চাপাই নবাবগঞ্জে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সচিবের জাল স্বাক্ষরে আদায় হচ্ছে খাটাল

29

সীমান্ত দিয়ে আসা গরু-মহিষ যেখানে রেখে রাজস্ব আদায় করা হয় তা হচ্ছে খাটাল । চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে এমনই একটি খাটাল পরিচালনা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা কেনাল আলী। ভারত থেকে আনা বিপুল সংখ্যক গরু-মহিষ এক মাস ধরে এখানে প্রতিদিনই তোলা হচ্ছে। কিন্তু, অভিযোগ পাওয়া গেছে এই খাটালটি পরিচালনা করা হচ্ছে জোচ্চুরির মাধ্যমে। শাসকদলীয় স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মীর যোগসাজশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব হারুন অর রশিদ বিশ্বাসের স্বাক্ষর জাল করে খাটালটি চালাচ্ছেন কেনাল আলী। আর এই অবৈধ কাজটির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এরই মধ্যে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা হাতিয়েও নিয়েছেন তারা। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসা একটি  লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিবের স্বাক্ষর জাল ও খাটাল  অবৈধভাবে পরিচালনার বিষয়টি উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত-২ অধিশাখার উপ-সচিব আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক  চিঠিতে  জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত বা মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে যেসব গরু, মহিষ বা অন্য চতুষ্পদ প্রাণী আনা হয় সেগুলোর সংখ্যা নির্ধারণ, ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রাণীগুলোকে সীমান্তবর্তী যে স্থানে রাখা হয় সেই স্থানটি খাটাল বা বিট বা বিট-খাটাল নামে পরিচিত। এর আভিধানিক অর্থ গোয়াল বা বাথান। জানা গেছে, দেশে মাংসের চাহিদা পূরণ ও রাজস্ব বাড়াতে ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সীমান্তে বিট-খাটাল নীতিমালা জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সীমান্ত ফাঁড়িসংলগ্ন স্থানে খাটাল স্থাপন ও সীমান্তপথে গবাদিপশু এনে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গন্তব্যে চালান করার নির্দেশনা রয়েছে এ নীতিমালায়। নীতিমালা জারির পর দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামসহ আরও কয়েকটি জেলায় ৩০টির বেশি বিট-খাটালের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই খাটালগুলো প্রতিবছর বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ইজারা দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে থাকে সরকার। ইজারার পদ্ধতিটিও হয় কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। খাটালে কোন ধরনের ও আকৃতির পশুর জন্য কত টাকা ফি বা মাসুল আদায় করা যাবে তাও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

এমনই একটি বিট-খাটাল হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর বিওপি সংলগ্ন এই বিট-খাটালটি। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, খাটালটি বেশ কিছুদিন ধরে কাউকেই বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছিল না। কিন্তু এরই মধ্যে একটি চক্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এনে এক মাস আগে খাটালটি চালু করে।

অন্য খবর  গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্য লুটপাট: রিজভী

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাটালটি অবৈধভাবে পরিচালনা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা কেনাল আলী। তার বাড়ি শিবগঞ্জের উজিরপুরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব মো. হারুন অর রশিদ বিশ্বাস স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ব্যবহার করে খাটাল পরিচালনা শুরু করেন তিনি। ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারিতে ইস্যু করা চিঠিটিতে স্মারক নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ০২৮.১২৮.০০০০.১৬৭-২৩।

স্থানীয়রা জানান, খাটালটি অনুমোদনের কাগজে গত জানুয়ারির কথা উল্লেখ থাকলেও গত মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এতে গরু-মহিষ আসা শুরু হয়। প্রায় এক  মাস চলা খাটালে সীমান্ত পার হয়ে পশু আসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, খাটালে প্রতিটি গবাদিপশুর জন্য দিনে ২০ টাকা ও অতিরিক্ত প্রতিদিনের জন্য ৩০ টাকা হারে ফি আদায়ের কথা থাকলেও অবৈধ এ খাটালটিতে প্রতি জোড়া গরু মহিষের জন্য নেওয়া হয়েছে ৮ হাজার টাকা করে। এ হিসেবে খাটালে পশু রাখার সরকার নির্ধারিত হার ২০০ গুণ বাড়িয়ে এই চক্রটি মাত্র এক মাসেই দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর এই টাকা  কেনাল আলী ছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনসহ ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতারা ভাগ বাটোয়ারা করে নিজেদের পকেটে পুরেছেন।

গত ১৯ জুন বিষয়টি উল্লেখ করে স্থানীয় একটি পক্ষ বিষয়টি তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়। ওই তদন্তে দেখা যায়, চিঠিতে ব্যবহৃত স্মারক ও স্বাক্ষর দুটিই জাল। এ তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর স্বাক্ষর জাল করে খাটাল অনুমোদনের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারসহ আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আলমগীর হোসেন।

গত ২৬ জুন নির্দেশনাটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও একই জেলার পুলিশ সুপারকে পাঠানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা নির্দেশনাসহ চিঠি পাওয়ার পরও খাটালটি এখনও পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, জাল স্বাক্ষর ও ব্যবস্থা নেওয়ার চিঠি পাঠানোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আলমগীর হোসেন বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাক্ষর জাল করে খাটাল চালানোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বিজিবি মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা এখনও জানা যায়নি।

তিনি জানান, গত ২৬ জুন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার চিঠিটি বর্ডার গার্ডের মহাপরিচালক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, চিঠি হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদ হাসান। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছি। সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

অন্য খবর  বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে: আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল

সরকারি গেজেট অনুসারে, খাটাল বরাদ্দের জন্য স্থান নির্ধারণ ও খাটালের জন্য আবেদনকারীকে চিহ্নিত করতে কাজ করে উপজেলা কমিটি। এর দায়িত্বে থাকেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বিজিবি’র প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান ও রাজস্ব কর্মকর্তা। তারা আবেদন যাচাই-বাছাই করে ৩০ দিনের মধ্যে তা পাঠায় জেলা চোরাচালান নিরোধ কমিটিতে। পরবর্তীতে তাদের সুপারিশ পাঠানো হয় চোরাচালান প্রতিরোধ আঞ্চলিক টাস্কফোর্স কমিটির কাছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর তা পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। চোরাচালান প্রতিরোধ আঞ্চলিক টাস্কফোর্স কমিটি সুপারিশ পাওয়া বিট বা খাটাল স্থাপনের আবেদনগুলো অনুমোদনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যে ব্যক্তি অনুমোদন পান তিনি খাটালটি পরিচালনা করতে পারেন একবছর। সেটা হতে হবে বাংলা সন অনুযায়ী। তবে বাংলা সনের যখনই তা অনুমোদন দেওয়া হোক তার মেয়াদ থাকে পরবর্তী ৩০ চৈত্র পর্যন্ত।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খাটাল স্থাপনের প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিতে হয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছে। নবায়নের আবেদনও করতে হয় জেলা প্রশাসক বরাবর। খাটাল নিয়মিত তদারকি করার দায়িত্ব রয়েছে উপজেলা কমিটি, জেলা টাস্কফোর্স কমিটি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের। উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় বর্ডার গার্ড, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা খাটাল অনুমোদনের বিষয়টি অবগত থাকে।

অথচ এত ধাপ পার হওয়ার বিধি-বিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে দিব্যি পরিচালিত হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের এই খাটালটি।

এই খাটালটির অনুমোদন পাওয়া ও পরিচালনার ব্যাপারে কেনাল আলীর সঙ্গে তার ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এদিকে, খাটালটি পরিচালনা বিষয়টি জানতেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ব্যাটেলিয়ন-৫৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদ সরোয়ার। তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটা চিঠি পেয়েছি। একজন অ্যাপ্লিকেশন করেছে যে, স্বাক্ষর জাল করে খাটালটি চালানো হচ্ছে। সেটা যাচাই করার জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরা বিষয়টি দেখছি।’

খাটালটি যে পরিচালিত হচ্ছে তা আপনার জানা ছিল কিনা এমন প্রশ্নে সাজ্জাদ সরোয়ার বলেন, ‘জানবো না কেন? এটা প্রপার অথোরিটির মাধ্যমে অনুমোদন হয়েই আসছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার টিএম মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পেয়েছি। এ ব্যাপারে বিজিবি ও জেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে চিঠিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আমরাও সহযোগিতা করবো।’

Comments

comments