অপরিকল্পিত নগরায়ন, এলোমেলো উন্নয়ন প্রকল্প ও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে বাংলাদেশে কৃষিজমি উদ্বেগজনক হারে কমছে। কৃষিনির্ভর দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার প্রণয়ন করেছে ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’। ভূমি মন্ত্রণালয় খসড়া চূড়ান্ত করেছে; উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এটি কার্যকর হবে।
এই অধ্যাদেশ বলবৎ হলে অনুমতি ছাড়া কোনো কৃষিজমিতে আবাসন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, রিসোর্ট বা কারখানা নির্মাণ করা যাবে না। কৃষিজমি ভরাট, বিশেষ কৃষি অঞ্চল নষ্ট করা, পাহাড়–টিলা কাটা, জলাধার বা জলাভূমি ভরাট এবং ইটভাটায় উর্বর মাটি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা, পাশাপাশি স্থাপনা অপসারণ ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তি
- অনুমতি ছাড়া জোনিং পরিবর্তন—৬ মাস কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা
- কৃষিজমি অকৃষিকাজে ব্যবহার—১ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা
- কৃষিজমিতে আবাসন/রিসোর্ট/কারখানা—২ বছর কারাদণ্ড বা ৪ লাখ টাকা জরিমানা
- ইটভাটায় কৃষিজমি বা পাহাড়-টিলার মাটি ব্যবহার—২ বছর কারাদণ্ড বা ৪ লাখ টাকা জরিমানা
- বিশেষ কৃষি অঞ্চল ক্ষতি—৩ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা
- জলাধার–পাহাড়–বন ধ্বংস—প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তি + পুনঃস্থাপন আদেশ,
অপরাধে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামও জব্দ করা হবে।
১৮ শ্রেণিতে ভূমি ভাগ, তৈরি হবে জোনিং ম্যাপ
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি অঞ্চলের ভূমির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ‘ভূমি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ’ তৈরি করা হবে।
জমিকে মোট ১৮ ধরনের জোনে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে—যেমন কৃষি অঞ্চল, বিশেষ কৃষি অঞ্চল, কৃষি–মৎস্য চাষ অঞ্চল, নদী–খাল, জলাশয়, বাণিজ্যিক এলাকা, শহুরে আবাসিক, গ্রামীণ বসতি, শিল্প এলাকা, বন, পাহাড়–টিলা, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন অঞ্চল ইত্যাদি।
প্রয়োজনে সরকার নতুন জোন তৈরি বা পুরোনো জোন বাতিল করতে পারবে।
কৃষিজমির বিস্তৃত সংজ্ঞা
নাল, বিলান, ধানি জমি, চর ভূমি, বাগান, পতিত, ঘাসবন, বাঁশঝাড়, পশুচারণভূমি, বাইদ, মাঠ, বেগুন/মরিচ টিলা, ভিটি, ডাঙ্গাসহ বিভিন্ন ধরনের জমিকে কৃষিজমি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রয়োজনে সরকার আরও নতুন শ্রেণি যুক্ত করতে পারবে।
দুই থেকে চার ফসলি জমিতে মাছচাষকেও কৃষি হিসেবে গণ্য করা হবে। বিশেষ কৃষি অঞ্চলের জমি কোনোভাবেই অকৃষি কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
জেলা প্রশাসকদের দায়িত্বে থাকবে—
- কৃষিজমির তালিকা প্রস্তুত ও সুরক্ষা
- জলাধার, পাহাড়, বনভূমির সীমানা নির্ধারণ
- ইটভাটার লাইসেন্স দেওয়ার সময় মাটির উৎস যাচাই
- গোচারণভূমি সংরক্ষণ
- অনুমতি ব্যতীত স্থাপনা নির্মাণ রোধ
নিজের কৃষিজমিতে বসতবাড়ি, কুটির শিল্প, উপাসনালয় বা কবরস্থান নির্মাণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন,“বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষিজমি কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। তাই কৃষিজমি ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জমির সুরক্ষায় এই অধ্যাদেশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।”
