জিয়া পরিবারের বাইরে চলে যাচ্ছে বিএনপির রাজনীতি!

101

ধীরে ধীরে জিয়া পরিবারের বাইরে চলে যাচ্ছে বিএনপির রাজনীতি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, শারীরিক অবস্থা, বয়স, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একের পর এক সাজা, নির্বাসন এবং চলমান রাজনৈতিক সংকট অন্তত সেই বার্তা-ই দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজানীতি বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা রায়ের পর তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ‘অন্ধকার’ দেখছেন কেউ কেউ। রাজনীতি বিশ্লেষকরা তো বটেই, খোদ বিএনপি নেতারা মনে করছেন, এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের কর্তৃত্ব হ্রাস পাবে।

কেউ কেউ বলছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত লন্ডনে নির্বাসিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উচিত দলের নেতৃত্ব থেকে এখনই সরে দাঁড়ানো। এটা রাজনীতির নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন। বড় ধরনের রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদে আসীন থাকা মোটেই সমীচীন নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু নীতি-নৈতিকতা নয়, হিসাব-নিকাশের দিক থেকেও জিয়া পরিবার আর বাংলাদেশের রাজনীতিকে ডমিনেট করার সুযোগ পাচ্ছে না। তারা বলছেন, ৭৪ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার ৫ বছর কারাদণ্ড হওয়ায় আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণটা এখন আদালত এবং সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করছে। আর এবার নির্বাচন করতে না পারলে পরের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ তার পক্ষে সম্ভব হবে না।

এদিকে খালেদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে তারেক রহমানই ছিলেন জিয়া পরিবারের একমাত্র প্রতিনিধি। তার হাতেই বিএনপির ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়ে নির্ভার থাকতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া। বড় ছেলেকে সেভাবেই তৈরি করেছিলেন তিনি। বগুড়া থেকে প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের পর কেবল তারেক রহমানের জন্যই বিএনপিতে ‘সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব’ ও ‘সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান’ পদ সৃষ্টি করে সেখানে বসানো হয় তাকে।

অন্য খবর  ধর্ম সম্পর্কে কেউ নোংরা কথা লিখলে তা বরদাশত করা হবে না: শেখ হাসিনা

বিএনপির কোনো কোনো নেতা বলার চেষ্টা করেন, ২০০১ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের ‘বিপুল’ বিজয়ে তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই ওই নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত সরকার গঠন করলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে চলে আসেন তারেক রহমান।

কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সব কিছু উল্টে যায়। প্রথমে গ্রেফতার। তারপর প্যারোলে মুক্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তারেক রহমান। টানা ১০ বছর সেখানেই অবস্থান করছেন বিএনপির রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের সর্বশেষ এই প্রতিনিধি।

এরইমধ্যে মুদ্রা পাচার মামলায় ৭ বছর, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছর এবং সবশেষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে তারেক রহমানের। বিচারাধীন রয়েছে আরো অসংখ্য মামলা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে উচ্চ আদালতে আপিলের মাধ্যমে সাজা কমানো বা অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ ছিল তারেক রহমানের। কিন্তু নির্বাসনে থাকায় আগের দু’টি মামলায় সে সুযোগ হাতছাড়া করেছেন তারেক রহমান।

সর্বশেষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আপিলের জন্য ৩০ দিন সময় বেধে দিয়েছেন আদালত। এই ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে আপিলের সুযোগ হাতছাড়া হবে তারেক রহমানের। সেক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ থেকে রেহায় পাওয়র সুযোগটাও আর থাকবে না তার।

এদিকে একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘সহসায়’ অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন না বিএনপির এই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপির অনুকূলে না আসা পর্যন্ত দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব, সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ— কোনোটাই সম্ভব হচ্ছে না তারেক রহমানের পক্ষে।

অন্য খবর  বাজেটে কোন সমস্যা থাক্লে তা খতিয়ে দেখা হবে: প্রধানমন্ত্রী

অর্থাৎ বয়স, শারীরিক অবস্থা, অসুস্থতা ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থির কারণে খালেদা জিয়া এবং তিনটি মামলায় যথাক্রমে ৭ বছর, ১০ বছর ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় তারেক রহমান ভোটের রাজনীতি এবং দলের নেতৃত্ব থেকে এরইমধ্যে অনেকটা দূরে চলে গেছেন। লন্ডন থেকে টেলিফোন বা মোবাইলে বিএনপির নেতৃত্ব আপাতত দিতে পারলেও, সেটা কতদিন চালিয়ে যেতে পারবেন—তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে বিএনপির।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। সময়-ই সব বলে দেবে।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দীন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘তারেক রহমান নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। খালেদা জিয়াকেও নির্বাচনে অংশ নিতে দেবে বলে মনে হয় না। তাদের একজন জেলে, আরেকজন নির্বাসনে। এমন পরিস্থিতে বিএনপির রাজনীতি জিয়া পরিবারের বাইরে চলে যাচ্ছে—সেটা ভাবাই যায়। কিন্তু শেষ কথাটি বলার সময় এখনও আসেনি। কারণ, রাজনীতি কখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা বলা মুশকিল। বিএনপি যদি শিগগিরই ক্ষমতায় ফেরে, তাহলে খালেদা জিয়া-তারেক রহমান অর্থাৎ জিয়া পরিবারের হাতেই বিএনপির রাজনীতি থাকবে। আর যদি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে বিষয়টি অন্য রকম হবে।’

সারাবাংলা

Comments

comments