যেভাবে লেখা হলো ‘দি রিমেইন্স অব দি ডে’ : কাজুও ইশিগুরো

63

কাজুও ইশিগুরো মাত্র ৭টি উপন্যাস লিখে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। লিখিত উপন্যাসের মধ্যে বুকার পুরস্কার বিজয়ী ‘দি রিমেইন্স অব দি ডে’ উপন্যাসটি অন্যতম। ২০১৪ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় লিখিত এক নিবন্ধে তিনি জানান, কীভাবে গায়ক টম ওয়েটস এর ‘রুবি’স আর্মস’ গানটি তাঁকে উপন্যাসটি শেষ করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। লেখাটি ভাষান্তর করেছেন- মিলন আশরাফ

বেশিরভাগ মানুষকেই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়। উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে একটা ঐক্যমত ধারণা রয়েছে যে, প্রতিদিন চারঘণ্টা লিখলেই চলে। এরচেয়ে বেশি সময় ব্যয়, লেখার শক্তিকে কমিয়ে ফেলে। আমিও সেটাই করে আসছিলাম। চারঘণ্টার কম বেশি হতো কখনো সখনো। কিন্তু ১৯৮৭-এর এক গ্রীষ্মে আমাকে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে দৃঢ় হতে হল। বলা যায় প্রয়োজন দেখা দিল। এই বিষয়ে আমার স্ত্রী লোরনার সঙ্গে আলাপও করলাম বিস্তর।

আজ থেকে পাঁচ বছর আগে চাকুরি ছেড়েছিলাম। এরপর লেখালেখি চালিয়ে গেলেও সেটা ছিল খুব ধীর গতিতে। জনপ্রিয়তার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় উপন্যাস লেখার সময়। মনে মনে একটা ক্ষোভও তৈরি হয়েছিল। ক্যারিয়ার বৃদ্ধি করার জন্য কিছু কার্যকর প্রস্তাবও পেয়েছিলাম। কিন্তু এসব প্রস্তাব যেমন, ডিনারের দাওয়াত, লোভনীয় বিদেশ ভ্রমণ, এবং বিপুল পরিমাণে ইমেইল আমার সঠিক কাজকে ব্যাহত করল। গত গ্রীষ্মে নতুন উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় লিখেছিলাম। প্রায় এক বছর পরেও আমি আর এগোতে পারিনি।

তাই লোরনার সঙ্গে মিলে একটি পরিকল্পনা করলাম। চার সপ্তাহের জন্য নির্দয় হয়ে ডায়েরি পরিষ্কার করে বিরতিহীনভাবে লেখা শুরু করলাম। কিছুটা প্রহেলিকাপূর্ণ এই বিষয়টিকে আমরা ‘ক্রাশ’ খাওয়া বলি। ক্রাশ খাওয়ার এই সময়ে লেখা বাদে সব ধরনের কাজ করা থেকে বিরত রাখলাম নিজেকে। সকাল ৯টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত লিখতাম। সোমবার থেকে শনিবার। শুধু দুপুরে খাওয়ার সময় এক ঘণ্টা এবং রাতের জন্য দুই ঘণ্টা বিরতি নিতাম। এই সময়টাতে কোনকিছুতে খেয়াল রাখতাম না। মেইলের উত্তর এমনকি ফোনের কাছেও যেতাম না। কেউ বাড়িতে আসতো না। যদিও লোরনা তার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, তবুও রান্না ও ঘরের কাজে আমাকে সে সাহায্য করতো। আমরা ধারণা করেছিলাম এইভাবে হয়তো বেশি কাজ শেষ করতে পারবো না, কিন্তু আমি মানসিকভাবে এমন এক জগতে পৌঁছতে পারবো যেখানে আমার কাল্পনিক পৃথিবী হবে বাস্তবের চেয়েও বাস্তব।

আমার বয়স তখন ৩২। দক্ষিণ লন্ডনের সাইডেনহামে বাসা ঠিক করেছিলাম আমরা। সেখানে জীবনের প্রথমবারের মতো পড়াশুনাতে মনোযোগি হলাম খুব। ব্রাকেটে বলি, আমার প্রথম দুটি উপন্যাস কিন্তু লিখেছিলাম ডাইনিং টেবিলে বসেই। ঘরে আধশোয়া একটি বড় আলমারি ছিল। ঘরের একটি দরোজা ছিল না। কিন্তু আমি আমার কাগজপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখার জন্য বড় জায়গা পেয়েছিলাম। কাগজগুলো ছড়িয়ে রাখতাম চারপাশে। আর প্রার্থনা করতাম যেন দিনের শেষে এগুলো পরিষ্কার না করা হয়। পুরো দেয়ালজুড়ে চার্ট ও নোট লিখে রাখতাম। প্রয়োজনীয় লেখার উপাদান সেখান থেকে টুকে নিতাম।

অন্য খবর  মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজের ইতিহাস

মৌলিকভাবে এভাবে লেখা হচ্ছিল ‘দি রিমেইন্স অব দি ডে’। বিধ্বস্ত হয়ে আমি শুধু খোলা হাতে লিখেই গিয়েছিলাম। এটা লেখার সময় কোনো শৈলি অনুসরণ করিনি আমি। দেখা যাচ্ছিল সকালে যেটা লিখেছি বিকালে সেটার বিপরীতে সাংঘর্ষিক একটা রূপ দাঁড়াচ্ছিল। এগুলো রেখে চোখের সামনে দৃশ্যমান কিছু ধারণা নিয়ে এগোচ্ছিল উপন্যাসটি। ভয়ানক বাক্য, ভীতিকর সংলাপ, দৃশ্যগুলো সব জড়ো করে সেগুলোতে লাঙল চালনা করতাম।

তৃতীয় দিন। লোরনা খেয়াল করলো সন্ধ্যার বিরতির সময়ে আমি অদ্ভুত আচরণ করছি। প্রথম রবিবারের বন্ধে আমি বাইরে বের হওয়ার সাহস করলাম। সাইডেনহামের হাইওয়েতে ঘুরতে ঘুরতে মুখটিপে হাসার সময় লোরনা আমাকে বলল, হাইওয়েটা একটি ঢালুর উপর নির্মিত। মানুষজন নিচে নামার সময় প্রায়ই হোঁচট খায় এখানে। সেইজন্যে এখানে মানুষজন উঁচুতে উঠে নামার সময় ধাপে ধাপে নামতে চেষ্টা করে। পরবর্তী তিন সপ্তাহ আমার সেখানে যাওয়া নিয়ে লোরনা খুব উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু প্রথম সপ্তাহ সাফল্যের সঙ্গে পার হবার পর, আমি তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে আমি সুস্থ আছি মানসিকভাবে।

চার সপ্তাহ ধরে এটি ধরে রেখেছিলাম আমি। শেষ সপ্তাহ শেষে উপন্যাসটি কম-বেশি করে শেষ করি। যদিও এটি ভালোভাবে শেষ করতে আরও সময়ের দরকার ছিল। হঠাৎ করে ক্রাশ খাওয়াতে আমার প্রধান কল্পনা শক্তি দারুণভাবে ব্যাহত হয়।

তবে স্বীকার করি যে, ক্রাশের সময়টা খুব উপভোগ করছিলাম আমি। ওই সময়টাতে প্রচুর পরিমাণে গবেষণা ও পড়াশুনা করি।  যুদ্ধের মধ্যে ব্রিটিশ ঔপেনেবেশিক, রাজনীতি, বিদেশি নীতির ভূমিকা নিয়ে অধ্যায়ন করি। সেই সময়ে বহু ক্ষুদ্র পুস্তিকা ও গদ্য বের হয়, তারমধ্যে একটি হ্যারল্ড লাসকির ‘দি ডেনজারস অব বিইং এ জেন্টেলম্যান’ একটি। আমি স্থানীয় পুরানো বইয়ের দোকানে হানা দিলাম। ১৯৩০ ও ১৯৫০ দশকের ইংরেজদের সম্পর্কে আমার একটা গাইডলাইনের দরকার ছিল। এটার জন্য ঘুরঘুর করতাম সেখানে।

কখন একটি উপন্যাস লেখার সিদ্ধান্ত ও শুরু করতে হবে এটা আমার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সবসময়। একটি গদ্য লেখার আগে কতটুকু প্রস্তুতি দরকার? খুব তাড়াতাড়ি শুরু ও বেশি সময় নেওয়া দুটায় ক্ষতিকর প্রত্যেক লেখার জন্য। তবে এই উপন্যাসটি লেখার সময় আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান ছিলাম। সঠিক সময়ে বিষয়টা আমাকে জেঁকে ধরেছিল যখন কিনা আমি প্রচুর পরিমাণে জানতাম।

অন্য খবর  মহান স্বাধীনতা দিবস আজ

পেছনে তাকালে আমি আমার লেখার সব প্রভাব ও অনুপ্রেরণার উৎস স্পষ্ট দেখতে পাই। সেগুলো থেকে দুটির কথা বলি-

১। ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়। আমি তখন কিশোর। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা পরিচালিত ‘দি কনভারসেশন’ থ্রিলারধর্মী সিনেমাটি দেখি। এখানে জেন হ্যাকম্যান একজন ফ্রিল্যান্স নজরদারি বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় অভিনয় করেন। যার কাজ লুকিয়ে অন্যের কথোপকথন রেকর্ড করা।  হ্যাকম্যান তার কাজের জায়গায় সবেচেয়ে সেরা হতে চায়। কিন্তু তার এই আইডিয়া সে তার সেরা ক্লায়েন্টদের কাছে দেয় এবং সেটা তারা খারাপ কাজে ব্যবহার করে। এমনকি হত্যার কাজেও। আমি মনে করি এই চরিত্রটা আমার উপন্যাসের নায়ক স্টেভেন্স প্রাথমিক পর্যায়ে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে।

২। আমি ভেবেছিলাম উপন্যাসটি লেখা শেষ। কিন্তু এক সন্ধ্যায় টম ওয়েটস এর ‘রুবি আর্মস’ গানটা শুনে ধারণা পরিবর্তন হল। এই গানটি গীতিধর্মী। গানে এক সৈনিক তার প্রিয়তমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে ট্রেনে চেপে দূরে চলে যায়। এটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু গানটি রুক্ষ্ম গলায় গাওয়া হচ্ছিল। যেটাকে আমেরিকান ‘হবো টাইপ’ বলা হয়। আবেগকে তেমন প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে গায়ক ঘোষণা দিচ্ছিল যে, তার হৃদয় ভেঙে গেছে। তার এই চলে যাওয়া অসহনীয়। তার সমস্ত আবেগ বাধা এই রুক্ষ্ম উচ্চারণে কাটিয়ে উঠতে চাচ্ছিল সে। ওয়েটস গানের লাইনগুলো গায়ছিল ক্যাথারটিক (কথাটি গ্রিক শব্দ ক্যাথারসিস থেকে এসেছে। ক্যাথারসিসের বা বিমোক্ষণের মাধ্যমে দুঃখভারাক্রান্ত মন শান্ত ও হালকা হয়, ব্যক্তি ফিরে পায় স্বাভাবিক ভারসাম্য। আবেগ হয় পরিশোধিত- অনুবাদক) মহিমায়। সেই মুহূর্তে আপনি অনুভব করবেন এমন এক কঠিন মানুষকে যে তার সমস্ত দুঃখ-বিষণ্নতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। আমি গানটি মনোযোগ সহকারে শুনে বিপরীত একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি দেখলাম স্টেভেন্স মানসিকভাবে তিক্ততায় নিজেকে শেষ করছে। এখানে একটি পয়েন্ট আমি খুব সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করলাম। সেটি হল, সে তার দৃঢ় প্রতিরক্ষায় আঘাত হানবে, এবং এই স্থান পর্যন্ত তার গোপনীয় দুঃখদায়ক মনের আবেগের আভাস পূর্ণরূপে প্রকাশিত হবে।

Comments

comments