বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর টোল নিয়ে টালবাহানা

98
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর টোল নিয়ে টালবাহানা

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী (বুড়িগঙ্গা ১ম) সেতুর টোল নিয়ে টালবাহানা ও রাজস্ব ফাঁকির পাঁয়তারা চলছে। সড়ক ও জনপথের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়ার দরপত্র চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, নতুন নীতিমালায় বাড়তি হারে তিন বছরের জন্য কয়েকবার টেন্ডার আহ্বানেও সাড়া দেয়নি কোনো ইজারাদার। অবশেষে ১০ এপ্রিল চতুর্দশ দরপত্র আহ্বানে একটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। কিন্তু সেটা টোল আদায়ের টার্গেটের চেয়ে অনেক কম। ফলে পুনঃদরপত্র আহ্বান করলে সরকারের রাজস্ব আরও বাড়বে বলে পূর্বের ইজারাদাররা জানান।

১৯৮৯ সালে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর পোস্তগোলা-কেরানীগঞ্জ হাসনাবাদের দুইপাড়ে নির্মাণ করা হয় ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু’। সেতুটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। শুরু থেকে সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলরত যানবাহন ভেদে ১৩ ও ২০ টাকা হারে টোল নেয়া হতো। এরপর এটা বৃদ্ধি করা হয় ২০ ও ৩০ টাকায়। কিন্তু হঠাৎ ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যানবাহন ভেদে টোল বৃদ্ধি করা হয় কয়েকগুণ। সেই সঙ্গে টোলের আওতায় আনা হয় ছোট ছোট যানবাহনগুলোকে। ফলে অতিরিক্ত টোলের হার কমানো ও টোল ফ্রি করার দাবিতে আন্দোলন করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনগুলো। আন্দোলনকারীরা টানা কয়েক দিন বন্ধ করে দেয় যান চলাচল।

ফলে কর্তৃপক্ষ ছোট হালকা যানবাহনের টোল মুক্ত ও বর্ধিত ভাড়া কার্যকর স্থগিত করেন। এ অবস্থায় টেন্ডার থেকে বিরত থাকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ৯০ দিনের জন্য টোল আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয় সড়ক ও জনপথের কেরানীগঞ্জ সড়ক উপবিভাগকে। দীর্ঘ পৌনে তিন বছর অতিবাহিত হলেও কোনো টেন্ডার দেয়া হচ্ছে না। এমনকি নেয়াও হচ্ছে না বর্ধিত অর্থ।

অন্য খবর  সিরাজদিখানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্ঠান ঐক্য পরিষদের মানববন্ধন

সড়ক ও জনপথের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ টোল আদায় করা হয় ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। অবশেষে টোলের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরুর সপ্তমবারে দুই বছর ইজারা পরিচালনাকারী মেসার্স চৌধুরী ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৪ কোটি ২০ লাখ ও অষ্টমবারেও সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার পুনঃদরপত্র জমা দেয়।

অন্যদিকে নিউ ভিশন নামক প্রতিষ্ঠান ৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকার দরপত্র জমা দেয়, যা সড়ক ও জনপথের টোল আদায়ের অর্থের চেয়ে প্রায় ১ কোটি টাকা বেশি। এরপরও ২৭ সেপ্টেম্বর নবম দরপত্র আহ্বানের দিন ধার্য করা হলেও নতুন করে বাড়তি হারে তিন বছরের জন্য টেন্ডার আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে বাতিল করা হয় পূর্বের জমা পড়া দরপত্র।

এদিকে নতুন নীতিমালায় তিন বছরের জন্য পরপর চারটি টেন্ডার আহ্বান করা হলেও কোনো ইজারাদার কোনো দরপত্রে অংশ নেয়নি। পরবর্তীতে চতুর্দশবারে ২১ কোটি ২৯ লাখ টাকায় দরপত্র আহ্বান করে একমাত্র কে আলম শিপিং নামক একটি প্রতিষ্ঠান। সড়ক ও জনপথের লিখিত জরিপের হিসাব অনুযায়ী বাড়তি দরের নতুন নীতিমালায় প্রতি বছর সম্ভাব্য রাজস্ব লাভের পরিমাণ ১৭ কোটি ২২ লাখ ৬১ হাজার ৭৫০ টাকা। এ হারে তিন বছরে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা।

সাবেক ইজারাদার সালেহ চৌধুরী জানান, আমরা পূর্বের হারে টোল আদায় করতাম। সর্বশেষ বাৎসরিক ইজারার পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। পূর্বের নীতিমালায় অষ্টম ডাকে টোল আদায়ের বাৎসরিক ইজারার দরপত্র পড়ে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমানে নতুন নীতিমালায় টোল বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ থেকে ৪ গুণ। সেই সঙ্গে পোস্তগোলা-হাসনাবাদ এলাকায় প্রতিদিন চলাচলরত কয়েক হাজার সিএনজি অটোরিকশাকেও নতুন টোলের আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন রেটে বাৎসরিক টোল আদায়ের পরিমাণ হবে গড়ে ১৫ থেকে ১৮ কোটি টাকা। আর তিন বছরে টোলের পরিমাণ দাঁড়াবে গড়ে ৪৫ থেকে ৫৪ কোটি টাকা। অথচ নতুন প্রক্রিয়ায় ইজারার দরপত্র পড়েছে মাত্র ২১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। তাই আবারও পুনঃটেন্ডার আহ্বান করলে সরকারের মোটা অঙ্কের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। এতে অংশ নিতে পারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও। ফলে পুনঃটেন্ডার আহ্বান করা উচিত বলে মনে করেন কিছু ইজারাদার। গত ২৩ ও ২৪ এপ্রিল টোল পূনঃটেন্ডারের ব্যাপারে সড়ক ও জনপথের প্রধান প্রকৌশলীকে লিখিত আবেদন জানান তানভীর ভূঁইয়া নামক এক ব্যক্তি ও মেসার্স চৌধুরী ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সড়ক ও জনপথ ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুস সবুর জানান, আমাদের রাজস্ব আদায়ের টার্গেট আশানুরূপ হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ নেবে। কিন্তু অংশ না নেয়ায় রাজস্ব বাড়েনি। তবে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে পুনঃটেন্ডারের ব্যাপারে আমরা আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুনুর রশীদকে তার মুঠোফোনে চেষ্টা করা হলে তিনি রিসিভ করেনি।

অন্য খবর  মুক্তিযুদ্ধে দোহার-নবাবগঞ্জের নক্ষত্রঃ ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী

Comments

comments