মুক্তিযুদ্ধে দোহার-নবাবগঞ্জের নক্ষত্রঃ ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী

256

মুক্তিযুদ্ধে দোহার-নবাবগঞ্জের নক্ষত্র; মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের সিপাহসালার ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী ১৯২৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার এলাচিপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর ১৯৫০ সালে সেনা বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহন করেন। দক্ষ সেনা অফিসারের সুনাম থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তান বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহনের পথ বেছে নেয়ার জন্য সেনাবাহিনীর চাকুরী ছেড়ে দিয়েছিলেন অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে।

ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর জীবনের সর্ব শ্রেষ্ঠ অর্জন ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালী জাতির স্বাধীনতার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের কালো রাতে রাজধানী ঢাকায় ভয়াবহ গণহত্যা শুরু করে। এ খবর ঐ রাতেই পৌঁছে যায় মানিকগঞ্জের স্বাধীনতাকামী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে। সে সময়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ২৫ মার্চ রাতেই জরুরী বৈঠকে বসেন তৎকালীন মানিকগঞ্জের মহকুমা প্রশাসকের অফিসে। সে বৈঠকে আমন্ত্রন জানানো হয় ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীকে। ক্যাপ্টেন অব্দুল হালিম চৌধুরী সাথে সাথে যোগ দেন ঐ সভায়। সভায় পাক হানাদারদের প্রতিহত এবং মানিকগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয় এবং ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী কে মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য দায়িত্ব গ্রহনের অনুরোধ জানানো হয়। ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সে দায়িত্ব গ্রহন করেন।

১৫ এপ্রিল – আগস্ট ১৯৭১সংগঠক করা হয় অধিনায়ক ক্যাপ্টেন (অবঃ) আব্দুল হালিম চৌধুরী (সমগ্র মানিকগঞ্জ জেলা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ যথা নবাবগঞ্জ দোহার থানাসহ ঢাকা পশ্চিম অঞ্চলের ২২ টি থানা।সহ-সংগঠক হন সহ-অধিনায়ক আব্দুল মতিন চৌধুরী (সেকেন্ড ইন কমান্ড) অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ চান মিয়া (সেকেন্ড ইন কমান্ড)

অন্য খবর  বিদায় নিলেন সিরাজুল ইসলাম; দায়িত্ব বুঝে নিলেন সাজ্জাদ হোসেন

অপারেশনের স্বার্থে কয়েকটি থানা নিয়ে একটি ইউনিট গঠন করা হয়ঃইউনিট কমান্ডারবৃন্দঃ

১. প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ চান মিয়াঃ হরিরামপুর-শিবালয়-ঘিওর-দৌলতপুর অঞ্চল। ২. তোবারক হোসেন লুডুঃ সিঙ্গাইর-মানিকগঞ্জ-সাটুরিয়া-সাভার অঞ্চল। ৩. সিরাজউদ্দিনঃ নবাবগঞ্জ-দোহার-কেরানীগঞ্জ।

২৫ মার্চ রাতে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর দক্ষিণ সেওতার বাসভবন সংলগ্ন তাঁরই মালিকানাধীন কোল্ডস্টোরেজ(আলুর গুদাম) বসে মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠণ করা হয়। এ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্র জনতাকে সাথে নিয়ে ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে তৎকালীণ মহকুমা ট্রেজারী ভবনের তালা ভেঙ্গে লুট করা হয় ২৬ টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল এবং প্রচুর গুলি। লুটে নেয়া হয় দেবেন্দ্র কলেজের তৎকালীন ইউওটিসির ড্যামি রাইফেলগুলোও । এর সাথে যোগ হয় ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর লাইসেন্স করা নিজস্ব আগ্নেয়াস্ত্র । এ লুট করা অস্ত্র এবং ড্যামি রাইফেল দিয়ে প্রথমে এসডিও অফিসের সামনে পরে তাঁর আলুর গুদাম চত্তরে শুরু হয় অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ। এ সব প্রশিক্ষণের দায়িত্বও তিনি নিজে পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার আহবান জানিয়ে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন এলাকায় খবর পাঠানো হয় অবসরপ্রাপ্ত এবং ছুটিতে আসা বাঙালী সেনা অফিসার,সিপাহী,পুলিশ,ইপিআরসহ সংগ্রামী তরুণদের। সাড়াও মেলে অভাবিত। হানাদার বাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে তাঁরই নেতৃত্বে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো এবং তরা এবং আরিচা ফেরিঘাটের ফেরিগুলো সড়িয়ে ফেলা হয়।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে কামান বিমান বাহিনী সহায়তায় বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানী সৈন্যরা মানিকগঞ্জ শহর দখল করে নিলে। গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা হরিরামপুরে গ্রাম এলাকায় চলে যান এবং হরিরামপুরের বিভিন্ন এলাকায় চালু করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। এরপর ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্ব এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় গেরিলা কৌশলে পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে মরণপণ মুক্তি সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীকে ২ নং সেক্টরের অধীনে মানিকগঞ্জ মহকুমা,মুন্সিগঞ্জ মহকুমা,ঢাকা সদর উত্তর ও দক্ষিণসহ ২২ থানার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সাব সেক্টর কমাণ্ডার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এই অসীম সাহসী বীরযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

অন্য খবর  মেঘুলায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া

শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয় জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর ছিল কর্মময় বর্ণাঢ্য জীবন। সেনা বাহিনী থেকে স্বেচ্ছা অবসরের পর ১৯৬৬ সালে ন্যশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) তে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। পরবর্তী পর্যায়ে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেই গঠন করেন ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টি, পরবতর্তীতে যোগ দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে। আব্দুল হালিম চৌধুরী ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবং একই সালের ১৫ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সিপাহসালার ১৯৮৭ সালের ৭ অক্টোবর পরলোক গমন করেন।

Comments

comments