মাদকবিরোধী অভিযানে সতর্কতার পরামর্শ আসাদুজ্জামান খান কামালের

49
আসাদুজ্জামান খান কামাল
বিজ্ঞাপন

আইনের সঠিক নীতি অনুসরণ করে সতর্ক হয়ে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। অভিযানে যাতে কোনোভাবে মানবাধিকারের বিষয় লঙ্ঘিত না হয় সেদিকে নজর দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাগিদ দিয়েছেন তারা। গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এমন আহ্বান জানালেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, মাদকবিরোধী অভিযান চলবে এবং এ ধরনের অভিযানের সময় ফায়ারিং হবেই। তিনি বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযান হঠাৎ শুরু হয়নি। দেশের ৫ টি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন পর্যালোচনার পর অভিযান শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, যেখানেই মাদক আছে, সেখানেই অবৈধ অস্ত্র আছে, সেখানেই অবৈধ টাকা আছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখনই অভিযানে যায় তখনই তারা সেইসব মাদক ব্যবসায়ী ও দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হন। কাজেই তাদেরই আত্মরক্ষার অধিকার আছে। আত্মরক্ষার্থে তারা গুলি চালাতেই পারে।

গতকাল রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোডে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘মাদকবিরোধী অভিযান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি’- শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনরা চলমান অভিযান নিয়ে নিজেদের অভিমত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র নেতারাও অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেন প্রমিসেস মেডিকেল লিমিটেড। সঞ্চালনা করেন টেলিভিশন উপস্থাপক জিল্লুর রহমান।

গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কলম্বিয়া নামক একটি রাষ্ট্র ভয়াবহ মাদকে নিমজ্জিত হয়েছিল। সেই রাষ্ট্রটি এখন মাদকের অভিশাপ থেকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনেছে। সারা পৃথিবীতে মাদকবিরোধী অভিযান হয়ে থাকে। মাদক বিরোধী অভিযানে ফায়ারিং হবেই। আমরা কাউকে হত্যা করছি না। হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা অভিযান শুরু করিনি। মাদক নিয়ন্ত্রণ করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা একদিকে যেমন অভিযান চালাচ্ছি, তেমনি সারা দেশে মাদকবিরোধী প্রচার ও প্রচারণা চালাচ্ছি। দেশের শিক্ষক, ছাত্র, যুবক, আলেম, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমরা অতীতে জনগণকে নিয়ে যেমন করে জঙ্গিবাদ দমন করেছি, তেমনি এই মাদককে দমন করবো।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের ৬৫ ভাগ তরুণ। তাদের ভবিষ্যৎকে আমরা এই মাদকের কারণে হারাতে দিতে পারি না। আমরা মাদক দমনে আইন-সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছি। দেশের কিছু মানুষ সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযানে যারা আহত ও নিহত হয়েছেন তাদের কথা বলছেন। কিন্তু, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই সাম্প্রতিক অভিযানে যে কয়েক হাজার মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীকে ধরে আইনের কাঠগড়াই দাঁড় করিয়েছে এটি আর কেউ বলছেন না।

অন্য খবর  প্রতিটি মানুষকে হতে হবে নিজ দায়িত্বে সচেতনঃ ফায়ার সার্ভিসের উদ্বোধনে দোহারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

তিনি বলেন, আমরা বার বার বলে এসেছি এবং এখনও বলছি যে, আইন সবার জন্য সমান। ইতিমধ্যে বিষয়টি তদন্ত শুরু হয়েছে। যদি একরামুলের বিষয়ে আইনের বিধি-বহির্র্ভূত কোনো কাজ ঘটে থাকে তাহলে তিনি যেই হোন না কেন তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। এখানে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। আমরা সবাই দেখেছি যে, এই সরকারের আমলে বিভিন্ন কারণে একাধিক এমপি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সরকার এখানে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, আইন সবার জন্য সমান। তিনি রাজনীতিবিদ হোন আর যতই প্রভাবশালী হোন। অপরাধ করলে কোনো ছাড় নেই।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সরকার মাদকবিরোধী যে অভিযান চালাচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভুল পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কোনোদিন মাদক দমন হবে না। মাদক দমন করতে শুধু সরকারের ইচ্ছাটাই যথেষ্ট। ভারতের সীমান্ত এলাকায় ফেন্সিডিল কারখানা গড়ে উঠেছে। আর মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা। এই মাদকের আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য পাশের দুই দেশের সঙ্গে মাদক দমনে কার্যকর চুক্তি করতে হবে। এনার্জি ড্রিংকের নামে যে সবাই মাদক সেবন করছে এটা আমলে নিতে হবে। সেখানে আলকোহলের মাত্রা কমাতে হবে।

জাতীয় পার্র্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, আমি সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে একটি পত্রিকার কাটিং দেখিয়ে বলেছিলাম যে, ঢাকায় কোথায় কোথায় মাদক প্রকাশ্যে বিক্রয় হয়। তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আশ্বাস দিয়েছিলেন। ঢাকার অভিজাত ক্লাবে যে প্রকাশ্যে মাদক সেবন হয়ে থাকে সেখানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযান চালাতে হবে।

অর্থনীতির পত্রিকার সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, দেশে মাদকবিরোধী অভিযান হচ্ছে এক্ষেত্রে কারও দ্বিমত আছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ মাদক একটি পরিবারকে শুধু নয়, একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেয়। এই অভিযানে শুধু আমাদের একটি আহ্বান থাববে, অভিযানের নামে যেন কোনো নিরীহ লোকজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানির শিকার না হয়। এখানে মানবাধিকার বিষয়টি চুলচেরাভাবে আমলে রাখতে হবে। কারণ একটি মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।

অন্য খবর  সাভারে হ্যান্ডকাফসহ পালানো যুবলীগ নেতার বাড়িতে পুলিশ ক্যাম্প

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন, মাদকের বিষয়ে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। একটি শিশু কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়া পর্যন্ত তাকে সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। প্রত্যেকের সন্তান সারা দিনে কী করছে, কোথায় এবং কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে তা খেয়াল রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, আজকে মাদকের বিষয়ে সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কিন্তু, একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমাদের সারা দেশের তরুণ এবং তরুণীরা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তারা প্রত্যেক ৭ মিনিট পর পর তাদের হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি দিয়ে ইন্টারনেটের জগতে প্রবেশ করছে। তারা সেখানে কী করছে এবং কী দেখছে এটা প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন হতে হবে।

বিএনপি’র সাবেক সংসদ সদস্য সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, আমাদের কোনো কোনো মন্ত্রী বলছেন এমপি বদি যে মাদক ব্যবসায়ী তা তাদের কাছে প্রমাণ নেই। টেকনাফের যে একরামুল হত্যার শিকার হলেন তাহলে তার ক্ষেত্রে তারা কী বলবেন? এই প্রশ্ন শুধু আমার নয়, সারা দেশের সাধারণ মানুষের।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক শ.ম. রেজাউল করীম বলেন, যে কোনো অভিযানে আহত এবং নিহত হবে। অতীতে আমরা দেখেছি অপারেশন ক্লিন হার্ট পরিচালনা করে এর দায় মুক্তির জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ের অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। মাদক দমনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং এর শাস্তি আরও বাড়ানোর পরামর্শ এ আইনজীবীর।

বিএনপি’র সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, দেরিতে এই অভিযান শুরু হলেও এই অভিযানকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- নূরজাহান বেগম মুক্ত এমপি, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম. ইমদাদুল হক, মাদক নিরাময় কেন্দ্র-মুক্তির প্রতিষ্ঠাতা ডা. এএ কোরেশী ও প্রমিসেস মেডিকেল লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহেদুল ইসলাম হেলাল প্রমুখ।

Comments

comments