যা আছে ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা বইয়ে?

28

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের অন্দরমহলের নানা ঘটনা সম্বলিত বই ফায়ার এন্ড ফিউরি: ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকান সাংবাদিক ও লেখক মাইক্যাল উলফের এই বইটি প্রকাশের আগেই ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অংশবিশেষ থেকে জানা যাচ্ছে, বিস্ফোরক সব তথ্য রয়েছে বইটিতে। ট্রাম্পের আইনজীবীদের কাছ থেকে মামলার হুমকি পেয়ে প্রকাশক নির্ধারিত সময়ের ৪ দিন আগে বইটি প্রকাশ করেন।
লেখক উলফ বলেছেন, ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ দুই শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারে ভিত্তিতে তিনি বইটি লিখেছেন। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি উলফকে কোনো সাক্ষাতকারই দেননি।
আবার প্রেসিডেন্টেরই মুখপাত্র বলেছেন, ‘সংক্ষিপ্ত’ আকারে দু’ জনের কথা হয়েছে। অনেক সাংবাদিকই বলেছেন, উলফকে গত কয়েক মাস খুব নিয়মিতই হোয়াইট হাউজে দেখা যেত।
ট্রাম্পসহ ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, হোয়াইট হাউজ প্রেস সেক্রেটারি সারা হুকাবে স্যান্ডার্স বইটির অনেক তথ্য ভুয়া বলে নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, সাংবাদিক হিসেবে উলফের বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তার কোনো সূত্র মিথ্যা, সেটি প্রমাণ করতে পারেননি ট্রাম্প। নিচে বইটি থেকে নেয়া কিছু চটকদার তথ্য বর্ণনা করা হল:
১. ২০১৬ সালে ডনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও রাশিয়া-ঘনিষ্ঠ এক আইনজীবীর বৈঠককে ‘রাষ্ট্রদ্রোহমূলক’ ও ‘দেশপ্রেমবর্জিত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন। ব্যাননকে উদ্ধৃত করে বইটিতে লেখা হয়, ট্রাম্প জুনিয়রকে এই ইস্যুতে জাতীয় টিভিতে ডিমের মতো দুমড়েমুচড়ে ফেলা যাবে। উল্লেখ্য, এই তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর ট্রাম্প তার সাবেক মিত্র স্টিভ ব্যাননের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বিবৃতি দেন। ব্যাননকে হোয়াইট হাউজে বেশ ক্ষমতাধর ভাবা হতো। ব্যানন পরে ওই বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চান।
২. রাশিয়া-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরকে জুনিয়র ট্রাম্প তার পিতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নিয়ে যেতে পারেন বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন ব্যানন। তিনি বলেন, ডন জুনিয়র ওই ব্যক্তিদেরকে যে তার বাবার কার্যালয়ে নিয়ে যায়নি, এমন সম্ভাবনা শূন্য।
৩. ট্রাম্প নিজেই নির্বাচনে জিততে চাননি। এমনকি তার প্রচার শিবিরের কেউই ভাবেনি যে, তিনি আসলে জিতবেন। ট্রাম্পের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক্যাল ফ্লিনের এক বক্তব্য থেকে তা বোঝা যায়। ফ্লিন রাশিয়ায় বক্তৃতাদানের জন্য ৪৫ হাজার ডলার গ্রহণ করেছিলেন। তার বন্ধুরা তাকে সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প জয়ী হলে এই বিষয় নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। ফ্লিন তখন তার বন্ধুদের আশ্বস্ত করার সুরে বলেন, হুম, যদি আমরা জিতি তবেই না সমস্যা হবে! অর্থাৎ, ফ্লিন ধরেই নিয়েছিলেন তারা জিতবেন না।
৪. একটি বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ট্রাম্প যখন রাশিয়া সফর করেন, তখন তার ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করে রাশিয়া। তার কক্ষে পতিতা পাঠানো হয়। এবং এসবের ভিডিও রাশিয়ার কাছে আছে। রাশিয়া সফরে গিয়ে ট্রাম্প সোনার তৈরি শাওয়ার বা গোল্ডেন শাওয়ারও ব্যবহার করেছিলেন। এই ধরণের ভয়াবহ ও অদ্ভুত তথ্য সংকলিত করা হয়েছিল এক সাবেক বৃটিশ গুপ্তচরের তৈরি করা ডোশিয়ারে। এ নিয়ে সিএনএন সংবাদ প্রকাশ করে। ওই সংবাদ দেখে ট্রাম্প পাশের কাকে যেন জিজ্ঞেস করেন, গোল্ডেন শাওয়ার কি জিনিস!
৫. ট্রাম্প তার নিজের ব্যক্তিগত গোপন বিষয় নিয়ে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করতেন। কিন্তু, সেগুলো ফাঁস হয়ে গেলে মনক্ষুণœ হতেন। উলফ লেখেন, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে তিনি ফাঁসকারীকে সনাক্ত করতে উঠেপড়ে লাগতেন। যদিও সকল ফাঁস হওয়া তথ্যের উৎস মূলত ট্রাম্পই ছিলেন। সারা দিনরাত বিছানায় শুয়ে তিনি বিভিন্ন ফোনকলে এমন সব মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, যারা তার দেওয়া তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে বাধ্য নয়।
৬. ট্রাম্প তার কর্মীদের সঙ্গে ফোনে কথোপকথনের এক পর্যায়ে হঠাৎ ফোন কেটে দিতেন। দিয়ে তাদের দোষ বের করার চেষ্টা করতেন। যেমন, ট্রাম্প ব্যাননকে বিশ্বাসঘাতক ভাবতেন। তাকে যে দেখতে বিষ্ঠার মতো লাগে, তা তো বলার প্রয়োজনই পড়ে না। রেইন্স প্রিবাস (সাবেক চীফ অব স্টাফ) ছিল অক্ষম। দেখতে ছিল ছোট বামনের মতো। কুশনার (মেয়ের জামাই) তো তেলবাজ। আর শন স্পাইসার (সাবেক মুখপাত্র) তো একটা গাধা। দেখতেও বিচ্ছিরি। কনওয়ে (কমিউনিকেশন্স ডিরেক্টর) একটা ছিঁচকাঁদুনে।
৭. ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ও তার স্বামী জ্যারেড কুশনার একমত হন যে, পরবর্তীতে তাদের কেউ প্রেসিডেন্ট পদে লড়লে, তিনি হবেন ইভাঙ্কাই। এ কথা শুনে অবশ্য ব্যপক হেসেছিলেন ব্যানন।
৮. ট্রাম্পের বহুদিন ধরে ধারণা, তাকে কেউ বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে! এ কারণে তিনি ম্যাকডনাল্ডের খাবার খান। তিনি বলেন, ম্যাকডনাল্ডের খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্য হলো, কেউই জানে না যে তিনি সেখানে খেতে যাচ্ছেন।
৯. ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন হোপ হিকস। তিনি এখন হোয়াইট হাউজের যোগাযোগ পরিচালক। তিনি ট্রাম্পের প্রচার শিবিরের সাবেক ম্যানেজার কোরি লিওন্ডোস্কির সঙ্গে প্রেম করতেন। এ নিয়ে ট্রাম্প তাকে খোঁচা দেন। ব্যাপারটা এতটাই দৃষ্টিকটু ছিল যে, হিকস এক পর্যায়ে দৌড়ে অন্যত্র চলে যান।
১০. হিকস আর ট্রাম্পের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। ট্রাম্পের কাছের লোকজন বলে থাকেন, হিকস হলো ট্রাম্পের মেয়ের মতো। আর ট্রাম্পের আসল মেয়ে অর্থাৎ ইভাঙ্কা যেন তার স্ত্রীর মতো!
১১. প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার পরও সংবিধান সম্পর্কে জানার বা বোঝার কোনো ইচ্ছাই ট্রাম্পের ছিল না। ট্রাম্প শিবিরের সাবেক উপদেষ্টা স্যাম নানবার্গ বলেন, চতুর্থ সংশোধনী পর্যন্ত পড়েই ট্রাম্পের ধৈর্য কুলিয়ে যেত।
১২. ট্রাম্পের প্রথম দিককার ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল স্যালি ইয়াটসের ওপর রাগ ঝাড়তে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতেন ট্রাম্প।
১৩. নিজের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়ে ট্রাম্প নিজেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। শীর্ষ সারির তারকারা তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ নিয়ে তিনি ক্ষুদ্ধ ছিলেন। হোয়াইট হাউজে তার থাকার জায়গা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। এছাড়া তার স্ত্রী মেলানিয়াকে তিনি সবার সামনেই বকাঝকা করতেন। তাকে দেখে মনে হতো, যেকোনো সময়ই তিনি কেঁদে দেবেন।
১৪. নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বারবার মেলানিয়াকে আশ্বস্ত করতেন যে, তিনি নির্বাচনে জিতবেন না। নির্বাচনের রাতে যখন তার অপ্রত্যাশিত জয় নিশ্চিত হলো, তখন মেলানিয়া কাঁদছিলেন। তবে তা আনন্দের কান্না ছিলনা।
১৫. ট্রাম্প কখনো পড়েন না। তার মস্তিষ্ক প্রচলিত ধারায় তথ্য গ্রহণ করতে পারে না। তিনি নূন্যতম কোনো লেখায় চোখও বুলান না।
১৬- ট্রাম্প বন্ধুদের স্ত্রীর সঙ্গে বিছানায় যাওয়ার কথা উল্লেখ করতেন। বইয়ে দাবি করা হয়, ট্রাম্প এটা বলতে পছন্দ করতেন যে, কারও জীবন স্বার্থক কিনা সেটা বোঝার একটা উপায় হলো, তিনি বন্ধুর স্ত্রীদেরকে বিছানায় নিতে পেরেছেন কিনা।
১৭. ট্রাম্প টিভি উপস্থাপিকা জো স্কারবোরো ও মিকা ব্রেনজিন্সকিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ট্রাম্প তাদের বলেছিলেন, আপনাদের বিয়ে করে ফেলা উচিত। তখন কুশনার বলে উঠেন, আমি আপনাদের বিয়ে দিতে পারি। এরপর প্রেসিডেন্ট বললেন, কি? কি বলছো তুমি? তারা তোমার হাতে কেন বিয়ে করতে চাইবে, যখন আমিই তাদের বিয়ে দিতে পারি? যখন খোদ প্রেসিডেন্ট তাদের বিয়ে দিতে পারে?
১৮. প্রেসিডেন্ট বেশ অস্বাভাবিক রুটিন মেনে চলতেন। বইয়ে বলা হয়, তিনি ৬:৩০ এ সাধারণত তিনি স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে ডিনার করতেন। আর তা না হলে, তিনি আরো স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ওই সময়ের মধ্যে বিছানায় শুয়ে চিজবার্গার খেতেন। তার তিনটি টিভির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ফোনকল করতেন।
(নিউজউইক অবলম্বনে)

অন্য খবর  বিতর্কিত প্রধান কর্মকর্তাকে মিয়ানমার থেকে সরিয়ে নিচ্ছে জাতিসংঘ

Comments

comments