মীমের বাসায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী; ‘প্রধানমন্ত্রীও মর্মাহত বিচারে কেউ বাধা হতে পারবে না’

61
আসাদুজ্জামান খান কামাল

বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িতদের অবশ্যই বিচার হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। চালক বা পরিবহনকর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নৌমন্ত্রী শাজাহান খান কোনো প্রভাব খাটাতে পারবেন না বলেও জানান তিনি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজধানীর মহাখালীতে দিয়া খানম মীমের বাসায় যান। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নিহত মীমের বাসায় যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নিজেও মর্মাহত বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ‘সেইফ ঢাকা’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

গতকাল সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মীমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম, মা রোকসানা বেগমসহ পরিবারের সবাই। তাঁরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অপরাধীদের শাস্তি কামনা করেন। পরিবারের সদস্যরা বলেন, মীমকে তো আর পাওয়া যাবে না। যদি অপরাধীদের শাস্তি হয়, তাহলে অন্তত সান্ত্বনাটা পাওয়া যাবে। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেন। এ ছাড়া গতকাল সকালে মীমের বাসায় তার সহপাঠীরাও গিয়েছিল। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে ঘটনাস্থলে বিমানবন্দর সড়কে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ও অর্ধেক ভাড়ায় বাসে যাতায়াতের অনুরোধ জানায়।

মীমদের বাসা থেকে বেরিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গাড়িটির চালক অদক্ষ ছিল কিংবা গাড়িটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল বলে শোনা যাচ্ছে। এটা কেন, কিভাবে হলো সেটা দেখে তার বিচার করব। ইতিমধ্যেই শুনেছেন বাসটি জব্ধ হয়েছে, চালককে ধরা হয়েছে। তার লাইসেন্স আছে কি না সেটাও দেখব। কারণ চালকের লাইসেন্স নেই বলে শোনা যাচ্ছে।’

এ ঘটনার বিচারে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন—এমন সংশয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কারও বিরোধিতা এ ঘটনার বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে না। মন্ত্রী শাজাহান খান সাহেব আমাদের সরকারের অংশ। পরিবহন খাতের শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন তিনি। তিনিও বলছেন, এর বিচার করতে হবে। উনি বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দেবেন—এমনটি হতেই পারে না। তিনি বাধা দেবেন বলে যেই প্রসঙ্গটা আসছে আমার মনে হয় এই বাধায় কোনো কাজ হবে না। এটার উপযুক্ত বিচার হবেই।’

অন্য খবর  একই গোষ্ঠী ভিন্ন নামে নাশকতা করছে: আসাদুজ্জামান খান কামাল

আরেক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যারাই দায়ী, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রচলিত যে আইন আছে, সে অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সাংবাদিকদের অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জাবালে নূর বাসে যান্ত্রিক ত্রুটি থাকার কথা জানা গেছে। বাসটির রুট পারমিট ও চালকের লাইসেন্স ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিকেলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘মীমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম যে এলাকায় থাকেন এটি আমার নির্বাচনী এলাকা। তাই সেখানে গিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রীও আমাকে যেতে বলেছিলেন। দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনাটি দুঃখজনক। আমরা মর্মাহত। প্রধানমন্ত্রীও দুঃখ পেয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন। সে কারণে তিনি আমাকে পরিবারটির খোঁজখবর নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা বা পাল্লাপাল্লি করা, যে কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটুক তা খুঁজে বের করা হবে। যে কারণে বা যার কারণে ঘটনা ঘটেছে তাদের শাস্তি পেতে হবে। এই নৈরাজ্যের প্রতিকার হওয়া উচিত।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। গাড়ির চালক হেলপারদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যার গাফিলতিতেই এ দুর্ঘটনা ঘটল, তাকে শাস্তি পেতে হবে।’

অন্য খবর  দোহারে আলীগ প্রার্থীর পক্ষে জেলা নেতাদের গণসংযোগ

ছাত্রদের বিক্ষোভের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি তারা করতেই পারে। কারণ তারা তাদের সহপাঠীকে হারিয়েছে, বন্ধুকে হারিয়েছে। তাদের আবেগ আছে তাই তারা বিক্ষোভ করছে। আমি ছাত্রদের এই বিক্ষোভকে সমর্থন করি। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন যেন ত্বরিতগতিতে এই দুর্ঘটনার বিচার হয়। তাই ছাত্রদের অনুরোধ করব যেন তারা বাসায় ফিরে যায়।’

দুর্ঘটনার মামলা হত্যা মামলা হিসেবে ৩০২ ধারায় করা হয় না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি আইন বিষয়ে ভালো জানি না। তবে ইচ্ছা করে হত্যা করলে তো ৩০২ ধারায় মামলা হয়।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মীমের বাবা জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। জাহাঙ্গীর নিজেও গাড়িচালক। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, এটি হয়তো অদক্ষ চালকের কাজ। অদক্ষ চালক হোক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি হোক অথবা ট্রাফিক আইন অমান্য করে হোক, যে কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য দায়ীদের শাস্তি পেতেই হবে।

মন্ত্রী আরো জানান, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করতে ‘সেইফ ঢাকা’ নামে একটি প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে যানজট কমে যাবে। যানজট কমে গেলে সড়ক দুর্ঘটনাও অনেকাংশে কমে যাবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ক্যান্সার ও কিডনি রোগে বছরে যত মানুষ মারা যায়, দুর্ঘটনায় তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়—এটি স্বীকার করতে আমার বাধা নেই।’ চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তারা আন্দোলন করে। এ ক্ষেত্রে এমন হলে কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

Comments

comments