বাংলাদেশের পার্লামেন্ট নির্বাচন, প্রস্তুতি নিচ্ছে দিল্লি

181
বাংলাদেশের পার্লামেন্ট নির্বাচন, প্রস্তুতি নিচ্ছে দিল্লি

বাংলাদেশে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকায় কোন পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হয় কিনা তার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে প্রতিবেশি ভারত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও নয়া দিল্লি এখন দেশটির বিরোধী দল ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)’র সঙ্গে সংযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই দলটি ২০১৪ সালের মতো বয়কট না করে আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী এটল বিহারি বাজপেয়ীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরলোকগত ব্রজেশ মিশ্র একসময় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন: ‘ভারত সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখে না।’ এর মানে ছিলো হাসিনা যদি ভারতকে পাত্তা দিতে না চান তাহলে ভারত তার বিরোধী পক্ষের প্রতিও হাত বাড়াতে পারে।

তাই ভারত-বাংলা যৌথ পরামর্শ কমিশনের বৈঠকে যোগদান উপলক্ষে ঢাকা সফরে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি’র নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জাতীয় পার্টির নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে যে আলোচনা করেন তা কৌতুহলী বার্তা বহন করছে। জাতীয় পার্টি ক্ষুদ্র দল হলেও বিএনপি’র অনুপস্থিতিতে তারাই এখন পার্লামেন্টের বিরোধী দল।

বাংলাদেশে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় মন্ত্রীর বৈঠকের তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাভিশ কুমার পরিচালিত সরকারি টুইটারে ফলাও করে এই খবর প্রচারের ধরন থেকে।

বিএনপিও এই বৈঠককে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়েছে। বেগম জিয়া তার মাত্র পাঁচ জন শীর্ষ সহযোগীকে নিয়ে বৈঠকে যোগ দেন বলে ঢাকার সূত্রগুলো জানায়।

আনুষ্ঠানিকভাবে জেসিসি’র বৈঠকে যোগ দিতে সুষমা ঢাকা গেলেও তার আসল মিশন ছিলো ক্ষমতায় যেই থাক বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা।

বলা হচ্ছে যে ভারত চায় বিএনপি যেন আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়। খালেদা জিয়াকে এ বার্তাই পৌছে দেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী। শাসকদলকে নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধীদলের শূন্যস্থান যেন জঙ্গিবাদ পূরণ করতে না পারে তাই দেশ ও অঞ্চলের প্রয়োজনেই একটি গণতান্ত্রিক, সংসদীয় বিরোধী দলের প্রয়োজন।

অন্য খবর  সুইডেনে গণধর্ষণ; সরাসরি ফেসবুক লাইভে

বাংলাদেশের ৩৫০ আসনের সংসদে বর্তমানে বিরোধী দলের সদস্য মাত্র ৫৬ জন। আর বিএনপি’র বয়কটের সুযোগে ১৫০টিরও বেশি আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সদস্যরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যায়।

ভারতের আগ্রহের আরেকটি বিষয় হলো, পার্লামেন্টে যদি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকে তাহলে যেসব উপাদান অসাংবিধানিক উপায়ে সরকারকে প্রভাবিত করা বা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে সেগুলোর কাছ থেকে বিপদের ঝুঁকি কম থাকবে। বিএনপি যদি পার্লামেন্টে যায় এবং ন্যায্য ক্ষমতার আকাঙ্কি হয় তাহলে ইসলামী চরমপন্থার ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি ইসলামী চরমপন্থী দলগুলোকে মোকাবেলা করাও সহজ হবে।

এর আগে কয়েক মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা বিএনপিও জানে ক্ষমতায় যেতে হলে কাকে নিতে হবে এবং বিশ্বায়নের এই বিশ্বে ভারত ও অন্যান্য দেশের সঙ্গেও তাকে লেনদেন করতে হবে।

চীন ঠেকাওঃ বলা হচ্ছে, চীন যখন বাংলাদেশকে তার কব্জায় নিতে চাচ্ছে তখন ভারত সর্বাত্মক চেষ্টা করছে দেশটিকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখতে। চীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৩.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ২৪.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ধারেকাছেও ঘেষতে পারবে না ভারত। নয়া দিল্লি এ পর্যন্ত লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, যা সব মিলিয়ে ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে চীন যে সামরিক সাহায্য দিচ্ছে সেই জায়গাটিও ধরতে চাইছে ভারত, ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ছোট্ট এক প্রতিশ্রুতি দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছে।

একটি ফ্যাক্টর যা খুব বেশি প্রচারিত হয়নি তাহলো ভারতের লাইন অব ক্রেডিট চীনের তুলনায় সস্তা, সুদের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, (শ্রীলংকার মতো) চীনের দেয়া ঋণের সুদ ৬ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত।

অন্য খবর  করাচিতে নিরাপত্তা বাহিনীর ৮ জঙ্গিকে হত্যা

চীনের সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতায় ঘাটতি পূরণ করতে ভারত বলছে যে বাংলাদেশ তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশি, ভারতের সঙ্গে তিন দিকে – পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব – সীমান্ত রয়েছে তার। দুই দেশ তাদের দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্তে অভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করছে। তাদের মধ্যে তিস্তার মতো বড় নদীর পানি বন্টন নিয়ে সমস্যা রয়েছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এই নদী ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে।

সীমান্তজুড়ে আন্ত:সীমান্ত ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ সামাল দিতে ভারতের ব্যাপকভাবে বাংলাদেশী সহযোগিতা প্রয়োজন। ইসলামী জঙ্গিদের সীমান্ত পারি দিয়ে ভারতে প্রবেশ ঠেকাতে সহযোগিতার জন্য নয়া দিল্লি শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশও ইসলামী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি অবলম্বন করছে।

ঢাকা ভারতের সার্বিক বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের প্রশংসা করলেও তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে নয়া দিল্লির আচরণে হতাশ। পশ্চিমবঙ্গ যতদিন নরম না হবে ততদিন এই যন্ত্রণা থেকে যাবে।

মধুচন্দ্রিমায় ছেদ ঘটিয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুঃ ভারত-বাংলা সম্পর্কে সর্বশেষ টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশকে হতাশ করে দিয়ে মিয়ানমারের অং সাং সু চি সরকারের পক্ষ নেয় ভারত। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী যে অভিযান চালাচ্ছে তাও অনুমোদন করে নয়া দিল্লি।

এখন পর্যন্ত ভারত মনে করছে যে রাখাইন রাজ্যে সমস্যার জন্য পাকিস্তান ও সৌদি আরবের তহবিলপুষ্ট জঙ্গিগ্রুপ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) দায়ি।

তবে, বাংলাদেশের ক্ষোভ আঁচ করতে পেরে নয়া দিল্লি তা প্রশমনের চেষ্টা চালায়। বাংলাদেশে নতুন করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সামগ্রি পাঠায় ভারত। বাংলাদেশ ত্রাণ গ্রহণ করলেও ভারতকে বলেছে যেন দেশটি তার প্রভাব খাটিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করে।

তবে, এখন পর্যন্ত ভারত ওই পথে অগ্রসর হয়নি।

Comments

comments