নিজস্ব প্রতিবেদক, দোহার (ঢাকা) | ১১ মার্চ, ২০২৬
বিধাতা তার কণ্ঠ থেকে শব্দ কেড়ে নিয়েছেন, শ্রবণেন্দ্রিয় ডুবিয়ে দিয়েছেন এক গভীর নীরবতায়। কিন্তু হৃদয়ের যে ভাষা আর চোখের যে আকুতি—তা বোঝার ক্ষমতা কি এই সমাজের আছে? ঢাকার দোহারের দক্ষিণ জয়পাড়া এলাকার বাকপ্রতিবন্ধী রাহিমা বেগম কোনোদিন কল্পনাও করেননি যে, তার সেই নীরবতার সুযোগ নিয়ে তার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নেবে তার নিজের জন্মদাতা ভাই আর জীবনসঙ্গী।
মিষ্টির প্যাকেটে মোড়ানো বিষাদের ছোয়া। দিনটি ছিল গত ৯ ফেব্রুয়ারি। রাহিমার তিন ভাই নুরুল, সিরাজুল আর জার্মান প্রবাসী সাইদুল। সকালে যখন দুই ভাই নুরুল এবং সিরাজুল এসে বোনকে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে যাচ্ছিলেন, রাহিমা হয়তো ভেবেছিলেন আপন রক্তের টানে ভাইয়েরা তাকে একটু সঙ্গ দিতে এসেছেন। বিকেলে যখন বাড়ি ফিরলেন, রাহিমার হাতে ছিল এক প্যাকেট মিষ্টি।
সন্তানরা যখন ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন, “মা, কিসের মিষ্টি?”—রাহিমা তখন হাসি মুখে হাতের আঙুলের টিপসই দেখিয়ে বোঝাতে চাইলেন, কোনো এক কাগজে সই দিয়ে এসেছেন তিনি। সেই মুহূর্তের সেই হাসিটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। তিনি জানতেন না, ওই আনন্দময় মিষ্টির প্যাকেটের আড়ালে লুকিয়ে ছিল তার নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু কেড়ে নেওয়ার এক নিষ্ঠুর নীল নকশা।
যখন রক্ষকই ভক্ষক হয় এবং সেই ভক্ষক হয় যদি আপনজন, তাহলে সেই মর্মযন্ত্রণা আজ সীমাহীন।
রাহিমার ছেলে ফয়সাল রনি আজ দিশেহারা। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, “আমার মা কথা বলতে পারেন না, শুনতেও পান না। বাবা আরেকটা বিয়ে করে আলাদা থাকেন। আমার তিন মামা বাবাকে হাত করে আর খালার সহযোগিতায় মায়ের ৩.২৫ শতাংশ জমি আত্মসাৎ করেছেন। আমরা কিছুই জানতে পারলাম না। আমার মা জানতেনও না যে তিনি ভূমিহীন হয়ে গেছেন।”
পারিবারিক সম্মতির দোহাই দিয়ে ভাই নুরুল ইসলাম দাবি করছেন, সব নিয়ম মেনেই জমি নেওয়া হয়েছে। অথচ খোদ রাহিমা বেগমের ইশারা বলছে অন্য কথা। তার চোখের জল আর হাতের আঙুল বারবার ইশারায় বলছে—তাকে দিয়ে সই নেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে তার সবটুকু চলে যাবে, তা তিনি বুঝতে পারেননি।
আইনের ফাঁক নাকি মানবিকতার মৃত্যু? এই প্রশ্ন আজ জনমনে। সাধারণত বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে কঠোর আইনি বিধান থাকলেও, এই ঘটনায় ‘প্রতিবন্ধী কার্ড’ ব্যবহারের এক অদ্ভুত যুক্তি সামনে এনেছেন সংশ্লিষ্টরা। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দাবি, প্রতিবন্ধী কার্ড থাকলেই দলিল করা সম্ভব। কিন্তু একজন মানুষ যে তার জমি হস্তান্তরের পরিণাম বুঝতে পারছেন কি না, তা যাচাইয়ের নৈতিক দায়ভার কি রাষ্ট্র বা প্রশাসনের নেই?
রাহিমার বোন রজিফা আক্তার স্বীকার করেছেন, ভাইয়েরা তাদের ‘খুশি’ করেছে এবং রাহিমার ভাগের টাকা এখনো তার কাছেই জমা আছে। প্রশ্ন জাগে, যে জমির মালিক রাহিমা, সেই টাকা বোনের কাছে কেন? কেনই বা তার সন্তানদের অন্ধকার রাখা হলো?
প্রশাসনের দুয়ারে এক নীরব আর্তনাদ রহিমা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাহিমা বেগম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল যেন সমাজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। তিনি আদালতে যাওয়ার ভাষা জানেন না, আইনি প্যাঁচ বোঝেন না। তিনি শুধু বোঝেন, তার বাবার দেওয়া সেই ভিটেটুকু আজ আর তার নেই।
প্রশাসনের কাছে সন্তানদের এখন একটাই আকুতি—তদন্তের মাধ্যমে এই জালিয়াতি চক্রের বিচার হোক। বাকপ্রতিবন্ধী এক মায়ের নীরব কান্না কি পৌঁছাবে ক্ষমতার কান পর্যন্ত? নাকি প্রভাবশালী ভাইদের চক্রান্তে একদিন নিঃস্ব হয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে অভাগী এই নারীকে? এই প্রতিবেদককে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন জার্মান প্রবাসী সাইদুল।
দোহারের আকাশ-বাতাস আজ রাহিমার সেই অব্যক্ত যন্ত্রণায় ভারাক্রান্ত। বিচার কি মিলবে?
