আফ্রিকার কয়েকটি রহস্যময় প্রানী

2204

এই আধুনিক যুগেও উষ্ণমন্ডলীয় আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও প্রাগৈতিহাসিক যুগের বহু প্রাণী টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। তবে সবচেয়ে উত্তেজনাকর ঘটনা হবে যদি সত্যি সত্যিই এ যুগেও কোন ডাইনোসরের খোঁজ পাওয়া যায়। এই বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে।

http://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/7/73/Diplodocus_cknight.jpg/170px-Diplodocus_cknight.jpg

সরোপড ডাইনোসর
আফ্রিকার সব চেয়ে গভীরতম বনভূমি গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর বিশাল লিকুয়ালা জলাভূমিতে কয়েকটি প্রাণী দানব হিসেবে পরিচিত। পিগমি এবং পশ্চিমাঞ্চলী বসতি স্থাপনকারীদের মাঝে এই প্রাণিগুলো মোকেলেমবেমবে হিসেবে পরিচিত। সামনা সামনি দেখেছে এমন লোকের মতে ওটা একটা বিশাল জলের প্রাণী। মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় নয় মিটারের মতো। গায়ের বর্ণ হচ্ছে লালচে বাদামি। শরীরের আকার হাতির মতো। তুলনামূলকভাবে উচ্চতা কম। পাগুলো বেশ মোটা। লেজ ও ঘাড় লম্বা। মাথাটা ছোট। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিন আঙুলবিশিষ্ট পদচিহ্ন। এই বর্ণনার সাথে খুব বেশি মেলে বিখ্যাত সরোপোড ডাইনোসর ডিপ্লোডকাস এবং অ্যাপাটোসরাসের সাথে। আগে অ্যাপাটোসরাসকে বলা হত ব্রন্টোসরাস। এরা সবাই সরোপড ডাইনোসরের গোষ্ঠীভূক্ত। বিজ্ঞানীরা বইয়ে আঁকা কয়েকটি ডাইনোসরের ছবি স্থানীয় মানুষদের দেখান। তারপর তারা জানতে চান তাদের দেখা প্রাণীটি কী রকম। তারা কোন চিন্তা না করেই অ্যাপাটোসরাসকে দেখিয়ে দেয়। উল্লেখ্য যে, প্রাগৈতিহাসিক জীবন বা প্রাণী সম্পর্কে তাদের ধারণা বা পরাশোনাই নেই। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক রয় পি . ম্যাকেল সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। ১৯৮০ এর দশকে তিনি এই প্রাণীটির জন্য লিকুয়ালায় অনুসন্ধান চালিয়েছেন। গবেষক বিল গিবন্স এর নেতৃত্বে দু’টি বৃটিশ অনুসন্ধানী দল এখানে এসেছিল। এগুলোর মধ্যে ১৯৮৬ ও ১৯৯২ সালের ওই অভিযানগুলোর নাম ছিল “অপারেশন কঙ্গো’’। তবে দুঃখজনক হচ্ছে এই প্রানীর অস্তিত্ব সম্পর্কে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে এতে বিস্মিত হবার কিছুই নেই। এদের বাসস্থানগুলো খুবই দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। স্থানীয় অধিবাসীরাও পারতপক্ষে ওইসব স্থানে যায় না। একটি ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা গেছে। এই মোকেলেমবেমবি প্রজাতি প্রকৃতির প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে টিকে আছে। অতি সম্প্রতি প্রাপ্ত তাদের কঙ্কালই তার প্রমাণ।

প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে এ জাতীয় প্রাণী আরও আছে আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলে। এ অঞ্চলগুলো হচ্ছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং গ্যাবন। এখানে যে প্রাণীগুলো দেখা গেছে স্থানীয় ভাষায় তাদের বলা হয় ব্যদিগুই, অ্যামালি এবং নিয়ামালা। সবচেয়ে মজার কথা হল ড্রাগনজাতীয় ‘সিরুশ’- এর ছবি আঁকা হয়েছে প্রাচীন ব্যাবীলনের ইস্টার্ন গেটে। এই ছবির সাথে বহুলাংশে মিলে যায় মোকেলেমবের সাথে। এই ছবি আঁকা হয়েছে ভ্রমণকারীদের বলা কাহিনী থেকে নেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। এই গেটের কয়েকটি ইট আনা হয়েছে মধ্য আফ্রিকা থেকে যেখানে এই প্রাণীটা দেখা গেছে বলে দাবী করা হয়। লিকুয়ালার আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রাণী হচ্ছে ‘ইমেলানটুকা’। এর অর্থ হচ্ছে ‘হাতি শিকার’। বলা হয়ে থাকে, এ প্রাণীটি হাতি আকারের একটি উভচর। নাকের উপরে আছে খুবই শক্তিশালী দাত। কেউ কেউ আবার মনে করে, এরা আধা জলজ গন্ডার জাতীয় প্রাণী। তবে এদের দেহাবয়ব এবং জীবনযাপন এই ধারণাকে সমর্থন করে। তাই এই প্রাণীর বিশেষ ধরনের শিং, মোটা লেজ  এবং স্বভাব বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক ম্যাকেল সতর্কভাবে মন্তব্য করেছেন। তার মতে ইমেলানটুকা আসলে হতে পারে টিকে থাকা ‘সিরাটপসিয়ান’। অর্থাৎ শিংযুক্ত ডাইনোসর। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডাইনোসর হচ্ছে ‘ট্রিসেরাটপ’। এদের শিং কিন্ত স্বাভাবিক গন্ডারের শিং থেকে আলাদা। গন্ডারের শিং হয়ে থাকে জমাটবাধা পশমগুচ্ছ মাত্র। এদের মতো মোটা লেজও গন্ডারের নেই।

http://a4.sphotos.ak.fbcdn.net/hphotos-ak-ash3/526931_426383087392601_502941500_n.jpg

ন্যানদি ভালুক

আফ্রিকার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং রহস্যময় প্রাণী হচ্ছে কেনিয়ার হিংস্র ন্যানদি ভালুক। কয়েকজন বিজ্ঞানী বলেছেন ক্যালিকোথিয়ার জাতীয় বিলুপ্ত বিবেচিত কিছু প্রাণী সম্পর্কে হয়তবা কেও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আসলে ঘোড়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঢালু পিঠের এই প্রাণীটি হচ্ছে খুরবিশিষ্ট স্তন্যপায়ী। কিন্ত খুর ছাড়াও এই প্রাণীটির থাবাও আছে। থাবার নখের সাহায্যে মুল খুঁড়ে নেয় মাটি থেকে। দশ হাজার বছর আগে শেষ হয়ে যাওয়া প্লাইস্টোসিন যুগে ক্যালিকোথিয়ার বিলুপ্ত হয়েছে বলে সীকৃত।এখনকার ন্যানদি ভালুকের বর্ণনা ওই প্রাণীর বর্ণনার সাথে অনেকটা মিলে যায়। খুব রেগে গেলে ক্যালিকোথিয়ায় কখনও কখনও ন্যানদি ভালুকের মতো প্রাণঘাতী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। তবে ক্যালিকোথিয়ার কোন কোন প্রাণী হত্যা করলেও তা খেত না। অন্যদিকে ন্যানদি ভালুক শিকারকে মেরে খেয়ে ফেলত। আরও একটি প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাণী টিকে আছে বলে অনুমান করা হয়। এই প্রাণীর আকার সিংহের মতো। মুখটা ছোট। শর্ট-ফেসড হায়েনা বা ছোট মুখ হায়েনা বলা হয়। এদের বৈজ্ঞানিক নাম হায়েনা ব্রেভিরোসট্রিস। প্লাইস্টোসিন যুগে আফ্রিকায় বাস করত এরা। এখনকার হায়েনার চেয়ে ওরা আরও বুদ্ধিমান শিকারি ছিল। তাই চাক্ষুস দেখেছে এমন মানুষের কাছে এই ন্যানদি ভালুক বড় হায়েনার মতো। তবে মুখটা তুলনামূলকভাবে ছোট। আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে ছোট মুখ হায়েনা এখনও টিকে থাকলে এই ন্যানদি ভালুক রহস্যের একটা কিনারা হয়ে যেতে পারে। পশ্চিম আফ্রিকার উত্তর সাদের পার্বত্য অঞ্চলের বাঘও প্রাগৈতিহাসিক যুগের টিকে থাকা প্রাণী হতে পারে। এনেদির জ্যাগুয়া জনগোষ্ঠীর ধারণা এই অমীমাংসিত প্রাণীটির আকার সিংহের মতো। লাল পশমের উপর সাদা ডোরা কাটা। লেজ নেই। উপরের চোয়ালে দু’টি বড় দাত আছে। দাতগুলো মুখ থেকে বের হয়ে থাকে। এক বৃদ্ধ জ্যাগুয়া শিকারিকে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি দেখানো হয়েছে। এই ছবিগুলো কয়েকটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীর। ওই বৃদ্ধ পার্বত্য বাঘটিকে চিহ্নিত করেছে ম্যাকেইরডাস হিসেবে। বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি অনুযায়ী দশ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার এক জাতীয় বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে ছিল। এদের উপর চোয়ালের দুটি দাত মুখ থেকে বের হয়ে থাকতো। সাথে এসব বিষয়ে এখনও প্রাণীবিজ্ঞানের গবেষণা তেমন হয়নি। এদেশের পর্বতগুলো খুবই দুর্গম। তাই এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে ওই বিশেষ দাত ওয়ালা বাঘটিকে থাকার সম্ভাবনা আছে। কারণ এখানে মানুষের হাত এখনও তেমন প্রসারিত হয়নি। হয়তো কোন বৈজ্ঞানিক দল ভবিষ্যতে একদিন এসব রহস্যের সমাধান করবে।

Comments

comments