রাফি ভাটের মৃত্যুতে শোকে স্তম্ভিত কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

51
রাফি ভাট

বিদ্রোহী দমনের নামে ভারতীয় বাহিনীর চালানো নিরাপত্তা অভিযানে কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স্ট পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রিয় শিক্ষককে হারিয়ে শোকে স্তম্ভিত শিক্ষার্থীরাও। রবিবার (৬ মে) রাফির মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে থেমে থেমে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছিলেন তারাও।

রবিবার (৬ মে) দক্ষিণ কাশ্মিরে বিদ্রোহী দমনের নামে পরিচালিত ভারতীয় বাহিনীর নিরাপত্তা অভিযানে নিহত হন ৩৩ বছর বয়সী রাফি ভাট। কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চুক্তিভিত্তিক সহকারি অধ্যাপক ছিলেন তিনি। কাশ্মির পুলিশের দাবি, রাফি কাশ্মিরের সবচেয়ে সক্রিয় বিদ্রোহী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীনে যোগ দিয়েছিলেন। এ সংগঠনটিকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে কাশ্মির পুলিশ।

রাফি ভাটের বাড়ি মধ্য কাশ্মিরের গন্দেরবাল জেলার চুন্দিনা এলাকায়। রবিবার সন্ধ্যায় হাজারো শোকাহত মানুস তার বাড়িতে জড়ো হন। শিক্ষার্থীরাও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রিয় শিক্ষার্থীর মরদেহ দেখার জন্য তার বাড়িতে অপেক্ষা করছিলো। এক পর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা রাফির বুলেটবিদ্ধ মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন। তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশের। প্রতি দশ মিনিট পর পর এক এক জন শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়ছিলো।

গত শুক্রবার এ শিক্ষার্থীরাই প্রিয় শিক্ষক রাফিকে একটি হাত ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। রাফি শিক্ষার্থীদের জানিয়েছিলেন, তিনি হায়দারাবাদে অন্য একটি অ্যাসাইনমেন্টের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছেন। তবে তার এ যাওয়াই যে শেষ যাওয়া হবে তা ভাবতে পারেননি শিক্ষার্থীরা।

অন্য খবর  সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার ভুয়া প্রমাণ উপস্থাপন করেছে আমেরিকা: রাশিয়া

কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মালিক আব্দুল মোমিন। রাফি সম্পর্কে ফার্স্ট পোস্টকে তিনি বলেন, ‘তিনি যতোটা না আমাদের শিক্ষক ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বন্ধু ছিলেন, পথ প্রদর্শক ছিলেন।’

মাস্টার্স ও এমফিল ডিগ্রিধারী রাফি ২০১৭ সালে পিএইচডি শেষ করেন। ডিগ্রি লাভের আগেই কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়াচ্ছিলেন রাফি ভাট।  কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান পীরজাদা আমিনও রবিবার রাফির জানাজায় অংশ নেন। তিনি কেবল রাফির সহকর্মীই নন, তার শিক্ষকও। পীরজাদা আমিন ফার্স্ট পোস্টকে বলেন, ‘ও (রাফি) শুধু মেধাবী শিক্ষার্থীই ছিল না, একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকও ছিল।’

শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শেষ দুটি লেকচার দিয়েছিলেন রাফি। এর একটি ছিল ভারতীয় সমাজ নিয়ে। আর আরেকটি ছিল পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম নিয়ে। ওইদিনই দুপুর তিনটা ছয় মিনিটের দিকে ফেসবুকে একটি কবিতা পোস্ট করেন রাফি। ওই কবিতাটি রাফিরই এক শিক্ষার্থী তাকে উৎসর্গ করেছিলেন। ওই কবিতা পোস্ট করতে গিয়ে রাফি লিখেছিলেন, ‘আমার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া উপহার। তোমাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার কথা আমার মনে থাকবে। আল্লাহ তোমাদের সবাইকে ভালো রাখুক।’ ফেসবুক পোস্টটি দেওয়ার ২৫ মিনিট পর নিখোঁজ হন রাফি ভাট।

অন্য খবর  ২০ ঘণ্টায় কিরকুকের নিয়ন্ত্রণ নিল বাগদাদ

শনিবার সকালে তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে জানায় তার পরিবার। রাফি ভাট অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তার নিখোঁজ হওয়ার কথা জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। উপাচার্য প্রতিবাদীদের সঙ্গে দেখা করে তাদের শান্ত করেন। আশ্বাস দেন, নিখোঁজ অধ্যাপককে খুঁজে বের করার জন্য সব রকম চেষ্টা করা হবে। পুলিশের ডিজিকেও এ ব্যাপারে চিঠি দিয়েছিলেন উপাচার্য। রবিবার (৬ মে) সকালে ছেলের কাছ থেকে প্রথম ফোন কলটি পান রাফির বাবা ফায়াজ আহমেদ ভাট। ফোন কানে দিতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে রাফির কণ্ঠ- ‘যদি কষ্ট দিয়ে থাকি, দুঃখিত। এটা আমার শেষ ফোন কল। আমি আল্লাহর কাছে যাচ্ছি।’ এদিনই ভারতীয় বাহিনীর অভিযানে নিহত হন রাফি ভাট।

উল্লেখ্য, কাশ্মিরে সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর কেউ কেউ সরাসরি স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত। কেউ কেউ আবার কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অঙ্গীভূত করার পক্ষে। ইতিহাস পরিক্রমায় ক্রমেই সেখানকার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইসলামীকিকরণ হয়েছে। এখন সেখানকার বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর মধ্যে হিজবুল মুজাহিদীন সবথেকে সক্রিয়। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কাশ্মিরের জাতিমুক্তি আন্দোলনকে বিভিন্ন জঙ্গিবাদী তৎপরতার থেকে আলাদা করে শনাক্ত করে না। সন্দেহভাজন জঙ্গি নাম দিয়ে বহু বিদ্রোহীর পাশাপাশি বেসামরিকদের হত্যার অভিযোগ রয়েছে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে।

Comments

comments