মানিকগঞ্জে হাতে ভাজা মুড়ির কদর

126
হাতে ভাজা মুড়ি

গ্রামের নাম ধলাই। মানিকগঞ্জ সদর উজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের অন্তর্গত এই গ্রামের ঐতিহ্য হচ্ছে হাতে ভাজা মুড়ি। যে মুড়ির কদর জেলার গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই মুড়ি তৈরির প্রধান কারিগর হচ্ছেন গ্রামের গৃহিণীরা। বছরের ১২ মাস তারা মুড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকলেও রমজান মাসে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। প্রতিদিন কাক ডাকা ভোরেই ঘুম ভেঙে যায় মুড়ির কারিগরদের। চোখে মুখে পানি দিয়েই নেমে পড়েন মুড়ি তৈরির কাজে। বিশেষ করে

গ্রামের গৃহিণীরা পরম মমতা দিয়ে এই মুড়ি তৈরি করে থাকেন। সারা বছর মুড়ি বিক্রি করে তেমন লাভের মুখ না দেখলেও রমজান মাসে বেশি লাভবান হন তারা।

সরজমিন ধলাই গ্রামের সাগর মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মুড়ি ভাজার ধুম। সাগর মিয়া ও তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম ব্যস্ত মুড়ি তৈরির কাজে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও এই দম্পত্তি মাটির চুলায় পরম মমতা দিয়ে ভুসি ভাঙা মুড়ি ভাজছেন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই পেশায় থেকে তারা আজ স্বাবলম্বী। মুড়ি তৈরিই হচ্ছে তাদের আয় রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। সংসারে দু’বেলা খেয়ে পরে সুখেই আছেন ৬৫ বছরের সাগর মিয়ার পরিবার।

সাগর মিয়া কাজের ফাঁকে জানালেন মুড়ি তৈরির গল্প। বলেন, আমাদের গ্রামের এক সময় হাতে ভাজা মুড়ির ঐতিহ্য ছিল। সকাল থেকেই প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মুড়ির ম-ম গন্ধ পাওয়া যেত। কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই। এখন আমরা কিছু পরিবার বাবা দাদার আদি পেশাকে ধরে রেখেছি।

অন্য খবর  দোহার নবাবগঞ্জের মানুষ এখন দখল ও চাঁদাবাজমুক্ত: সালমা ইসলাম

বলেন, সারা বছর মুড়ি তৈরি করলেও রমজান মাসে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ বেশি। কারণ হাতে ভাজা মুড়ি দামের সাথে তুলানা করে কেউ নেয় না। এক কেজি মুড়ি কমপক্ষে ১২০ টাকা কেজি দরে পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। তারা খুচরা বাজারে তারা সেই মুড়ি বিক্রি করেন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে।

ভুসিভাঙ্গা মুড়ির ধান মানিকগঞ্জ জেলায় উৎপাদন হয়না। আনতে হয় সুদুর বরিশাল থেকে। বর্তমানে এক মণ ধান ১৫০০ টাকা। অথচ বছর কয়েক আগে এই ধান কিনেছি ১ হাজার টাকা মণ। ধানের দাম বেড়েছে কিন্ত মুড়ির দাম আগের মতোই।

সাগর মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া বেগম ভ্যাপসা গরমে আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলেন, মুড়ি ভাজতে গিয়ে চুলায় আগুনের তাপ, প্রচণ্ড গরম এবং হাড় ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। যেদিন স্বামীর সংসারে পা রেখেছি সেদিন থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি মুড়ি তৈরিতে। ৩০ বছরের অধিক সময় ধরেই জড়িয়ে আছি মুড়ি ভাজার কাজে। তাই আগুনের তাপ এখন আর গতরে লাগে না। প্রতি সপ্তাহে প্রায় চার দিন মুড়ি ভাজতে পারি। প্রতি দুই মণ ধানে ৪৬ কেজি মুড়ি হয়। এতে প্রায় ৩ হাজার টাকার মতো লাভ হয়। রোকেয়া বলেন, আমরা যে মুড়ি তৈরি করি তাতে কোনো ধরনের ভেজাল নেই। নেই কোনো রাসায়নিক ক্ষতিকারক পদার্থ। যার কারণে আমাদের তৈরি হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা ও কদর বেশি। তবে সারা বছরের চাইতে রোজার সময় চাহিদা বেড়ে যায় কয়েক গুল। প্রতি কেজি মুড়ি পাইকারি বিক্রি করি ১২০ টাকায়। পাশের বাড়ির মুড়ি তৈরির কারিগর সকিনা বেগম। প্রায় ৩৫ বছরের বেশি সময় এই পেশা নিয়োজিত আছেন। স্বামী তাহের আলীর বাড়ির ঘরের লক্ষ্মী তিনি। সংসারে উন্নতির চাবিকাঠিও তিনি। সকিনা বেগম বলেন, সেই ছোট্ট বয়সে স্বামীর সংসারে যেদিন পা রেখেছি সেদিন থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি মুড়ি তৈরিতে। প্রায় ৪৫ বছরের অধিক সময় ধরেই মিশে আছি মুড়ি ভাজার কাজে। আমাদের মুড়ির কদর আছে সবখানেই। সারা বছর মুড়ি ভাজি কিন্ত রমজান মাসে চাহিদা অনকে বেশি। তাই প্রতিদিনই আজানের সময় ঘুম থেকে উঠতে হয়। উঠেই বসে পড়ি চুলার পাড়ে। প্রায় বিকাল পর্যন্ত মুড়ি ভাজতে হয়। পাইকার ব্যবসায়ীরা বাড়ি থেকে মুড়ি কিনে নিয়ে শহরের অধিক দামে বিক্রি করে।

অন্য খবর  নবাবগঞ্জে সৈনিক লীগের আনন্দ মিছিল, কেক ও মিষ্টি বিতরণ

Comments

comments