দীর্ঘসূত্রিতাকে বিদায় জানান, সফলতার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যান

608

(না দেখলেন তো সারা জীবনের জন্য মিস করলেন)

এই লেখাটি শ্রদ্ধেয় শহীদ আল বোখারী মহাজাতক এর লিখা আত্মনির্মান বইয়ের অংশবিশেষ

আজ করব, কাল করব, সকালে করব, বিকেলে করব। এই করি করি করে করা আর হয় না। আর করা হলেও হয় শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে। ধীরে সুস্থে ভাল ভাবে করার জন্যে কাজটি রেখে দিলেও শেষ মুহুর্তে তাড়াহুড়ো করে করতে গিয়ে দেখা যায় যে দায়সারা ভাবে কাজটি শেষ করতে হয়। অথচ আমরা একটু সচেষ্ট হলেই এই দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে উঠতে পারি। জীবনকে করে তুলতে পারি আরও সফল আরও আনন্দময়।

কেন আমরা দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে উঠতে পারি না? 

কেন আমরা দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে উঠতে পারি না এই ব্যপারে মনোবিজ্ঞানী ড. লিন্ডা অনেকদিন দীর্ঘ গবেষনা করেছেন। তিনি সব ধরণের দীর্ঘসূত্রিতার পেছনেই তিনটি সাধারন অনুভূতি বা আচরন সনাক্ত করেছেন।

১. আমরা বড় বড় কাজ করতে চাই কিন্তু সে লক্ষ্যে বাস্তবে কাজ শুরু করি না।

২. কাজ শুরু না করার ব্যাখ্যা দাড় করাতে আমরা মেধাবি।

৩. আমরা জানি যে দীর্ঘসূত্রিতা দ্বারা আমরা আমাদের সুখকে স্যাবোটেজ করছি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই অনুশোচনা দীর্ঘসূত্রিতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। আমাদের জীবন আত্মপরাজয়ের দিকে ধাবিত হয়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতার মূল কারণ আলস্য নয়। দীর্ঘসূত্রিতার মূল কারণ হচ্ছে এক অজানা আশংকা। এই আশংকা বা ভয় হতে পারে পরিবর্তনের ভয়, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়, অশান্তির ভয় বা অন্য কোন ভয় যার অস্তিত্ব রয়েছে আপনার মনের গহীনে। আর দীর্ঘসূত্রি মানুষ সব সময় পেছনে পড়ে থাকে। অন্যরা যখন সাফল্যের সোপানে ধাপে ধাপে এগিয়ে যায়, সে তখন পেছন থেকে দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দীর্ঘসূত্রিতার প্রধান ধরন ৬টি।

.স্বপ্নচারীঃ এরা সব সময় চায় জীবন সহজ হোক কষ্ট মুক্ত হোক। এরা বাস্তব জীবন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। নিজেকে আকাশ কুসুম কল্পনার মাঝে ডুবিয়ে দেয়। আকাশ কুসুম কল্পনার মাঝে ডুবে থাকতেই ভালোবাসে। কারণ সেখানে কিছুই তাদের জন্য হুমকি নয়।তারা মনে করে তারা বিশেষ প্রজাতির মানুষ। তাদের নিয়ম অনুসরন করার প্রয়োজন নেই। এই ধরনের স্বপ্নাচারী দৃষ্টিভঙ্গি তাদের পেশাগত,পারিবারিক,পারিপার্শ্বিক সমস্যা সৃষ্টি করে। যা পরিণামে তার মধ্যে এক পলায়নী মনোবৃত্তি জন্ম দেয়।

প্রতিকারঃ আপনি যদি এ ধরনের স্বপ্নাচারী হন তবে ‘মুহুর্তের ভালোলাগা’ আর ‘নিজেকে ভালোলাগা’ এর মধ্যে পার্থক্য করতে শিখুন। আপনি যদি এখন দিবাস্বপ্নে ডুবে থাকেন বা টেলিভিশনের সামনে বসে অলস সময় কাটান, তাহলে এটা হচ্ছে ‘মুহুর্তের ভালোলাগা’। কিন্তু আপনি যদি নতুন কিছু শেখেন, নতুন কোন দক্ষতা অর্জনে সময় ব্যয় করেন, তাহলে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে। এটা হচ্ছে ‘নিজেকে ভালোলাগা’। কাজটা এখনি করতে হবে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই আপনাকে কাজে নামতে হবে। বাস্তবতার আলোকে প্রতিদিন কি কি করা যায় এবং তা করার জন্য কি কি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া যায়, তা লিখে ফেলুন। দিনের শেষে কিছুটা সময় ব্যয় করুন দিনের কাজ পর্যালোচনায়। বারবার নিজেকে বলুন, আজকের কাজ আজকেই করব।

. দুশ্চিন্তাকারীঃ দুশ্চিন্তাকারীরা সব সময় নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তাকেই সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়। আর এজন্যে তাকে মুল্যও দিতে হয় অনেক। তার নিরাপদ আরামদায়ক এলাকার সীমানা খুবই ছোট। কোন ঝুঁকি বা পরিবর্তনের মুখোমুখি হলেই দুশ্চিন্তায় তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। ঝর্ণাধারার মত অবিরাম গতিতে দুশ্চিন্তার প্রবাহ চলতে থাকে তার মনের ভেতরে। ‘যদি এই এই হয়’ তাহলে কি অবস্থা দাড়াবে এই নেতিবাচক আশংকায় সে একেবারে সংকুচিত হয়ে যায়। যদি এই বিরক্তিকর চাকরিটা ছেড়ে দেই তবে যদি আর কোন চাকরি খুজে না পাই? এই আশংকায় সে চাকরি ছাড়তে পারে না। অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করার চেয়ে সে একঘেয়ে নিরাপদ জীবনকেই বেছে নেয়। সাধারণত দেখা যায়, এই ধরনের দুশ্চিন্তাকারীদের বাবা-মা বা অভিভাবক রয়েছেন, যারা এদের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসেন এবং অবচেতনভাবে তাদের সন্তান যে তাদেরকে ছাড়া চলতে পারে না এই অনুভূতিতে আনন্দ পান। দুশ্চিন্তাকারীদের জীবনে আনন্দ খুবই কম থাকে। তারা সহজেই ক্লান্ত হয়ে যায়।

প্রতিকারঃ অধিকাংশ দুশ্চিন্তাকারীর অন্তরেই ঘুমিয়ে আছে প্রানবন্ত সাহসী সত্তা। আপনি যদি একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, যদি কিছুই ভালো না লাগে, তাহলে আপনাকে বলিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব কিছুর মাঝেই বিপদ কল্পনা করা থেকে বিরত থাকুন। সিদ্ধান্ত নিন।

কারণ সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকাও এক ধরনের সিদ্ধান্ত। আর তা নিজের জন্যেই ক্ষতিকর। নতুন পরিস্থিতি ও পরিবেশ সম্পর্কে শুধুমাত্র খারাপ দিকগুলো না ভেবে সম্ভবনাগুলো নিয়ে ভাবুন। ভাল দিকগুলো নিয়ে ভাবলে অনুভূতিই পাল্টে যাবে। আপনি নতুন সুযোগ গ্রহন করতে পারবেন। নতুন কাজে হাত দেবার সাহস পাবেন।

. অমান্যকারীঃ কর্তৃত্ব বা ক্ষমতার বিরুদ্ধে এদের ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু এরা এই ক্ষোভ প্রকাশ করে খুবই সঙ্গোপনে। এই ধরনের দীর্ঘসূত্রিতাকারী কাউকে যদি বলেন ‘এ কাজটা করে দাও’ সে সাথে সাথে বলবে ‘ঠিক আছে করে দেব।’ কিন্তু তারপর সে তার প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে যাবে অথবা আধাআধি করে কাজটি করবে বা অনেক দেরিতে কাজটি করবে। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এরা অন্যের প্রয়োজন পূরনের বেলায় এই কৌশল অবলম্বন করে । এ ধরনের আচরন তাকে ক্ষমতার অনুভূতি প্রদান করে। কিন্তু এর ফলে তার সহকর্মী বা সঙ্গীরা নিজেদেরকে অবহেলিত ও ব্যবহৃত ভাবে। পরিণামে অমান্যকারী নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হবার পর সে নিজেকে এই বলে স্বান্তনা দেয় যে, এই জটিল বিশ্বে একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ বলেই সে নিজে শাস্তি পাচ্ছে। সে অসুখি হলেও এ নিয়ে গর্বিত।

প্রতিকারঃ প্রতিক্রিয়ার বদলে ক্রিয়া করতে শিখুন। নিজেকে জীবনের শিকার মনে করার পরিবর্তে জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে ভাবুন। অন্যরা আপনার ব্যাপারে কি করছে সে দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আপনি নিজের জন্যে কি করছেন তা নিয়ে ভাবুন। মনে রাখুন, নিজে উদ্যোগী হওয়া ও প্রো-এক্টিভ হওয়াই শক্তিমান ও ক্ষমতাবান হওয়ার প্রথম শর্ত।

. সংকট সৃষ্টিকারীঃ আমরা অধিকাংশই কোন না কোন ভাবে শেষ মুহূর্তে কাজ ভাল করতে পারি। হাতে আর সময় নেই, এখন না করলেই নয়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক পূর্ণোদ্দমে কাজ শুরু করে। আমরা কাজ শেষ করি। একজন সংকট সৃষ্টিকারী সবসময় নাটক করতে চায়। এক ধরনের আচরন থেকে অন্য ধরনের আচরনে চলে যায়। প্রথমত সে পরিস্থিতিকে আমল দেয় না। চাপ অনুভব না করলে সে শুরুই করতে পারে না। পরে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠে। সব বাদ দিয়ে সময়মত কাজ শেষ করার জন্য লেগে যায়। এ ধরণের প্রক্রিয়া তারুণ্যে চলে। কিন্তু ৪০ এর পর এ প্রক্রিয়ার সাথে শরীর আর তাল মেলাতে পারে না।

প্রতিকারঃ সময়সীমার মাঝে কাজ করা বিরত্বব্যঞ্জক কিছু নয়, এটি নিয়ম। সংকটসৃষ্টিকারীদের কাজের ব্যপারে নিজেকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সমস্যায় ভোগেন। নিজেকে পুরোপুরি উদ্বুদ্ধ করতে পারলে আগে থেকেই কাজে হাত দেয়া যায়।

 

অন্য খবর  সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে চাকরির সুযোগ

. নিখুত কর্ম সম্পাদনকারীঃ এরা প্রতিটি কাজই নিখুতভাবে করতে চায়। যে কোন কাজ করতে গেলেই সে তার আত্মমর্যাদাকে এর সাথে জড়িয়ে ফেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা আদর্শবাদী এবং সময় ও শক্তি ব্যয়ের ব্যাপারে অবাস্তববাদী। ওদের কাউকে পেন্সিল চোখা করতে দিতে বলুন। দেখবেন সে হয়তো খুব বিব্রত ভাবে পেন্সিলের দিকে তাকাবে এবং সারা দিনই হয়তো এর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাববে কিভাবে সুন্দর করে পেন্সিলটি চোখা করা যায়। অথবা সে তখনই পেন্সিল চোখা করতে লেগে যাবে এবং দিনের শেষে হয়তো ঠিকই পেন্সিলটি সুন্দর চোখা করে নিয়ে আসবে কিন্তু কাটতে কাটতে এতই ছোট করে নিয়ে এসেছে যে তা দিয়ে আপনি লিখতেই পারবেন না। এরা প্রতিটি জিনিসকেই হয় একেবারে নিখুত, নয় একেবারে কিছুই না এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। নিখুত কর্ম সম্পাদনকারীরা মনের গভীরে সবসময় মনে করে পুরোপুরি না পারলেই শেষ হয়ে গেলাম। দীর্ঘসূত্রিতা এদের কাছে বিচারকে বিলম্বিত করারই একটা প্রক্রিয়া, আপনি না খেললে কখনো হারবেন না। কাজ না করলে ব্যর্থও হবেন না।

প্রতিকারঃ আপনার দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাতে হবে। আপনার কি করা উচিত তা না ভেবে আপনি কতটুকু করতে পারেন তা নিয়ে ভাবুন। কোন মানুষই নিখুত নয়। তাই কোন কাজও নিখুত হতে পারে না। আপনার মাঝে মাঝে ভুল করা উচিত। টেবিলের উপর আধবেলা সব এলোমেলো করে রাখুন। পোশাকে একটু খুত থাকুক না এক বেলা। যখন দেখবেন এর ফলে পৃথিবী ধংস হয়ে যাচ্ছে না, তখনই আপনি শিখবেন- নিখুত নয়, সুন্দরভাবে কাজ করাটাই গুরুত্বপুর্ণ।

. সব কাজের কাজীঃ সব কাজের কাজীকে কখনও দীর্ঘসূত্রী মনে হয়না। কারণ সে সবসময় ব্যস্ত। সবসময় কাজ করতে চায়। সে সবাইকে খুশি করতে চায়। সবার কাজ করে দিতে চায়, কাউকেই না বলতে পারে না। সব কাজের কাজী কে আপাত দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয়,সেই সফল হবে।কিন্তু বাস্তবে তা হয়না। আত্মনির্ভরশীল হওয়া ও সব কাজ করার সংগ্রামে সে তার কাজ ও সময়ের মাঝে সমন্ময় করতে ব্যর্থ হয়। যাদের সে খুশি করতে চেয়েছিল, তাদেরকেও সে খুশি করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে,তাদেরকেও সে খুশি করতে পারে না। কারণ সে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ হাতে নিয়েছিল।

প্রতিকারঃ সব কাজের কাজীদের উচিত না করতে শেখা। হাতে সময় ও কাজ কতটা আছে সেটা বিবেচনা করে হ্যাঁ বলুন। যতটুকু আপনি করতে পারেন ততটুকুই করুন। বাকিটুকু ছেড়ে দিন অন্যদের জন্যে। তা হলেই আপনি সুখী হবেন।

পদক্ষেপ নিন। দীর্ঘসূত্রিতা থেকে মুক্ত হয়ে সুন্দর জীবনের প্রতি অগ্রসর হোন।

Comments

comments