মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাদের অর্থ বেশি ব্যয় হচ্ছে।

63

গৃহিণী নূরমহল বেগম (৫৫) প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে নিয়েছেন স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা। এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থ। দেশে চিকিৎসার সুযোগ থাকার পরও দেশের বাইরে গেলেন কেন? এ প্রশ্নের জবাবে  তিনি বলেন, ‘সেখানকার চিকিৎসকরা মনোযোগ দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে রোগীর কথা শোনেন। দেশে হলে শুনতো না!’ ব্যবসায়ী সমর সরকার (৪৮) তার পরিবারের সবার চিকিৎসা দেশের বাইরে করেন। কিন্তু কেন? তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের যখন ৩ দিন বয়স তখন হাসপাতালের চিকিৎসক বলেছিলেন, যেন ওর অস্ত্রোপচার করি। আমার সন্দেহ হওয়ায় বাইরে নিয়ে যাই। সেখানে কোনও অস্ত্রোপচার করাতে হয়নি। এরপর থেকে আর দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থা পাই না!’ গবেষক মামুন রশীদ (৪০) পায়ের গোড়ালির ব্যথায় ভুগতেন। দেশে চিকিৎসকরা তাকে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। কিন্তু দেশের বাইরে যান তিনি। সেখানকার চিকিৎসক তাকে অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে জুতোয় দুটো রাবার ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এতে উপকার পেয়েছেন তিনি। তাই দেশীয় চিকিৎসকের চেয়ে বিদেশি চিকিৎসকদের প্রতি তার আস্থা বেশি। বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের সঙ্গে কথা বললে এমন গল্প জানা যায়। তবে এরই ঠিক উল্টো দিকের ইতিবাচক অনেক গল্প থাকলেও রোগীরা তা আর প্রকাশ করেন না বলে মনে করেন দেশের চিকিৎসকেরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী আসগর মোড়ল বলেন, ‘অনেকে বিশ্বাস করেন যে দেশের বাইরে গেলে ভালো ট্রিটমেন্ট পাবেন, তাই যান। অনেকের দেশী চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নেই। তারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অনেকের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়াটা একটা ম্যানিয়াও বটে। তারা মনে করে যে দেশের কোন কিছুই ভালো না।’  তবে দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিইও অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, ‘কিছু মানুষ আছে চিকিৎসা করতে যায়, মার্কেটিং করতে যায়। এটা একটা শ্রেণি আছেই। অনেকেই আছে বেড়াতে গেছে বলে যে ঠাণ্ডা লেগেছে দেখিয়ে আসলাম। তবে হ্যাঁ, এখন অনেক রোগের জন্য বাইরে যায় না। হৃদরোগের জন্য বাইরে যায় না।’ তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ আছে যারা দেশে যতই ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা হোক তারা বাইরে যাবেই। এমনকি ভারতীয়রা সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে আসে।’ বিএসএমএমইউ’র মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘দেশে অনেক রোগী। কোনও হাসপাতালের বেড খালি নেই। যেকোনও মেডিক্যাল কলেজে রোগীকে পর্যাপ্ত বেড দিতে পারছে না। যাদের অর্থ বেশি তারা সুযোগের জন্য বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। যাদের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো তারা পাশের দেশে যান, আর যাদের পয়সাকড়ি বেশি তারা সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ডে যাচ্ছেন। এর মানে এই নয় যে, এখানে ফাঁকা করে সব রোগী চলে যাচ্ছেন। তা তো নয়, রোগীই বেশি।’ তিনি বলেন, ‘কিছুটা আস্থার সংকট তো আছেই। চিকিৎসকদের ওপর অবিশ্বাস, কিছু ভুল রিপোর্ট আসে, এগুলোও কারণ। যখন আস্থার অভাব হয়, তখন আমাকে দিয়ে তো চিকিৎসা করাবে না। মানুষের প্রাচুর্য বাড়ছে, সামর্থ্য বাড়ছে। সামর্থ্য যখন বেশি থাকে, তখন তো সে ভালো জিনিসটাই খুঁজবে। হার্ট, কিডনি, ফুসফুস এসব জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে মানুষ তো ভালো সুযোগটাই গ্রহণ করবে। সামর্থ্য না থাকলে তো মানুষ যেতো না।’ এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ইদানিং পত্রপত্রিকা খুললেই দেখা যায়, ভুল চিকিৎসার কিছু অভিযোগ উঠছে। এতে মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। এখানে গিয়ে আবার কোন উল্টাপাল্টা হয় কিনা! আবার দেশে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করে, কিন্তু তার প্রতিকার পাওয়া যায় না। তখন মানুষের আস্থার সংকট বেশি হয়।’  মানুষ যে সবসময় বাইরে গেলেই ভালো চিকিৎসা পায়, তা-ও ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘কিছু কিছু সমস্যা তো আছেই। আসলে ভালো চিকিৎসক যদি তৈরি না করেন ভালো চিকিৎসা তো পাবেন না। প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসক বানাচ্ছে, তখন কিন্তু মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগ, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন না, এক গাদা ওষুধ দিয়ে চিকিৎসকরা পার্সেন্টেজ নেন, এগুলো বাজারে কথা চালু আছে। অবকাঠামো, জনবল, সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি না করলে ভালো চিকিৎসক তৈরি না হলে মানুষের আস্থা আনতে পারবেন না।’ বিএসএমএমইউ’র কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক বলেন, ‘একধরনের রোগী আছে যারা মনে করেন যে, আমাদের এখানকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভালো না, চিকিৎসক ভালো। যেহেতু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভালো হয় না তাই চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিলেও ভালো ফল আশা করা যায় না। আমাদের রিপোর্টের মান নিয়ে সন্দেহ আছে। যখন আমরা ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস করি, দেখতে পাচ্ছি যে রোগীর এই সমস্যা আছে, কিন্তু হাতে রিপোর্ট বলছে রোগীর এই সমস্যা নেই। তখন আমি তো রোগীকে ওষুধ দিতে পারছি না। এই সমস্যাটা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি করে।’ তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু করপোরেট হাসপাতাল এত গলাকাটা লাভ করে দেখা যায়, পাশের দেশে গেলে সেই তুলনায় অনেক কম খরচ হয়। শুধু এই টেস্টের পিছনে রোগীর অনেক বেশি অর্থ চলে যায়। পাশের দেশে যদি কম টাকায় টেস্ট করা যায় তাহলে আমরা কেন পারছি না? আমাদের হাসপাতালগুলোতে ভুতুড়ে বিল আসে অনেক বেশি। নৈতিকতা, সাংস্কৃতিক বোধও জরুরি। আমাদের দেশে এখনও রেফারেন্স সিস্টেম হয়নি। আমার কাছে যখন দেখি কোনও ঘাড়ের ব্যথার রোগী আসে আমি বুঝতে পারি এটা হৃদরোগের জন্য হচেছ না, তখন তাকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে পাঠাই। এখানে নিউরোসার্জনও হৃদরোগের চিকিৎসা করছেন। উনি ব্রেনের সার্জন, উনি হৃদরোগের কি বোঝেন? চিকিৎসার জায়গায় সততা রাখতে হবে। একজন চিকিৎসকের নৈতিকতাবোধ, ধর্মীয়বোধ সবই থাকা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘রোগীরা ফিস দিতে আপত্তি করে না। কিন্তু তারা খুব মাইন্ড করে যদি কোনও অদেখা টাকা নেই। তারা বলে যে, আপনি জানিয়ে আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা নেন, কিন্তু না জানিয়ে কেন বেশি টাকা নেবেন?’ বিএসএমএমইউ’র হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, ‘রোগীরা তাদের স্বভাবজাত কারণেই দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যান। এটা সেই প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এছাড়া আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি, চিকিৎসকদের ইমেজ সংকট রোগীদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করছে। সারাদেশে আমরা ৬০ জন লিভার বিশেষজ্ঞ, আমাদের দিয়ে কি দেশের সব রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব?’ তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের ইমেজ বিল্ডিংয়ের জন্য, রোগী চিকিৎসক সম্পর্ক উন্নয়নে আমাদের বিভিন্ন স্যোসাইটিগুলো তেমন কাজ করে না। এর প্রভাব চিকিৎসা ব্যবস্থায় পড়ছে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার মো. আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, ‘দেশেই এখন সব ধরণের চিকিৎসা হচ্ছে। আমরা এতদিন যেসব রোগের জন্য বিদেশে যেতাম সেগুলো দেশেই চিকিৎসার করার সক্ষমতা রয়েছে। মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাদের অর্থ বেশি ব্যয় হচ্ছে। দেশে একই চিকিৎসা সুলভে পাওয়া সম্ভব। এখন কিডনি, লিভার, হৃদরোগ সব ধরণের চিকিৎসাই দেশে সুলভে পাওয়া যাচ্ছে।’

অন্য খবর  রোহিঙ্গা গণকবরের খবর অস্বীকার মিয়ানমারের

Comments

comments