পরকীয়া কোন অপরাধ না: ভারতীয় আদালতের ঐতিহাসিক রায়

84
পরকীয়া

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছে যে বিবাহিত কোন নারী বা পুরুষ যদি স্বামী বা স্ত্রী-র বাইরে অন্য কারো সাথে যৌন সম্পর্ক করেন – যাকে বলা হয় পরকীয়া – তা আর সেদেশে ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে না।

পরকীয়া সম্পর্কে জড়ালে ১৫৮ বছরের পুরোনো ভারতীয় দন্ডবিধির যে ধারায় একজন পুরুষ মানুষের জেল হওয়ার নিয়ম ছিল, তাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছে আদালত।

তবে রায় দেবার সময় প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেছেন যে পরকীয়া সম্পর্ক বিবাহ-বিচ্ছেদের কারণ হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু এটা কোন ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে না।

বিচারপতিরা তাঁদের রায়ে বলেছেন, আইনের ওই ধারাটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ফসল। নিজের শরীরের ওপরে একজন নারীর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে – এবং এই প্রশ্নে কোনও আপোষ করা অনুচিত। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়েছে, একজন স্বামী কখনই তাঁর স্ত্রীর মালিক বা প্রভু নন। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টিকে আদালত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এই রায় দিতে গিয়ে।

পুরনো আইনে বলা হয়েছিল যে যদি কোনও নারী স্বামীর সম্মতি না নিয়ে পরপুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করেন, তাহলে সেই ‘পর-পুরুষ’টির জেল হবে।

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ আজ রায় দিয়েছে যে পরকীয়া সম্পর্ককে অপরাধ বলে গণ্য করাটা অসাংবিধানিক। কারণ ওই আইন অনুযায়ী পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া একজন নারীকে তাঁর স্বামীর সম্পত্তির হিসাবে দেখা হত, আর যে পরপুরুষের সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেন, সেই ব্যক্তি যেন সম্পত্তি চুরি করেছে, তাই সে অপরাধী – এমনটাই মনে করা হত।

অন্য খবর  শ্রীনগরে ব্যবসায়ী ইদ্রিস খুন, নেপথ্যে পরকীয়া

মূল মামলাটি করেছিলেন ইতালিতে বসবাসরত এক অনাবাসী ভারতীয় নারী। তাঁর যুক্তি ছিল, দন্ডবিধির ওই ধারায় শুধু পুরুষমানুষটির নয়, পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে নারীটিরও সমান শাস্তি হওয়া উচিত। আদালত এই প্রসঙ্গে রায় দিতে গিয়ে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আসে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের প্রধান শমিতা সেন ব্যাখ্যা করছিলেন, “আইনটা যে ভিত্তির ওপরে তৈরী হয়েছিল, তা হল, একজন বিবাহিত নারী যেন তাঁর স্বামীর সম্পত্তি। যেভাবে আমি আপনার কোনও সম্পত্তি চুরি করলে সেটা অপরাধ, এক্ষেত্রেও মনোভাবটা ছিল যে স্বামীর সম্পত্তিকে চুরি করছে অন্য এক পুরুষ, তাই সে অপরাধী। এটা দুই পুরুষের দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখা হয়ে এসেছে এতদিন। নারীর কোনও ভূমিকাই ছিল না এক্ষেত্রে।”

সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে বলেছে, পরকীয়া সম্পর্ককে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসাবে আগেও যেমন গ্রাহ্য করা হত, এখনও সেভাবেই করা হবে।

কলকাতার ন্যাশানাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক রুচিরা গোস্বামী বলছিলেন, “যদি একটা বৈবাহিক সম্পর্কে কোনও সমস্যা তৈরী হয় এবং সেখান থেকে কোনও এক পক্ষ – স্বামী বা স্ত্রী – বিবাহের বাইরে গিয়ে কোনও সম্পর্ক তৈরী করেন, সেটাকে যুক্তি হিসাবে দেখিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হতেই পারে। কিন্তু সেটাকে অপরাধ বলে গণ্য যে কেন করা হত এতদিন, তার কোনও কারণ আমি তো খুঁজে পাই নি।”

অন্য খবর  ৭ জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা রুল জারি

যদিও পরকীয়া সম্পর্ককে অপরাধ বলে গণ্য করার আইনটি দেড়শো বছরেরও বেশী পুরণো, কিন্তু এটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বেশ সম্প্রতি।

সরকার অবশ্য এই মামলায় নিজের মতামত জানাতে গিয়ে বলেছিল, পরকীয়া সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিলে বিবাহ নামের যে প্রতিষ্ঠান সমাজকে অনেকটা ধরে রাখে, তা ভেঙে পড়বে। আদালত সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়েছে।

অধ্যাপক শমিতা সেন বলছিলেন, “এর অর্থ কি এটাই যে জেলে যাওয়ার ভয়ে আমরা বিবাহ নামের একটা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকছি? সমাজ, বা বলা ভাল জেলে পাঠাতে পারে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা, তার ভয়ে যদি আমাদের বিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয় – তাহলে সেই বৈবাহিক সম্পর্ক রাখার অর্থটা কী?”

Comments

comments