খাবার ও পানির মাধ্যমে জীবাণু শরীরের ভেতর প্রবেশ করে। ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়াও ডায়রিয়া, যা সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় তিনবার বা তারও বেশিবার হয়। যদি পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, তাকে ডায়রিয়া বলে ধরে নেওয়া হয়। আবার পায়খানা বারবার হলেও মল যদি পাতলা না হয়, তা ডায়রিয়া নয়। সাধারণত তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় জটিলতা হচ্ছে পানিশূন্যতা। পানিশূন্যতা হলে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি শিশুর জীবন বিপন্ন হতে পারে। এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন মৃধা বলেন, মনে রাখতে হবে, শুধু মায়ের দুধ পান করে এমন শিশু অনেক সময় দিনে পাঁচ-দশবার পর্যন্ত পায়খানা করতে পারে, যা সামান্য তরল হয়, একে ডায়রিয়া বলা যাবে না। শিশু যদি খেলাধুলা করে, হাসিখুশি থাকে, তাহলে এর অন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।ডায়রিয়ার প্রকারভেদ তীব্র

ডায়রিয়া: এটা হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন স্থায়ী হয়। তবে কখনো ১৪ দিনের বেশি নয় এবং পায়খানার সঙ্গে কোনো রক্ত যায় না।

দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া: পাতলা পায়খানা ১৪ দিনের বেশি স্থায়ী হলে।

জলীয় ডায়রিয়া: মল খুবই পাতলা হয়, ক্ষেত্রবিশেষে একেবারে পানির মতো। মলে কোনো রক্ত থাকে না।

আমাশয় বা ডিসেন্ট্রি: রক্তমিশ্রিত পায়খানা।

কারণ : কতগুলো রোগজীবাণু খাদ্যনালিতে প্রবেশ করে ডায়রিয়া ঘটায়। এগুলো রোটাভাইরাস, ই-কোলাই, সিগেলা, ভিবরিও কলেরা, প্যারাসাইট-এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা ও জিয়ারডিয়া প্রভৃতি নামে পরিচিত। সাধারণত খাদ্য বা পানীয়ের দ্বারা ডায়রিয়ার জীবাণু খাদ্যনালিতে প্রবেশ করে। এর অন্যতম মাধ্যম অপরিষ্কার হাত, গ্লাস, চামচ, বাসনপত্র বা সচরাচর ব্যবহৃত অন্যান্য জিনিসপত্র, মল, মাছি ইত্যাদি।

কীভাবে বুঝবেন পানিস্বল্পতা নেই: শিশুর চোখ যদি স্বাভাবিক ও পানিসমৃদ্ধ থাকে, মুখ ও জিব ভেজা থাকে, তৃষ্ণার্ত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে পানি পান করে, পেটের চামড়া ধরে ছেড়ে দিলে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়, বুঝতে হবে শিশুর পানিস্বল্পতা নেই। এ অবস্থায় প্রয়োজনমতো পানি, খাবার স্যালাইন বা লবণ-গুড়ের শরবত দেওয়া যেতে পারে।

কিছু পানিস্বল্পতা: শিশুর অবস্থা যদি অস্থির, খিটখিটে হয়, তার চোখ যদি বসে যায়, চোখে যদি পানি না থাকে, মুখ ও জিহ্বা যদি শুকনো থাকে, যদি বেশি তৃষ্ণার্ত থাকে, পেটের চামড়া ধরে ছেড়ে দিলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়—শিশুর শরীরে এসবের দুই বা ততোধিক চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে ‘কিছু পানিস্বল্পতা’র স্তরে রয়েছে। বেশি বেশি খাবার স্যালাইন, বুকের দুধ, ভাতের মাড়, পানি, ডাবের পানি কিংবা শুধু পানি খাওয়াতে হবে। প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর রোগীকে পরীক্ষা করে পানিঘাটতির স্তর নির্ণয় করে দেখতে হবে যে রোগী কোন স্তরে আছে। সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

চরম পানিস্বল্পতা: যদি অবসন্ন, নেতিয়ে পড়া, অজ্ঞান কিংবা ঘুম ঘুম ভাব থাকে, চোখ বেশি বসে যায় এবং শুকনো দেখায়, চোখে পানি না থাকে, মুখ ও জিহ্বা খুব শুকনো থাকে, পানি পান করতেও কষ্ট হয় কিংবা একেবারেই পারে না, পেটের চামড়া ধরে ছেড়ে দিলে অত্যন্ত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়—শিশুর শরীরে এসবের মধ্যে দুই বা ততোধিক চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে শিশুটি ‘চরম পানিস্বল্পতা’ স্তরে রয়েছে। চরম পানিস্বল্পতা অবস্থার জরুরি চিকিৎসায় তৎক্ষণাৎ শিরায় স্যালাইন দিতে পারলে ভালো। এ জন্য শিশুকে কাছের কোনো হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

স্যালাইন বানানোর পর তা কতক্ষণ সময় পর্যন্ত খাওয়াতে পারবেন? প্যাকেট থেকে তৈরি করা খাবার স্যালাইন ১২ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়। ১২ ঘণ্টা পর অবশিষ্ট থাকলেও তা ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন তৈরি করে খাওয়াতে হবে। আবার ঘরে তৈরি করা লবণ-গুড় অথবা চিনির শরবত ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। এরপর তা অবশিষ্ট থাকলেও ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন বা শরবত তৈরি করে খাওয়াতে হবে। তরল খাবারের পাশাপাশি খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে। শিশুর ওরস্যালাইনের পরিমাণ হচ্ছে, প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ২৪ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য ৫০-১০০ মিলি, ২-১০ বছর বয়সী ‍শিশুর জন্য ১০০-২০০ মিলি এবং ১০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য চাহিদা অনুযায়ী।

কিছু পরামর্শ

  • যারা বুকের দুধ খায় তাদের বারবার বুকের দুধ দিতে হবে।
  • শিশু যদি বমি করে তাহলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার খাওয়াতে হবে।
  • ডায়রিয়া ভালো হয়ে গেলেও পরবর্তী ২ সপ্তাহ শিশুকে এর কমভাবে বাড়তি খাবার প্রতিদিন দিতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ শিশুকে খাওয়ানো যাবে না।
  • ডায়রিয়া এড়াতে হলে পরিবারের সবাইকে ভালোমতো হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। বিশেষত খাওয়ার আগে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে, পায়খানা করার পর, শিশুর পায়খানা পরিষ্কার করার পর, রান্না করার আগে, খাবার পরিবেশন করার আগে অবশ্যই সাবান ও যথেষ্ট পরিমাণ পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।
  • শিশুর ও নিজের নিয়মিত নখ কাটা, প্রতিদিন গোসল, বাচ্চাকে দুধ দেওয়ার আগে স্তন পরিষ্কার ইত্যাদি করা।
  • জন্মের প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো। কেননা বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুর ডায়রিয়া হয় না, কারণ বুকের দুধ জীবাণুমুক্ত শিশুরোগ প্রতিরোধকারী। বোতলে দুধ খাওয়ালে ডায়রিয়া বেশি হয়। কারণ বোতল সব সময় পরিষ্কার রাখা কখনোই সম্ভব নয়। তবে ছয় মাস বয়স হওয়ার পর থেকে শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার পরিবারের সবাই যা খায় তা নরম করে খাওয়াতে হবে।
  • স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি করতে হবে এবং বাড়ির ছোট-বড় সবাইকে সেখানে মলত্যাগ করতে হবে। পায়খানায় যেন মাছি না ঢুকতে পারে এবং মল যেন ডোবা, পুকুর, নদী বা ব্যবহার করার পানির সঙ্গে না মেশে, এরূপভাবে পায়খানা তৈরি করতে হবে।
  • ছোট শিশুদের পায়খানা বড়দের মতোই রোগ ছড়াতে পারে, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি। তাই শিশু পায়খানা করার পরপরই তা তুলে নিয়ে বড়দের বাথরুমে ফেলতে হবে। পায়খানা করার পর শিশুদের পরিষ্কার করে সেই পানিও ফেলে দিতে হবে।

 

অন্য খবর  ধূমপায়ীদের পাশে থাকলে যেসব ক্ষতি হতে পারে

Comments

comments