মারাকানাজো

১.

একটা শব্দ কি কখনো লক্ষ কোটি টন পাথরের চেয়েও ভারি হতে পারে? একটা মুহূর্ত কি কখনো একসঙ্গে স্তব্ধ করে দিতে পারে লাখো মানুষকে? একটা গোল কি কখনো মুহূর্তে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে লক্ষ কোটি মানুষের আশা? ব্রাজিলে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করুন, ৬৮ বছর আগের সেই দিনের কথা ভেবে হয়তো অশ্রু সংবরণ করতে পারবেন না অশীতীপর কেউ । আপনি হয়তো ২০১৪ বিশ্বকাপে মিনেইরোর ৭-১ গোলের ওই দিনের কথা বলবেন। মারাকানাজোর কাছে তা অবশ্য কিছুই নয়। যে স্বপ্নভঙ্গের জন্য একজন লোককে ৫০ বছর অলিখিত যাবজ্জীবন কারাদন্ড পেতে হয়, সেই ১৯৫০ বিশ্বকাপের আক্ষেপ ব্রাজিলের আসলে কখনোই যাওয়ার নয়।

২.

অথচ মঞ্চটা আক্ষরিক অর্থেই ব্রাজিলের জন্য সাজানো ছিল। ১৯৫০ বিশ্বকাপের ফরম্যাটটা একটু অদ্ভুত ছিল। গ্রুপ পর্বের পর সেরা চার দলকে নিয়ে হবে আরেকটি রাউন্ড রবিন লিগ, চ্যাম্পিয়ন ঠিক হবে সেখান থেকেই। তার মানে ফাইনাল বলতে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু ছিল না তখন।

তবে পরিস্থিতির বিচারে ব্রাজিল-উরুগুয়ে ম্যাচটাই হয়ে গিয়েছিল ফাইনাল। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল শুধু সুইজারল্যান্ডের সঙ্গেই ড্র করেছিল, হারিয়েছিল মেক্সিকো ও যুগোস্লাভিয়াকে। তবে চূড়ান্ত রাউন্ডে ব্রাজিল দেখাতে শুরু করে, কেন ফাইনালের আগেই ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের নামে ২২টি সোনার পদক বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। চূড়ান্ত পর্বে সুইডেনকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর স্পেনের জালে দেয় ৬ গোল। দুই ম্যাচে ব্রাজিলের পয়েন্ট ৪, উরুগুয়ের ৩। শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ দুই দল, শিরোপার জন্য উরুগুয়েকে জিততেই হবে। আর ব্রাজিলকে ড্র করলেই চলবে। এই উরুগুয়েকেই আগের বছর কোপা আমেরিকায় ৫-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিল। ফলটা কী হতে পারে, সেটা সহজেই ছিল অনুমেয়। ব্রাজিলের জন্য শিরোপাটা ছিল তাই সময়ের ব্যাপার।

মারাকানাজো

ফাইনালের আগেই রিও ডি জেনিরোতে আগাম জয়োৎসবের কার্নিভাল হয়ে গেল। মহারণের জন্য প্রস্তুত মারাকানা। আজকের এই স্টেডিয়াম তখন এমন ছিল না, এখন তো ভেঙেচুরে অনেকটাই কময়ে ফেলা হয়েছে মারাকানার ধারণক্ষমতা।  সেই মারাকানায় সেবার আক্ষরিক অর্থেই তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। আনুষ্ঠানিক হিসেবেই দর্শক ছিল দেড় লাখের কাছাকাছি, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সেটা দুই লাখও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে খেলা শুরুর আগে হুড়োহুড়িতে আহত হলেন বহু লোক, মারাও গেলেন দুজন। পুলিশ গোলমালের আশঙ্কায় বোতল-আতশবাজি সবই নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই বিপুল জনস্রোতে সব সতর্কতা কর্পুরের মতো উবে গেল। পুরো স্টেডিয়াম যেন শুধু শেষ বাঁশির অপেক্ষায়, এরপরেই শুরু হয়ে যাবে উৎসব।

৪.

মারাকানাজো

তবে উরুগুয়ের মনে ছিল অন্য কিছু। ফাইনালের আগে দলকে তাঁতিয়ে দেওয়ার জন্য অধিনায়ক অবদুলিও ভ্যারেলা বেশ কিছু ব্রাজিলিয়ান পত্রিকা কিনে আনলেন। ব্রাজিলের চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা সময়ের অপেক্ষা- এমন সব শিরোনাম ছাপা হয়েছিল সেদিন। ভ্যারেলা সেসব পত্রিকা শৌচাগারে জড়ো করে তাতে মূত্রত্যাগের নির্দেশ দিলেন। এরপরেই দলকে উদ্দীপ্ত করার জন্য বললেন, আর যাই হোক নিজেদের খোলসে বন্দি করে রাখবে না। তারা বীরের মতোই খেলবে, এরপর যা হয় হোক।

অন্য খবর  আর্জেন্টাইনরা চান, মেসিরা খেলুন বাংলাদেশের সঙ্গে

খেলা শুরু হলো। ব্রাজিল শুরু থেকেই তেঁড়েফুঁড়ে খেলতে শুরু করল। বল বেশির ভাগ সময়ই তাদের দখলে থাকল, গুনে গুনে ১৭টি শটও হল পোস্টে। কিন্তু গোলটাই আর হলো না। আবার উরুগুয়েও যে ছেড়ে কথা বলল তা নয়। একবার শট বারে না লাগলে, আর আরেকবার রুবেন মোরান ফাঁকা পোস্টে বল ঠেলতে না পারলে মারাকানা প্রথমার্ধেই নীরব হয়ে যেতে পারত।

শেষ পর্যন্ত বিরতির দুই মিনিট পর মারাকানায় ওঠে উল্লাসের কোরাস। ফ্রিয়াকার গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। উরুগুয়ের অধিনায়ক ভ্যারেলা সতীর্থ রদ্রিগেজ আন্দ্রাদেকে দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর ঠিক আগে বলেছিলেন, ‘ওদের যত খুশি চেঁচাতে দাও। পাঁচ মিনিটের মধ্যে এখানে কবরের মতো নিস্তব্ধতা নেমে আসবে। এরপর শুধু আমিই চেঁচাব।’ কে জানত, পাঁচ মিনিট না হোক, ৪৫ মিনিট পর কথাটা এভাবে ফলে যাবে?

মারাকানাজো

গোল খেয়েই যেন জেগে উঠল উরুগুয়ে, ৬৬ মিনিটে শিয়াফিনোর গোলে সমতা ফেরাল। মারাকানা একটু থমকে গেলেও একদম নীরব হয়নি। ড্র হলেই তো চলত ব্রাজিলের। কিন্তু স্নায়ুচাপ হারিয়েই কি না, এরপর ব্রাজিল করে বসল ক্ষমার অযোগ্য সেই ভুল। মিগুয়েজ-পেরেজের ওয়ান টুর পর মাঠের ডান প্রান্তে বল পেয়ে যান অ্যালসিডেস ঘিগিয়া। একটু ওপরের দিকে উঠে আসেন, সামনে আগুয়ান গোলরক্ষক বারবোসা। একবার ঘিগিয়া ভাবলেন, পাসটা দিয়ে দেবেন। বারবোসাও তাই ভেবেছিলেন হয়তো। মাঝে শিয়াফিনো তখন চলে এসেছেন। গোলরক্ষকের সেই দোনোমোনর সুযোগ নিলেন ঘিগিয়া, ডান পায়ের শট ঠেকাতে পারলেন না বারবোসা। বল জড়িয়ে গেল জালে।  মুহূর্তেই স্টেডিয়ামে নেমে এলো মহাশ্মশানের নীরবতা। ব্রাজিল মরিয়া হয়েই গোলের জন্য চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ম্যাচে ফেরার সুযোগটা আর এলো না, শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে মারাকানা যেন নিথর সব লাশে ঠাসা প্রকাণ্ড কোনো মর্গ। ধাক্কাটা সামলাতে না পেরেই অনেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন, অনেককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হাসপাতালে। পুলিশেরা পাহারা ভুলে কাঁদতে শুরু করে দিল মাঠে। সেই মহাগোলযোগের মধ্যে মাঠে নেমে এলেন ওই সময়ের ফিফা সভাপতি জুলে রিমে। এমনও গুঞ্জন আছে, উরুগুয়ের অধিনায়ককে তিনি ট্রফি উঁচু না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওদিকে পুরো ব্রাজিল তখন ভুগছে হিস্টিরিয়ায়, রিওতে শোক সইতে না পেরে আত্মহত্যাও করে ফেলেছেন কেউ কেউ। তবে ধাক্কা তো কেবল সবে শুরু।

মারাকানাজো

সেই ফাইনালের পর এক ধাক্কায় জাতীয় দল থেকে অবসর নিলেন চার জন। ২২টি মেডেল কোথায় সরিয়ে ফেলা হলো, কেউ তা বলতে পারে না। ব্রাজিল-জিগীষায় বাঁধা গানটাও আর গাওয়া হলো না কখনও। অথচ আট বছর পরেই বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। তবে ৫০ এর সেই দলের মাত্র দুজন ছিলেন সেই জয়ী দলে, এই দুজন আবার ১৯৫০ বিশ্বকাপে মূল একাদশেও খেলেননি। মারাকানার সেই দিনে ব্রাজিলের জার্সি ছিল সাদার সঙ্গে নীল কলার। সেই জার্সিও বদলানোর দাবি উঠল, তিন বছর পর এলো আজকের এই বিখ্যাত হলুদ-নীল জার্সি।

অন্য খবর  ম্যাচ জেতানো ইনিংসটা সন্তানকে উৎসর্গ করলেন মুশফিক

তবে এসব তো আসলে তুচ্ছই। মারাকানার সেই ট্র্যাজেডি গোলরক্ষক বারবোসাকে তো চিরজীবনের জন্য খলনায়ক বানিয়ে দিয়েছিল। তাঁর ভুলেই দ্বিতীয় গোল খেয়েছিল ব্রাজিল, যেটির জন্য অনেকদিন তাঁকে দেশবাসী ক্ষমা করতে পারেনি। তাঁকে মনে করা হতো অপয়া, জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ১৯৯৩ সালে একবার ব্রাজিলের ম্যাচে তাঁকে ধারাভাষ্যও দিতে দেওয়া হয়নি। লেখক নেলসন রদ্রিগেজ যেমন বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলিয়ানরা হলুদ-জ্বর, বাধ্যতামূলক টিকা, পিনেইরো মাচাদো হত্যা (১৯১৫ সালে নিহত ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট) ভুলে গিয়েছে। কিন্তু বারবোসার ভুলটা তারা ভুলতে পারেনি।’ এমনকি ‘ওই যে কালো গোলরক্ষক যায়’, এমন বর্ণবাদী গালিও শুনতে হয়েছে বারবোসাকে।

জীবনের বাকিটা বছর কতটা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, ভেবে দেখুন? কতটা কষ্ট পেয়ে থাকলে একজন লোক সেই ঘটনার ৪৩ বছর পর একবুক হাহাকার নিয়ে বলতে পারেন, ‘ব্রাজিলে জেল খাটার সর্বোচ্চ শাস্তি ৩০ বছর। আমি তো ৪৩ বছর ধরে সেই শাস্তি পেয়ে যাচ্ছি।’ ২০০০ সালে সেই অভিশাপ নিয়েই পৃথিবী ছেড়ে গেছেন বারবোসা।

মারাকানাজো

আর ঘিগিয়া? ব্রাজিলের হৃদয় ভেঙে দেওয়া মহাকাব্যিক গোলের পর যে কথাটা বলেছিলেন, সেটাও হয়ে গেছে ইতিহাসের অংশ, ‘মাত্র তিন জন লোক মারাকানাকে স্তব্ধ করে দিতে পেরেছিল। পোপ, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা আর আমি।’ সেই একটা গোলই ঘিগিয়াকে দিয়েছিল অমরত্ব। সেটি কতটা, পরে জানিয়েছেন নিজেই। ওই ঘটনার ৫০ বছর পর একবার এসেছিলেন ব্রাজিলে। রিও বিমানবন্দরে তরুণী ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তাঁর পাসপোর্ট খতিয়ে দেখার সময় বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা, ৫০ বছর আগে মারাকানায় আমাদের যিনি হারিয়েছিলেন, আপনি ওই ঘিগিয়া নন তো?’ বিস্মিত ঘিগিয়া শুধু বলতে পারলেন, ‘আপনার এখনো ওই ঘটনা মনে আছে? এরপর তো কতটা সময় পেরিয়ে গেছে!’ তরুণী শুধু বুকে হাত দিয়ে বললেন, ‘ব্যথাটা এখানে রয়ে গেছে।’

সেই ব্যথা আরও অনেকদিন থেকে যাবে ব্রাজিলের। এরপর পেলে নামের এক রূপকথার বরপুত্র ব্রাজিলকে আরও তিনটি বিশ্বকাপ দিয়েছেন, পরে রোমারিও-রোনালদোরা দিয়েছেন আরও। কিন্তু দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। সেই মারাকানা এখন নেই, তবে জিজিনহো-ফ্রিয়াকাদের সেই গোপন দীর্ঘশ্বাস এখনও কোথাও থেকে গেছে মারাকানার ইথারে। আরও অনেক বছরেও তা হয়তো যাওয়ার নয়।

Comments

comments