সাদা কালোর বিভেদ মুছে দেয়া অলিম্পিক

24
অলিম্পিক
Olympische Spiele 1936 in Berlin, Siegerehrung im Weitsprung: Mitte Owens (USA) 1., links: Tajima (Japan) 3., rechts Long (Deutschland) 2., Zentralbild/Hoffmann

উসাইন বোল্ট তার রেকর্ড দিয়ে নিজেকে সর্বকালের সেরা স্প্রিন্টার প্রমাণ করে ফেললেন। মাইকেল ফেল্পস যে পরিমান সোনা জিতেছেন তা দুনিয়ার বেশীরভাগ দেশ পায়নি, কিন্তু খেলাধুলা আসলে খালি পারফরম্যান্স না। খেলা অধিকার আদায়ের, শোষনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার। তাই এই দারুন দুইজন অলিম্পিয়ানকে দেখে আমরা বিস্মিত হই কিন্তু সম্ভবত যেই মানুষটা অলিম্পিকের আসল চেতনা তুলে ধরতে পেরেছিলেন তিনি হচ্ছেন জেসি ওয়েন্স। আজ থেকে ৮০ বছর আগে বার্লিণ অলিম্পিকে তার অমর কীর্তি আজো অলিম্পিকের সবচেয়ে প্রেরণাদায়ী কাহিনী। এই গ্রেটেষ্ট এভার অলিম্পিয়ান এর বায়োগ্রাফিকাল মুভি ‘রেস’ মুক্তি পেয়েছে এই বছরের গোড়ায় আর সেটি দেখতে গিয়েই জানতে পেলাম আরেক কীর্তিমান এর কথা, কোন স্বর্ণপদক না জিতেও যার মর্যাদা জেসির থেকে কম নয়। জেসির প্রিয়তম বন্ধু, জার্মান এথলেট লুটজ লং, যার সমন্ধে জেসি বলেছিলেন যে আমাদের বন্ধুত্ব খাটি ২৪ ক্যারেটের। আমার পাওয়া সব স্বর্ণপদক গলিয়ে যে সোনা হবে সেগুলো ওর সাথে বন্ধুত্বের তুলনায় তুচ্ছ।

জেসি সমন্ধে সবাই জানে, যে বার্লিণ অলিম্পিক হিটলার তার নাজি শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর জন্য আয়োজন করেছিল, সে যাবত সবচেয়ে খরুচে, চোখ ধাধানো সেই আয়োজনের পুরো আলো কেড়ে নেন জেসি। কালো চামড়ার এই মানুষটি, যিনি নিজের দেশেই গায়ের রং এর জন্য নিগৃহীত হতেন, তিনি হিটলারকে খেলো বানিয়ে দেন। তার পারফরম্যান্সে নাজি আদর্শে আসক্ত জার্মানরাও করতালিতে স্টেডিয়াম মুখরিত করতো। হাজার তত্ব আর রাজনীতির চেয়ে জেসি খেলা দিয়েই সেই ১৯৩৬ সালে বর্ণবাদকে কাচকলা দেখিয়েছিলেন।

সেই ১৯৩৬ সাল, যখন ইউজেনিক্স নামক এক অপচর্চার মাধ্যমে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়েই কালোদের ছোট করা হতো। ভাবা হতো যে কালোরা আসলে ‘নিম্নশ্রেনীর প্রাণী’।  সামাজিকভাবে ছোট তো করা হতোই, এমনকি জেসি সোনা জেতার পরও তাকে যথাযথ মর্যাদা দূরে থাক তাকে মানুষের সম্মানও দেয়া হয়নি।  সাদাদের মহত্তর দেখানো হতো এমনকি চার্চের সরাসরি আদেশেও। চার্চ নিজে দাস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতো। কিন্তু জেসি  ১০০ মিটার, ২০০ মিটার, ৪*১০০ মিটার রিলে আর লং জাম্পে সোনা জিতলেন। পরের দুটি অলিম্পিক বিশ্বযুদ্ধের জন্য হয়নি, হলে জেসি কি করতেন সেটা আমরা অনুমান করতে পারি।

অন্য খবর  অলিম্পিকে ক্রিকেট রাখার দাবি শচিন-ওয়ার্নের

কিন্তু লং জাম্প, যেটি জেসির খুব প্রিয় ইভেন্ট ছিল না, যেটির জন্য তিনি খুব বেশী প্র্যাকটিস করতেন না, সেখানে যা ঘটলো তা ক্রীড়া ইতিহাসের সেরা ঘটনাটির জন্ম দিল। জার্মান লুটজ লং, যিনি তখন ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন, যেই সাদা চামড়ার আর্য এথলেটের জন্য গোটা মাঠ উদ্বেলিত, তিনি হিটের  দ্বিতীয় লাফেই নতুন ইউরোপীয় রেকর্ড গড়লেন আবারো। ওদিকে জেসি প্রথম দুই লাফেই দাগ পার হয়ে লাফ দেয়ায় ফাউল করে বসলেন। তৃতীয় লাফে যদি তিনি একই কাজ করেন তবে তিনি ফাইনালে কোয়ালিফাইই করতে পারবেন না, সোনা জেতা দুরের কথা।

তখন লং করলেন, কি একটা রুমাল দাগের কিছুটা পিছনে রেখে জেসিকে বললেন এখান থেকেই লাফ দাও ( অনেকটা ক্রিকেট খেলায় বোলার নো বল এড়াতে যেভাবে ক্রিজের বেশ পেছন থেকে বল করেন)। যেহেতু জেসি অনেক বেশী দুরত্ব পার হতে পারতেন ঐ কয়েক সেন্টিমিটার পেছনে থেকে লাফ দিয়েও তিনি অনায়াসে কোয়ালিফাই নিশ্চিত করেন এবং লং কে ধন্যবাদ দেন।

ফাইনালে লং আবার রেকর্ড করলেন, জেসি প্রথম লাফেই সেটি অতিক্রম করলেন। লং দ্বিতীয় লাফে সেটি ডিঙ্গালেন, নতুন রেকর্ড করলেন ৭.৮৭ মিটার আর দর্শকদের পাগল করে দিয়ে অনবদ্য এক প্রতিযোগীতায় জেসি তার দ্বিতীয় লাফে সেটিও উতরে করলেন ৭.৯৪ মিটার । এবার দুইজনের একটা করে লাফ বাকি।

অলিম্পিক

চরম এন্টি ক্লাইম্যাক্স এর মাধ্যমে তৃতীয় লাফ দিতে গেয়ে লং পেশীতে টান খেয়ে বসে পড়লেন আর জেসি জিতে গেল। কিন্তু এখানেই আসল কাহিনী শুরু হলো। লং এসে জেসিকে অনুরোধ করলেন তুমি জিতে গিয়েছ তবুও শেষ লাফটি দাও, আমি তোমার সেরাটা দেখতে চাই। জেসি ঠিক তাই করলেন। তিনি পার হলেন ৮.০৬ মিটার।

আর তারপরে জেসিকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন লং। সাদা আর কালো দুই বন্ধু, দুই চ্যাম্পিয়ন পুরো মাঠ দৌড়লেন হাতে হাত ধরে। ভাবা যায় হিটলার কি চিন্তা করছিলো তখন! কতটা ক্ষুদ্ধ ছিল সে! জেসি যা করেছে করেছে, তার নিজের দেশের ছেলে লং তার ঘৃন্য নীতিকে কি অবলীলায় মিথ্যা প্রমাণ করলো। আর পরাক্রমশালী হিটলারের সেই মনোভাব বুঝেও লং যে সেটা করতে পেরেছিলেন তাই তিনি একজন চ্যাম্পিয়ন। যেইরকম চ্যাম্পিয়ন এখনকার দিনে ওয়াল স্ট্রিট আর বার্সালোনার রাস্তায় কালো মানুষের বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদীরা, আলজেরিয়ায় ফরাসী অগ্রাসনের প্রতিবাদ করা ফরাসী যুবকরা। প্যালেস্টাইনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ইহুদীরা, অর্থাৎ যারা জাতপাত, বর্ণ বৈষম্য উঠিয়ে দিতে চান তারা।

অন্য খবর  মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা শুরু

জেসি কালো মানুষ, সে তার অধিকারের জন্য লড়াই করেছে, কিন্তু সে লড়াইয়ে একজন সাদা মানুষ লং এর পাশে দাঁড়ানোটা তাকে উৎসাহ দেয়। শুধু তাই না, সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা দেয় তা হচ্ছে, কালো মানুষের অধিকার আদায় মানে সাদা মানুষকে ঘেন্না না। বরং সাদা কালোর বৈচিত্র্যর রংধনু হলেই কেবল এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব। দেশ আর জাতির বিভাজনেও এটি সত্য। যুদ্ধংদেহী শাসকগোষ্ঠী কেবল অপর দেশের মানুষকে শোষণ করে না, সে তার নিজের মানুষকেও শোষণ করে। হিটলার কেবল ইহুদী আর কালোদের আতঙ্ক ছিলো না, সে লং এর জন্যও ছিল বিভীষিকা। আর এইসব হিটলারদের পতনের জন্য জেসির লড়াই কেবল নয় দরকার লং এরও সমর্থন।

জেসি আর লং এর এই বন্ধুত্ব আমাদের জন্য শিক্ষা। যে কৃত্রিম বিভাজন দিয়ে আমাদের ঘেন্না করতে শেখানো হয় তার মূলে চপেটাঘাত। জেসিরা আর লংরা একসাথে হাটলে দুজনেরই জয় হয়, পরাজয় হয় হিটলারের। বাংলাদেশী আর ভারতীয়রা মিলে এক হয়ে লড়াই করলে জয় হয় সুন্দরবনের, মানুষের, পরাজয় হয় অত্যাচারী শাসকদের। মুসলিম, ইহুদী আর খ্রিষ্টানেরা হাতে হাত ধরে থাকলে জয় হয় মানবতার, পরাজয় হয় দানবের।

জেসি আমার চিরকালের নায়ক, প্রেরণার উৎস, আর মাত্র ৩০ বছরেই যুদ্ধে মারা যাওয়া লং আমার কাছে চ্যাম্পিয়ন।

Comments

comments