এপস্টাইন ফাইল: সর্বশেষ নথিতে রয়েছে মাস্ক, গেটস, ট্রাম্পের নাম

প্রকাশ:

শেয়ার করুন:

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ) জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে নতুন করে বিপুল পরিমাণ নথি, ছবি ও আইনি দলিল প্রকাশ করেছে যা এপস্টাইন ফাইল নামে বহুল পরিচিত। ২০১৯ সালে কারাগারে মৃত্যুর আগে এপস্টেইন যৌন পাচার ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। নতুন আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় এই নথিগুলো জনসমক্ষে আনা হয়েছে।

জেফরি এপস্টাইন মামলার তদন্ত সংক্রান্ত প্রায় ৩০ লক্ষ নতুন নথির পাশাপাশি হাজার হাজার ছবি ও ভিডিও রয়েছে যা এই কলঙ্কিত অর্থদাতা ও যৌন অপরাধীর অন্ধকার জগত এবং আমেরিকার নারী ও শিশুদের অধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘনের আরও বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরছে। মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ ঘোষণা করেছেন যে, তারা ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠারও বেশি নথি, ২,০০০টি ভিডিও এবং ১,৮০,০০০টি ছবি প্রকাশ করেছেন। এটি এখন পর্যন্ত এপস্টাইন সংক্রান্ত নথির একক বৃহত্তম প্রকাশ।

যদিও শুক্রবার প্রকাশিত এই নথিগুলোর অনেক অংশই কালো কালিতে মুছে দেওয়া হয়েছে (redacted), তবুও সেখানে বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ও ছবি শনাক্ত করা গেছে। DOJ জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা রক্ষা ও চলমান তদন্তের স্বার্থে এই রেড্যাকশন করা হয়েছে।

প্রকাশিত নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এপস্টাইনের সম্পর্কের হাজার হাজার উল্লেখ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এপস্টাইনের পাঠানো প্রচুর ইমেল, যেখানে ট্রাম্পের রাজনীতি ও তার পরিবার নিয়ে আলোচনা ও গসিপ ছিল। এছাড়া ট্রাম্পের প্রাক্তন হোয়াইট হাউস কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের সাথে এপস্টাইনের রাজনৈতিক আলাপচারিতা এবং বিমান ব্যবহারের অনুরোধ সংক্রান্ত তথ্যও এতে রয়েছে।

যাদের ছবি পাওয়া গেছে: নতুন প্রকাশিত ছবিতে বিখ্যাত সংগীতশিল্পী মিক জ্যাগার, মাইকেল জ্যাকসন এবং ডায়ানা রস-কে এপস্টাইনের সাথে দেখা গেছে। একটি ছবিতে মিক জ্যাগারকে এপস্টাইন এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মাঝে বসে থাকতে দেখা গেছে।

বিল গেটস ও রাশিয়ার নারী সংক্রান্ত অভিযোগ: প্রকাশিত একটি খসড়া ইমেল অনুযায়ী, এপস্টাইন দাবি করেছিলেন যে বিল গেটসের সাথে তার সম্পর্ক ছিল গেটসকে নির্দিষ্ট কিছু কাজে সহায়তা করা কেন্দ্রিক। ইমেলটিতে এপস্টাইন অভিযোগ করেন যে, তিনি বিল গেটসকে রুশ তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্কের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ড্রাগ বা ওষুধের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এছাড়া বিবাহিত নারীদের সাথে গেটসের গোপন সাক্ষাৎ সহজতর করার ক্ষেত্রেও নিজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন এপস্টাইন। যদিও বিল গেটস আগে থেকেই এপস্টাইনের সাথে তার সম্পর্কের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং কোনো অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

ইলন মাস্ক ও প্রাইভেট দ্বীপের আমন্ত্রণ: নথিতে টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক এবং এপস্টাইনের মধ্যে একাধিক ইমেল আদান-প্রদান পাওয়া গেছে। ২০১২ সালের নভেম্বরের একটি ইমেলে এপস্টাইন মাস্ককে তার ব্যক্তিগত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’-এ আসার আমন্ত্রণ জানান। মাস্ক সেই ইমেলের উত্তরে জানতে চেয়েছিলেন, দ্বীপে কোন দিন বা রাতে সবচেয়ে বড় পার্টি হবে। তবে মাস্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি কখনোই সেই দ্বীপে যাননি এবং এপস্টাইনের সাথে তার পরিচয় ছিল সামান্য।

হাওয়ার্ড লাটনিক ও মাসাজ টেবিল বিতর্ক: বর্তমান মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিকের নামও এই নথিতে এসেছে। ইমেলে দেখা যায়, ২০০৫ সালের দিকে লাটনিক এবং তার স্ত্রী এপস্টাইনের আমন্ত্রণে তার বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি মাসাজ টেবিল দেখে এপস্টাইন যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। লাটনিক জানান, সেই ঘটনার পর তিনি শপথ করেছিলেন যে তিনি আর কখনো এপস্টাইনের সাথে একই রুমে থাকবেন না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, লাটনিকের সাথে এপস্টাইনের যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত এবং তা সবসময় তার স্ত্রীর উপস্থিতিতেই হয়েছে।

অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তি: নথিগুলোতে আরও উল্লেখ আছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু (যাকে বর্তমানে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর বলা হচ্ছে)-এর কথা। একটি ইমেলে দেখা যায়, এপস্টাইন অ্যান্ড্রুর কাছে ব্যক্তিগতভাবে সময় কাটানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং অ্যান্ড্রু তাকে বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এছাড়া ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসনের সাথেও এপস্টাইনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ‘এপস্টাইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ কার্যকর হওয়ার পর এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার জনসমক্ষে আনা হয়েছে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জানিয়েছেন, সরকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার স্বার্থে কিছু তথ্য এখনও গোপন রাখা হয়েছে।

প্রকাশিত এপস্টাইন ফাইল-এর কয়েক হাজার পৃষ্ঠার মধ্যে অন্তত ৫৫০ পৃষ্ঠা সম্পূর্ণভাবে কালো কালিতে মুছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১৯ পৃষ্ঠার একটি নথিসহ আরও ২৫৫ পৃষ্ঠার তিনটি নথি রয়েছে যা পুরোপুরি পড়া যাচ্ছে না। ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় পক্ষের নেতারাই এই অতিরিক্ত গোপনীয়তার সমালোচনা করেছেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, নথিগুলো অনলাইনে আপলোড করার কিছু সময় পর বিচার বিভাগের ওয়েবসাইট থেকে অন্তত ১৬টি ফাইল সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছবি ছিল যেখানে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প, জেফরি এপস্টাইন এবং তার সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল-কে একসাথে দেখা গিয়েছিল। তবে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, আইনি কারণে আরও পর্যালোচনার জন্য কিছু উপাদান সাময়িকভাবে সরানো হতে পারে।

জেফরি এপস্টাইন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে থাকাকালীন আত্মহত্যা করেন। তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার এবং যৌন শোষণের গুরুতর অভিযোগ ছিল। এই নতুন নথিপত্রগুলো তার ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশার পরিধি কতটুকু ছিল, তা আরও স্পষ্ট করছে।

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ সংবাদ

এই রকম আরও

ইয়েমেন থেকে মিসাইল নিক্ষেপ, ইসরায়েলে বাজছে সতর্কতামূলক সাইরেন

ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইয়েমেন থেকে মিসাইল ছুড়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। এ মিসাইলের কারণে তেলআবিবসহ মধ্য ইসরায়েলের বিভিন্ন জায়গায় সতর্কতামূলক...

৭ দফা দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের সংবাদ সম্মেলন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে ইনকিলাব মঞ্চের সংবাদ সম্মেলন। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বাসস্থানে হামলা, হত্যা, নির্যাতন, ও সীমান্তে হত্যার প্রতিবাদে...

আর কোনো ফ্যাসিবাদ যেন পুলিশকে রক্তে রঞ্জিত না করে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, এই বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচার যেন পুলিশ সদস্যদের দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার...

যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে বড় ধাক্কার মুখে লেবার পার্টি

বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থানীয় নির্বাচন, যেখানে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির জন্য কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে...