মান্নান খান ও তার ভাইসহ স্ত্রীর আয়করের নথি চাইবে দুদক

155

নিউজ৩৯♦ সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে তার স্ত্রী ও দুই ভাইয়ের আয়কর নথি তলব করবে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামায় দেয়া সম্পদ বিবরণীর তথ্য যাচাইয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কেনা ফ্ল্যাট ও প্লটের দলিল চেয়ে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি দেয়া হচ্ছে। দুদক সূত্র জানায়, মান্নান খান তার নির্বাচনী হলফনামায় ১ কোটি ৪৪ লাখ ৬৩ হাজার ২২৭ টাকার উৎস দেখিয়েছেন মৎস্য চাষ ও বিদেশ থেকে আত্মীয়ের পাঠানো অর্থ। এর সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনে কথিত ওই আত্মীয়কেও তলব করা হতে পারে।

২০১২-১৩ অর্থবছরে শুধু মৎস্য চাষ থেকেই মান্নান খান আয় দেখিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা। এ তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে তার গ্রামের বাড়ি দোহার-নবাবগঞ্জে যাচ্ছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। হলফনামায় মান্নান খান রাজধানীর ১১৭নং কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউস্থ তিনটি অ্যাপার্টমেন্টের দলিল মূল্য দেখিয়েছেন ১ কোটি ৮১ লাখ ৮৬ হাজার ৩৮৬ টাকা। একটি এওয়াজ বদল দলিলের মাধ্যমে তিনি এসব অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করেন মান্নান। তাই এওয়াজ বদলকৃত জমির মূল্য এবং অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য যাচাই করবে দুদক। দুদক ধারণা করছে একেকটি অ্যাপার্টমেন্টের দামই হবে দেড় থেকে ২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য গোপন করে মান্নান খান কর ফাঁকি দিয়েছেন।

২০১১ সালে রাজধানীর খিলগাঁও গজারিয়া মৌজায় ১৫ শতাংশ জমি কিনেছেন মান্নান। এর দলিল মূল্য দেখিয়েছেন ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। দুদকের ধারণা, এ জমির প্রকৃত মূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি।

২০১২ সালে রাজধানীর গুলশানের ভাটারা মৌজায় সাড়ে ৮ শতাংশ জমি কিনেছেন মান্নান খান। এর দলিল মূল্য দেখিয়েছেন ২৩ লাখ। অনুসন্ধানে নেমে দুদক জেনেছে এর প্রকৃত মূল্য ৩-৪ কোটি টাকা। দলিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করে তিনি কর ফাঁকি দিয়েছেন। এ দুটি প্লটের দলিল সংগ্রহের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারকে। দলিল হস্তগত করার পর দলিলগুলোর দাতাদেরও ডাকা হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, প্রতিমন্ত্রীর পদবি ও ক্ষমতা অপব্যবহার করে মান্নান খান যে পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তার পুরোটা হয়তো অজানাই থেকে যাবে। কারণ, অনুসন্ধানে নেমে দুদককে হাঁটতে হচ্ছে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে, আইন ও বিধির ছকের ভেতর। তাতেও যা পাওয়া যাচ্ছে তা বিস্ময়কর।

আবদুল মান্নান খান হলফনামায় পেশা উল্লেখ করেন ‘আইনজীবী’। কিন্তু দুদক খোঁজ নিয়ে জেনেছেন তিনি ডাকসাইটের কোনো আইনজীবী ছিলেন না। মূলত সুপ্রিমকোর্ট বারে তিনি আইনজীবী সংগঠন করতেন। সুপ্রিমকোর্ট বারে একটি মেয়াদের জন্য তিনি সহ-সভাপতি ছিলেন। পেশাদার আইনজীবী কখনও ছিলেন না। তবু তিনি নিজের নামে সঞ্চয়পত্র দেখিয়েছেন ৬ লাখ টাকা। এফডিআর দেখিয়েছেন ৩৭ লাখ টাকা। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি হেঁটে বা রিকশায় চলাচল করলেও এমপি হওয়ার পর করমুক্তির সুবিধা নিয়ে একটি ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৫৮০২) কিনেছেন ৪৪ লাখ ৩১ হাজার টাকায়। যদিও এ টাকার কিছুটা প্রবাসী কোনো আত্মীয় দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এক বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার। দুদকের চোখে যা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্ত তার বেতন-ভাতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


২০১২-১৩ অর্থবছরে তিনি মৎস্য চাষ থেকে আয় দেখিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা। এটিও অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য বলে মনে করছে দুদক। ২০১২ সালে মান্নান খান ব্যাংক ঋণ শোধ করেছেন পৌনে ১২ লাখ টাকা। যা তার বৈধ আয় থেকে পরিশোধ করা অসম্ভব।

দশম সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় আবদুল মান্নান যেসব তথ্য দেন তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল-অমিল খুঁজে দেখতে দ্রুত অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। হলফনামায় বর্ণিত সম্পদের বাইরেও নামে- বেনামে আরও সম্পদ করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখতে তার স্ত্রী সৈয়দা হাসিনা সুলতানা, ভাই মোতালেব খান, বোরহান খান এবং তার পরিবারের অন্য সদস্যদের তথ্য চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-রিহ্যাব, ডাক বিভাগ, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, বিআরটিএ, রাজউক, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাছ থেকে নথি ও তথ্য চাওয়া হবে। আবদুল মান্নান খানের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপ-পরিচালক মোঃ নাসিরউদ্দিন। এদিকে আবদুল মান্নান খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চলছে দ্রুতগতিতে।

দুদক সূত্র জানায়, এরই মধ্যে তার সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য জানতে বাংলাদেশ ব্যাংক এনবিআর, বিআরটিএ, ডাক বিভাগ, জেলা রেজিস্ট্রারসহ ১৭টি সরকারি দফতরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) রাজউক ড. শওকত হোসেনের একাধিক প্লট বরাদ্দ নেয়া সংক্রান্ত নথিপত্র দুদকের কাছে হস্তান্তর করবে বলে জানা গেছে। এটি অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপ-পরিচালক যতন কুমার রায়।

সূত্র: যুগা্ন্তর

Comments

comments