ববি ফিশারঃ একজন ক্ষ্যাপা চ্যাম্পিয়ন

78
ববি ফিশার

 

“I don’t believe in psychology. I believe in good moves.

All that matters on the chessboard is good moves.

I like the moment when I break a man’s ego.”

 

 

-“রবার্ট জেমস,তোমাকে খুব নার্ভাস লাগছে।”

 

১৯৭২ সালের বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নশীপ। স্পাসকির বিদ্রুপভরা কন্ঠস্বর ববি ফিশারের কানে বাজছে।তিনি এখন তার ঘরের কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন।স্পাসকির কাছে প্রথম ম্যাচ হারার পর প্যারানয়েড সিজিফ্রনিয়ায় আক্রান্ত দাবাজগতের এই প্রডিজি ভাবছেন রাশিয়ানরা তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে।বরিস স্পাসকির সাথে ২৪ ম্যাচ সিরিজের ২য় ম্যাচে তিনি খেলতেই যান নি এজন্য,তিনি জানেন তিনি হেরে গেছেন এজন্য ইতিমধ্যে। কিন্তু তার বিকার নেই। তিনি জানেন তিনিই সেরা- কিন্তু এখন যেভাবে খেলা হচ্ছে তিনি সেভাবে জিততে পারবেন না। তার সামান্য শব্দেও সমস্যা হচ্ছে। ফিশার মনে মনে ভাবেন তাকে হারানোর জন্য ইচ্ছা করেই যেন আশেপাশে বেশি শব্দ করা হচ্ছিল প্রথম ম্যাচে।”কিল দৌজ রাশিয়ান্স”-বিড় বিড় করে বলে উঠেন তিনি।

 

১৯৬৩ সালের দাবা চ্যাম্পিয়নশীপের কথা মনে পড়ে যায় তার।দাবার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছিল তার হাতের নাগালে।তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে।অথচ ক্যান্ডিডেট টুর্নামেন্টে তিনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন রাশিয়ানরা তাদের নিজেদের মধ্যের খেলায় ইচ্ছাকৃত ভাবে ড্র করছে,তাদের সমস্ত শক্তি জমা রেখে শুধু ফিশারকে মোকাবেলা করতে নিজেদের প্রস্তুত করছে। এ যেন ৫ জন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তিনি একা-ফিশার জানেন রাশিয়ার বাইরে কেউ চ্যাম্পিয়ন যেন হতে না পারে সেজন্যই এই পরিকল্পনা।তিনি জানেন এভাবে বিজয়ী হওয়া সম্ভব না। এঘটনার পর তিনি অবসর-ই নিয়ে ফেলেছিলেন প্রফেশনাল দাবা ক্যারিয়ার থেকে,অভিযোগলিপিও পেশ করেছিলেন।

 

রবার্ট জেমস ফিশার এখন জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে ,তিনি জানেন টানা ২ ম্যাচ পরাজিত হয়েছেন তিনি। হারতে ভালবাসেন না তিনি,পরাজয় কখনো মেনে নিতে পারেন না।পারলে কি তিনি সর্বকনিষ্ঠ গ্রান্ডমাস্টার হতে পারতেন? পারতেন ৮বার অংশ নিয়ে ৮ বার-ই ইউএস চেস চ্যাম্পিয়নশীপের চ্যাম্পিয়ন হতে?

 

নিজের অর্জন স্মরণ করে উত্তেজনায় কাঁপতে থাকেন ফিশার। দাবাকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে গেছেন তিনি, যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয়তাই তার ধারেকাছে নেই  কেউ সে সময়। তার মনে পড়ে যায় ১৬ বছর আগের কথা।মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্টের অন্যতম সেরা দাবাড়ু ডোনাল্ড বায়ার্নকে অস্বাভাবিক দক্ষতায় পরাজিত করেন। তিনি নিজের কুইনকে স্যাক্রিফাইস করেন এই খেলায়। অথচ এরপর যখন একটি রুক, দুইটি বিশপ আর একটি পন নিয়ে বায়ার্ন কে কোণঠাসা করে ফেলেন, বায়ার্নের কুইন তখন চেসবোর্ডের আরেক মাথায় অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে।’ববি,ববি,ববি’- তিনি যেন ১৬ বছর আগের সেই উল্লাস শুনতে পাচ্ছেন!!!

অন্য খবর  ইছামতি নদী

 

ববি ফিশার তার উত্তেজনা টের পেতে থাকেন। তিনি আবার খেলায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করে। তার মনোযোগের যেন ব্যাঘাত না ঘটে তাই শর্তে বলা ছিল বদ্ধঘরে খেলা হবে, এমনকি চেসবোর্ড পর্যন্ত নতুন বানানোর কথা বলা হয় যাতে শব্দ কম হবে।

 

নিপাট ভদ্রলোক স্পাসকি সব শর্ত মেনে নেন। ৩য়,৪র্থ আর ৫ম ম্যাচ খেলা হয় বদ্ধ ঘরে। দুইটি জয় আর একটি ড্র করেন ফিশার। তাদের দুজনের পয়েন্ট দাঁড়ায় সমান সমানঃ ২১/২-২১/২।

 

৬ষ্ঠ ম্যাচ আবার খেলা হয় ওপেন হলরুমে, ফিশার ততদিনে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন,রাজি হয়ে যান তিনি। সারাবিশ্বের চোখ এই ম্যাচের দিকে। কেননা দাবাবোদ্ধাদের মত ছিল এই ম্যাচ যে জিতবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা তার-ই বেশি থাকবে। সোভিয়েত আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান কোল্ড ওয়ার ম্যাচটিকে আরো নাটকীয় রূপ দেয়।

ববি ফিশার

এই ম্যাচে ববি ফিশার ওপেনিং করেন তার প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে, এরকম চাল দিয়ে এর আগে তিনি খেলা শুরু করেননি বললেই চলে। শুরুতেই বিভ্রান্ত করে দেন স্পাসকি কে। কিন্তু স্পাসকি  দৃঢ়তার সাথে খেলতে থাকেন। ম্যাচের ২১ তম চালে ফিশারের একদম নিখুঁত খেলার সামনে ছোট ভুল করতে বাধ্য হোন স্পাসকি। এরপর ফিশার ধীরে ধীরে স্পাসকিকে কোণঠাসা করে ফেলেন।হার মানেন স্পাসকি। উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান ফিশারকে ,তার সাথে সাথে করতালি দিতে থাকে দর্শকেরা। এ এক অভাবনীয় ঘটনা-পরাজিত গ্রান্ডমাস্টার বিজয়ী গ্রান্ডমাস্টারকে হেরে যাওয়ার পর করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করছেন। ববি প্রথমবারের মত লিড নেন টুর্নামেন্টে, ৩১/২-২১/২ এ। ৬ নম্বর গেমটিকে বলা হয় গেম অফ দা সেঞ্চুরি। এরপর আর ঘুরে তাকাতে হয়নি ফিশারকে। বাকি ম্যাচগুলোর মাত্র একটিতে হেরেছিলেন তিনি স্পাসকির কাছে। ২১ ম্যাচ শেষে ১২১/২-৮১/২ পয়েন্টে বিজয়ী হোন আইন্সটাইনের চেয়েও উচ্চ আইকিউধারী অসম্ভব দাম্ভিক আর ব্যক্তিক্ষমতার অধিকারী ফিশার। চ্যাম্পিয়নশিপ লড়াইয়ের আগে স্পাসকির সাথে একটিও ম্যাচ জিতেন নি ফিশার, তবুও প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসি এই দাবারু প্রতিযোগিতার আগে এক সাক্ষাতকারে নিজেকে বিজয়ী কল্পনা করে বলেছিলেন-“I have a minus score (against Spassky). I lost 3 and drew 2. I was better than him when I lost those games. I pressed for the win. My overall tournament record is much better than his. I’m not afraid of him, he’s afraid of me.”

অন্য খবর  রিয়াল-বায়ার্ন শিবিরে ইনজুরির আক্রমন

 

 

৩ বছর পর-ই শিরোপা হাতছাড়া করেন তিনি,এর পেছনেও তার খামখেয়ালি আচরণ যুক্ত ছিল। তিনি অসংখ্য শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন যার অনেকগুলোই মানা সম্ভব হয়নি,তাই তিনি আর খেলেন নি । এরপর লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান তিনি। তিনি সব সময় ফেয়ার ফাইটে বিশ্বাস করতেন। তিনি জানতেন তাকে কেউ হারাতে পারবে না,তিনিই সেরা- তার দাম্ভিকতাকে তিনি সব সময় প্রমাণ করে এসেছেন। তিনিই ছিলেন প্রথম আমেরিকান দাবা চ্যাম্পিয়ন, তার মাধ্যমেই রাশিয়ার দাবায়  একচ্ছত্র আধিপত্যে আঘাত হানতে সক্ষম হয় আমেরিকা। অথচ এই আমেরিকাও এক সময় তাকে হেনস্থা করে। ১৯৯২ সাথে যুগোস্লোভিয়ায় স্পাসকির সাথে এক প্রীতি ম্যাচ খেলতে যান ববি, তার যুগোস্লোভিয়ায় যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আমেরিকা(সেসময় যুগোস্লোভিয়ার সাথে আমেরিকার কিছু কূটনৈতিক জটিলতা চলছিল)।নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাকে গ্রেফতারের নোটিশ দেওয়া হয়।পরবর্তীতে এক সাক্ষাতকারে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন-“Look at all I’ve done for the US. Nobody has single-handedly done more for the US image than me, I really believe this. When I won the World Championship in ’72, the United States had an image of, you know, a football country, baseball country, but nobody thought of it as an intellectual country. I turned all that around single-handedly, right? But I was useful then because there was the Cold War, right? But now I’m not useful anymore, you see, the Cold War is over, and now they want to wipe me out, steal everything I have, put me in prison, and so on.”

 

তিনি দাবা খেলাকে নিয়ে গেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়! একজন দাবারু হয়েও নিজেকে নিয়ে গেছিলেন পপস্টারের খ্যাতিতে।বিশ্বসেরা খেতাবি লড়াইয়ে হারেননি কোনোদিন। তাই শেষ দিন পর্যন্ত দাবি করে গেছেন, ‘আমিই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’। ববি ফিশার-যিনি কখনো মাথা নোয়াতে জানতেন না।

Comments

comments