মৈনট যেভাবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হল

1529
মৈনট
অখ্যাত ঘাট:

মৈনট মূলত ফরিদপুর থেকে ঢাকা যাওয়া আসার পথে পদ্মার ঘাট। ফরিদপুরের মানুষ পদ্মা পাড়ি দিয়ে মৈনটে এসে এপাড়ে উঠেন। তারপর ঢাকার বাস ধরে ঢাকায় যেতেন। মৈনট এখনকার মত পরিচিতও আগে ছিল না। ভূ-প্রকৃতিও এমন ছিল না। বহুবছরের ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে সৃষ্টি হয় আজকের মৈনট।

মৈনট প্রথম নজরে আসে যখন ২০০৫-০৬ সালের দিকে কার্তিকপুর থেকে মৈনটে যাবার রাস্তা তৈরী করা হয়। মৈনটে রাস্তা বানানো দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত ছিল। তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর লক্ষ্য ছিল এখানদিয়েই পদ্মা সেতু করার।

মৈনট
২০০৮ সালের মৈনট

তখন দোহারের স্থানীয় ভ্রমণপিপাসুরা ঘুরতে যেতেন মৈনটে। বর্ষায় এক অপরুপ সৌন্দর্য্য সৃষ্টি হত সেখানে। দুই পাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি, তার মাঝ চিরে চলে যাওয়া পিচঢালা সড়ক। কিছু পর পর ছোট ছোট সেতু। সেখানে রাস্তার উপর রেস্তোঁরা বসেছিল।  কিন্তু সেই রাস্তা টিকেনি। কয়েক বর্ষায় পদ্মার প্রবল স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সড়ক, সেতুগুলি পর্যন্ত।

আবার মৈনট:

রাস্তা ভাঙলেও ঘাটের ব্যবহার ঠিকই ছিল। পরবর্তীতে আবার তৈরী করা হয় সড়ক। যমুনা পরিবহন পদ্মা পাড়ি দেয়া মানুষজনকে ঢাকা আনা নেয়ার কাজ করে। মৈনট থেকে কার্তিকপুর, আর কার্তিকপুর থেকে বাশতলার সড়ক ছিল ভয়াবহ খারাপ। বাশতলা থেকে কার্তিকপুর যাওয়ার স্মৃতি দোহারের পশ্চিমাঞ্চলের মানুষদের জন্য দুঃস্বপ্ন। এই নিয়ে নিউজ৩৯.নেট সহ পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। সম্প্রতি রাস্তা সংস্কার করা হয়েছে।

অন্য খবর  জামাই-শাশুড়ির প্রতারণার ফাঁদ: জয়পাড়া থেকে টাকাসহ দুজনই আটক
ছোট কক্সবাজার:

মৈনটকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করার পুরো কৃতিত্ব যার তিনি হলেন প্রয়াত মাহমুদ হাসান খান। তিনিই মৈনটকে “ছোট কক্সবাজার” নাম দিয়েছিলেন। মাহমুদ হাসান খান তার দলবল নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন, তার সবই খ্যাতিমান পর্যটন স্পট ছিল না, তিনি গ্রামাঞ্চলে অখ্যাত সব যায়গায় যেতেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনিই মৈনটের খোঁজ পান। মৈনটের ছোট্ট সৈকত দেখে তিনি নাম দেন ছোট কক্সবাজার।

তারপর ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারী তার দল নিয়ে প্রথম অফিশিয়াল ভ্রমণ করেন। তারপর থেকেই পরিচিতি পেতে থাকে “ছোট কক্সবাজার”। একই বছর ২৪ অক্টোবর আবার আসেন মৈনটে

২০১৬ সালে বাংলা ট্রিবিউনকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন,

আমি নিজেই দেশের বেশ কয়েকটি আনকমন জায়গাকে ট্যুর করে পরিচিত করেছি। এখন অন্য অনেকে সেখানে ঘুরতে যাচ্ছে। দোহারের মৈনট ঘাট নামে একটি জায়গা রয়েছে।  ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসেবে সেখানে ঘুরে যাওয়া যেতে পারে এই চিন্তা বোধ হয় আমি প্রথমে করেছি। বছর তিনেক আগে আমি সেখানে বড় একটি গ্রুপ নিয়ে যাই। তারা স্থানটাকে খুবই পছন্দ করেন। আমরা স্থানটার নাম দিয়েছি ছোট কক্সবাজার।  জায়গা অনেকটা সমুদ্র সৈতকের মতো। পরে আমি একাধিকবার সেখানে লোকজন নিয়ে গিয়েছি। এখন দেখছি প্রত্যেক সপ্তাহেই অনেকেই সেখানে যাচ্ছেন।

এছাড়া তিনি মেঘনার মায়াদ্বীপ, পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাগান, বরিশালের উজিরপুর সাতলার শাপলা বিলকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করেন।

অন্য খবর  সুতারপাড়ায় বিদ্যুতস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু
এসময়ের পর্যটন আকর্ষণ মৈনট
২০১৬ সালে মৈনট, দোহার, ঢাকা
জাতীয় পরিচিত:

বেড়াই বাংলাদেশের টৃপে ঘুরে আসা মানুষদের শেয়ার করা ছবিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভ্রমণপিপাসুদের নজরে আসে। শুরু হয় মৈনট নিয়ে লেখালেখি। মৈনটে কীভাবে যাওয়া যায়, সেখানে কী আছে দেখার এসব নিয়ে লেখালেখি। মৈনটে যাবার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে লেখা প্রতিবেদন ভাইরাল হয় মিডিয়ায়। বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশ হতে থাকে মৈনট নিয়ে লেখা। দিনে দিনে বাড়তে থাকে ঢাকা থেকে আসা পর্যটক। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় মৈনট নিয়ে অন্তত একটি লেখা আছে।

মৈনট এখন দোহারের আইকন। ঢাকা জেলার এক নাম্বার উপজেলা হয়েও যে দোহার আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগত, মৈনট সেই দোহারকে এনে দিয়েছে জাতীয় পরিচিতি। মৈনটের কল্যাণে এখন সবাই দোহারকে চিনে। বলা যায় ভ্রমণপিপাসুরা অন্তত একবার হলেও দোহারে এসেছেন।

মৈনটের আসল সৌন্দর্য হল সূর্যাস্ত, কিন্তু ঢাকা শহর থেকে আসা পর্যটকরা দিনের আলো থাকতেই রওনা দেন। যার কারণে তারা পদ্মার মোহনীয় সূর্যাস্ত থেকে বঞ্চিত হন। ঢাকা যাবার পথ আরও নিরাপদ ও আরও কম সময় লাগলে তারা এই সৌন্দর্য উপভোগ করে যেতে পারতেন।  আগামীতে হয়তো সেটিও হবে।

Comments

comments