মার্জিত ভাষায় কথা বলো। আর তাদের উদ্দেশ্যে অনুগ্রহে বিনয়ের বাহু অবনমিত কর। আর বল, হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়কে অনুগ্রহ কর, যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছেন।” (বনী ইসরাইল ২৩-২৪)

মা যে সার্বক্ষণিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আমার সর্বোত্তম ব্যবহারের হকদার কে? হুজুর (স.) বললেন, তোমার মা। লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করল, অতঃপর কে? হুজুর (স.) বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, অতঃপর কে? হুজুর (স.) এবারও জবাব দিলেন, তোমার মা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করল, অতঃপর কে? এবারে নবী করীম (স.) জওয়াব দিলেন যে, তোমার বাবা। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে নারীরা সর্বত্র অবহেলিত ও নির্যাতিত। অথচ মহান আল্লাহ তা’আলা এবং তাঁর রাসূল (স.) নারীদেরকে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন।এ সম্পর্কে প্রিয় নবী (স.) বলেছেন, মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। হযরত আবু তোফায়েল (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (স.) কে জারয়ানা নামক স্থানে গোশ্ত বন্টন করতে দেখলাম। এমন সময় জনৈকা মহিলা এসে তাঁর নিকটবর্তী হলে রাসূলুল্লাহ (স.) নিজের চাদর বিছিয়ে দিলে তার উপর তিনি বসলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে? লোকেরা বললো, ইনি তাঁর মা যিনি তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন। (সহীহ আবু দাউদ)

তাই আমারও মহান আল্লাহ পাকের কাছে প্রার্থনা হে আল্লাহ ! আপনি আমার মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের তাওফীক দান করুন।

Comments

comments