মূল বিষয়বস্তুতে যান

G&RLeaderboardAd

LeadLine


আপনি এখানে

Contenttopcol1-1

আমরা অনেক ভুল করেছি: ইয়াহিয়া খান

সোম, 03/26/2012 - 01:44

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নিউজ উইক সাময়িকীর সিনিয়র এডিটর আরু দ্য বোর্শগ্রেভ (Arraud de Borchgrave) তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে খোলামেলা বেশ কিছু কথা বলেছিলেন সেই আলাপচারিতায়।
ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।
আপনি এবং ভারত যুদ্ধের কতটা কাছাকাছি?
ইয়াহিয়া খান: আমার বলার কোনো কারণ নেই যে যুদ্ধ আসন্ন নয়। ভারতীয়রা যুদ্ধ শুরু করেই দিয়েছে। মুখোমুখি সংঘর্ষ না হওয়ায় আমরা প্রত্যাঘাত করছি না। আমি প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন যুদ্ধটা ছড়িয়ে না দেন। ভারত ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ থেকে ৩০০০টি আর্টিলারি ও মর্টার শেল পূর্ব পাকিস্তানে নিক্ষেপ করছে। এ সপ্তাহের প্রথমে এক দিনেই ২৫ পাউন্ড ফিল্ড গান এবং তিন ইঞ্চি মর্টার থেকে ৫০০০ গোলা ছুড়েছে ভারত।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভারত প্রায় ছয় লক্ষ সেনা মোতায়েন করেছে। আপনিও কি তাই করেছেন?
ইয়াহিয়া খান: আমাদের সেনাবাহিনীকে পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। এবং কিছু সংখ্যক অফিসারকে বিশেষভাবে তলব করা হয়েছে।
আপনার সেনারা কি যুদ্ধের জন্য সর্ম্পূণভাবে প্রস্তুত?
ইয়াহিয়া খান: আমাদের সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট ও ব্যারাক ছেড়ে বের হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের জন্য পজিশন নেয়নি।


অধিকাংশ বিদেশি পর্যবেক্ষকের মতে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে উপমহাদেশে একটি অচল অবস্থার সৃষ্টি হবে। আপনি কি মনে করছেন পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব?
ইয়াহিয়া খান: যুদ্ধে আমরা অবশ্যই হারব না। আমার সেনাবাহিনী যুদ্ধে জয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম। কিন্তু পাঁচগুণ বড় ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা সামরিক উন্মত্ততা ছাড়া আর কিছু নয়। তবে আমাদের আক্রমণ করা হলে আমরা প্রতিরোধ করব।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে আপনাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফুরিয়ে গিয়ে একরকম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কত দিন যুদ্ধ করতে পারবে?
ইয়াহিয়া খান: সেটাই আমাদের বড় সমস্যা। ভারতের জন্য এতটা নয়। ভারতের যুদ্ধাস্ত্রের মজুদ আমাদের তুলনায় অনেক বেশি এবং বিভিন্ন সামরিক ক্ষেত্রে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ। যুদ্ধটা আমাদের পক্ষ থেকে ঘোষণা দিয়ে শুরু করা তাই এক ধরনের পাগলামিরই সাক্ষ্য দেবে। তারা যদি দৈনিক ৩০০০ শেল নিক্ষেপ করতে পারে তাহলে বুঝতে হবে তাদের হাতে অনেক গোলাবারুদ। এটা বিলাসিতা, আমাদের সেনাবাহিনীর সে সামর্থ্য নেই।
ইতোমধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের সাপ্লাই লাইন এবং সমুদ্রবন্দর ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘেরাও করে ফলেছে। যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় সেক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে কতটা সময় ধরে রাখতে পারবেন?
ইয়াহিয়া খান: এটা সত্যি, কাজটা খুব সহজ নয়। সৌভাগ্যবশত পূর্ব পাকিস্তানের ভূপ্রকৃতি প্রতিরক্ষাকারী শক্তির জন্য সহায়ক। আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি, এটা ওয়াকওভার হবে না। বড় যুদ্ধের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে আমাদের শক্তি এখানে, পশ্চিমে।
যুদ্ধ শুরু হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কতটুক?
ইয়াহিয়া খান: সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা আমি বলতে পারব না। কিন্তু ভারতের সঙ্গে তাদের যে চুক্তি রয়েছে- সেটা নিশ্চয়ই একটা অর্থ বহন করে। ভারতের চোখ খুলে দেয়ার জন্য সম্ভবত তারা তা ব্যবহার করবে। আর পাকিস্তান আক্রান্ত হলে চীন তা সহ্য করবে না- এটা নিশ্চিত। সরাসরি হস্তক্ষেপ না হলেও চীন থেকে আমরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাব। আর যদি রুশ ও চীনারা এসে যায়, তাহলে আমরা একটা বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতিতে পড়ে যাব, তখন কী হবে তা কল্পনাও করা যায় না.
চীনের সামরিক সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি কি আপনি নিশ্চিত?
ইয়াহিয়া খান: অবশ্যই নিশ্চিত।
কিছু প্রথিতযশা ভারতীয় মনে করেন, পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন এবং এক পক্ষকালের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা সম্ভব। ভারত যদি সেই উদ্দেশ্যে সামরিক শক্তি নিয়ে অগ্রসর হয়- আপনি সেক্ষেত্রে কী করবেন?
ইয়াহিয়া খান: ভারতের স্মরণ রাখা উচিত, বিষয়টি ঘটছে সর্ম্পূণই একটি ভিন্ন দেশে। যার বিন্দুমাত্র তাদের সীমানার অধীন নয়। বলপূর্বক একটি স্বাধীন দেশের অংশবিশেষ দখল করে নেয়ার বিষয়টি বহির্বিশ্বের কাছে সমাদৃত হতে পারে না। আমি আরেকটি সত্য জানি যে, পূর্ব পাকিস্তানিরাও তা মেনে নেবে না। ভুলে যাবেন না পূর্ব পাকিস্তানই একসময় পাকিস্তানকে একক রাষ্ট্রে পরিণত করার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। হিন্দু আধিপত্য থেকে নিজেদের মুক্ত করার লক্ষ্যেই তারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। বাঙালিরা কারও কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা বুঝে পায় নি। আমরা অনেক ভুল করেছি; স্বীকার করছি। পূর্ব-পাকিস্তানের উন্নয়নের দিকে যথেষ্ট নজর দেয়া হয়নি। তবে এখন সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এখনো প্রতিদিন ২০-৩০ হাজার শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
ইয়াহিয়া খান: না, তারা যাচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। যেভাবে ভারতীয়রা গোলা নিক্ষেপ করছে সীমান্তবর্তী মানুষদের এমনিতেই প্রাণের ভয়ে ছুটোছুটি করতে হচ্ছে। পূর্ব-পাকিস্তানের সীমান্ত চীনের প্রাচীরের মতো নয়। সীমান্তে চিহ্ন দেয়া নেই বলে ভারতীয়রা সুযোগ পেলেই সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভিনদেশীদের ধরে নিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের প্রতি আমার অনুরোধ, তারা যেন সীমান্তের উভয় দিক থেকেই বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত- ভারত এ প্রস্তাব গ্রহণ করবে না। কারণ তাতে করে ভারতীয়দের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে।
কয়েক মাসের মধ্যে নব্বই লাখ মানুষ কীভাবে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়?

ইয়াহিয়া খান: আপনার প্রদত্ত সংখ্যাটি আমি মানতে নারাজ। সংখ্যার পরিমাণ ২০ থেকে ৩0লাখ হতে পারে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক দিয়ে যাচাই করলে ৪০ লাখও পাওয়া যেতে পারে। সংখ্যা যাই হোক, এ বছরের মার্চের পর যে কোনো পাকিস্তানি ভারতে গিয়ে থাকলে আমি তাকে ফিরিয়ে নেব। এ বিষয়ে জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কারণ তারা এই বিষয়টি দক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে আমি মনে করি। তবে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর গণ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় যারা ভারতে গিয়েছে তাদের অনেককেই ভারত এখনো পুনর্বাসিত করতে পারেনি। কলকাতার দিকে তাকিয়ে দেখুন, এখনো ১০ লাখ লোক রাতের বেলা রাস্তায় ঘুমায়। এই সুযোগে ভারত যদি তাদের পূর্ব-পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবার চেষ্টা করে-আমি নিশ্চয়ই সেটা মেনে নিতে পারি না।

শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসনের বেশি কিছু দাবি করবেন না- এই শর্তে আপনি যদি সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাবার সুযোগ দেন-তাহলে কী ঘটতে পারে?

ইয়াহিয়া খান: অনেকের কাছেই আমার কথা হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হবে। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি ফিরে গেলে তাঁর নিজের লোকজনই তাঁকে হত্যা করে এই ভোগান্তির জন্য দায়ী করবে। যাকগে এটা একটা একাডেমিক প্রশ্ন। তিনি গত দুই বছর অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত ফিরে গেছেন নিজের বক্তব্যে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও তার নেতৃত্ব প্রদানের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনেক সরকারই যেমন করে থাকে, আগে গুলি করে হত্যা, তারপর বিচার। কিন্তু আমি তা করিনি। সাজা হওয়ার পর কী হবে সেটা রাষ্ট্রপ্রধানের এখতিয়ার। আমি চাইলেই খেয়ালের বসে তাকে মুক্তি দিতে পারি না। এটা অনেক বড় দায়দায়িত্বের ব্যাপার। তবে জাতি যদি তাকে ফিরিয়ে নিতে চায় আমি তার মুক্তি নিশ্চিত করব।

শ্রেণীবিভাগ: 

HighlightBottom1

Premium Drupal Themes by Adaptivethemes